রাজকুমারী
হোলিকাকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। তখন তারা অতি দুঃখে চিতার ছাই নিজেদের মুখে মেখে
মুখ কালা করে। এই করুন ইতিহাসের উপর পর্দা দিয়ে ঢেকে দিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা রং-খেলার উৎসব চালু করেছে।
হোলিকা মুলনিবাসীদের মহানায়িকা
হোলিকা অথবা হোলী –এই উৎসব সারা ভারতে উজ্জাপন করা হয়।
হোলীকে জ্বালানো এবং পরদিন শরীরে রং লাগানোটা উৎসব হিসাবেই পালন করা হয়। কিন্তু এর
পিছনে কি আসল ইতিহাসকে লুকিয়ে রেখে বিকৃত কাহিনির প্রচার-প্রসার হচ্ছে এবং এই উৎসব মুলনিবাসীদের
জন্য আনন্দ কি দুঃখের সে বিষয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করছি। যদিও এটা পৌরাণিক কাহিনি তাই এক এক জায়গায় এর এক এক ব্যাখ্যা। বহু আগে মারাঠী পত্রিকা 'মূলনিবাসী নায়ক' থেকে লেখাটি অনুবাদের
চেষ্টা করেছিলাম।
হোলিকাকে
ব্রাহ্মণ্যবাদীরা পুরাণে এইভাবে বর্ননা করেছে যে-
প্রাচীনকালে রাক্ষসদের রাজা
হিরণ্যকশ্যপু নামের রাজা
রাজত্ব করত। দেবতাদের সঙ্গে তার ঝগড়া হয়। তার পুত্রের নাম প্রহ্লাদ। সে সব সময় নারায়ন নারায়ন বলে জপ করত। প্রহ্লাদের উপর দেবতাদের যে প্রভাব
পড়েছিল সেটা ছাড়ানোর জন্য রাজা হিরন্যকশ্যপু খুব চেষ্টা করেন। কিন্তু সফল হন না। অবশেষে হিরণ্যকশ্যপুএকটা কাঠের চিতার উপর হোলিকাকে বসিয়ে চিতায় আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। হোলিকার
অগ্নি দেবতার বর ছিল যে সে আগুনে পুড়বেনা। কিন্তু তবুও সে পুড়ে মারা যায়। আর
প্রহ্লাদের কিছুই হয়না। সে নারায়ন নারায়ন জপ করতে থাকে।
এই কাহিনির সারাংশ এটা হচ্ছে যে, দুষ্ট প্রবৃত্তির হার আর সত প্রবৃত্তির বিজয়।
এখানে একটা
প্রশ্ন হচ্ছে বহুজন সমাজের লোকেরা হোলিকাকে কেন পূজা করে?
এই হোলী কে?
মূলনিবাসী
বহুজনদের সঙ্গে তার কি সম্বন্ধ ?
মূলনিবাসী বহুজনদের রাজাধীরাজ শংকাসূর আর হিরণ্যকশ্যপুর কাছে সোনার ভান্ডার ছিল। ব্রাহ্মণ
দেবতা বিষ্ণু ষড়যন্ত্র করে শংকাসূরকে মেরে ফেলে। তার পুত্র হিরন্যকশ্যপু রাজা হয়।
একদিন হিরণ্যকশ্যপু হাতিয়ার কেনার জন্য অন্য রাজ্যে গেলে
ইন্দ্র হিরন্যপুরে হামলা করে। কারণ সেখনে সোনার ভান্ডার ছিল। ইন্দ্র ত্রৈলেক্য-এর
সুন্দরী রানী কপারুকে অপহরন করে। সে প্রেগনেন্ট ছিল। তাই প্রহ্লাদের জন্ম
বিষ্ণুলোকে হয়। পরবর্তীতে হিরণ্যকশ্যপু সংঘর্ষ করে রানী ও
বাচ্চাকে ইন্দ্রের কব্জা থেকে মুক্ত করে। ছোট বাচ্চা প্রহ্লাদের উপর ব্রাহ্মণী
সংস্কারের প্রভাব পড়ে। সেই সংস্কার থেকে ছেলেকে মুক্ত করার জন্য হিরন্যকশ্যপু
প্রহ্লাদের জন্য দুজন গুরুকে নিযুক্ত করেন। কিন্তু তবুও কোন
কজের কাজ হয়না। তারপর প্রহ্লাদের পিসি রাজকুমারী হোলিকা প্রহ্লাদকে তার কাছে ডেকে
নেন । হোলিকা প্রহ্লাদকে তাদের মহাপুরুষদের প্রেরণা দায়ক ইতিহাস বলেন। হোলিকা প্রহ্লাদকে আরও বলেন যে –‘তোমার কাকাকে এই বিষ্ণু ষড়যন্ত্র করে
মেরেছে। তোমার মাকে ইন্দ্র জোর করে অপহরন করে ছিল।’ এই ভাবে হোলিকা ইন্দ্রের ব্যাপারে প্রহ্লাদকে সবকিছু জানান। প্রহ্লাদ যখন সত্যি ঘটনা জানল তখন সে
ইন্দ্রের প্রতি বিদ্রোহ করার জন্য তৈরি হয়। প্রহ্লাদ অনুভব
করে সে এক মহান বংশের সন্তান। সেই মহানতার পরম্পরা রক্ষা করা তার কর্তব্য। সে
নিজের প্রতি গর্ব অনুভব করে। সে প্রতিজ্ঞা করে তার রাজ্যে কোন ব্রাহ্মণকে যজ্ঞ করতে দেবেনা এমন কী কোন ব্রাহ্মণকে রাজ্যে প্রবেশাধীকারও দেবেনা।
যজ্ঞের বিরোধ অর্থাৎ ব্রাহ্মণদের অস্তিত্বের বিরোধ। যজ্ঞের
নামে ব্রাহ্মণরা ফ্রিতে জমি,আনাজ,ধন, সূরা(মদ) আর যুবতী মহিলাকেও পেত। কিন্তু প্রহ্লাদের এই
নির্ণয় ব্রাহ্মণদের এই ভোগের প্রতি কুঠারাঘাত করে। তারা দেখল প্রহ্লাদের এই ধরনের
বিচার-ধারা পরিবর্তনের পিছনে কাজ করেছে হোলিকা। তাই তারা ঠিক করল হোলিকার উপর বদলা
নিতে হবে। তাঁকে
কঠিন শাস্তি দিতে হবে। তারা ষড়যন্ত্র করে গুপ্তভাবে রাজকুমারী হোলিকার উপর হামলা
করে। তাঁকে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে বন্দী
করে রাখে।
হোলিকার মুক্তির জন্য অসূর সৈন্যদের একটি দল হিরণ্যপুর থেকে
যাত্রা করে। আর এখবর অপহরণকারীরা জানতে পারে। তখন তারা তাড়াতাড়ি হোলিকাকে মারার
প্লান বানায়। ঐসময় ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমার রাত ছিল। তারা
হোলিকাকে মাঠের মধ্যে একটা খাম্বা পুতে তার সংঙ্গে বেধে দেয়। আর তার চার পাশে
শুকনো ঘাস গাছের শুকনো ডাল দিয়ে ঘিরে দেয়। হিরণ্যকশ্যপুর
সৈন্যরা কাছাকাছি এসে যাচ্ছে দেখে শত্রুরা হোলিকার গায়ে অগুন লাগিয়ে দেয়। যার ফলে
হোলিকা পুড়ে মারা যায়।
রাজকুমারী হোলিকাকে বাঁচানো
সম্ভব হয় না। তখন তারা অতি দুঃখে চিতার ছাই নিজেদের মুখে মেখে মুখ কালা করে।
এই করুন
ইতিহাসের উপর পর্দা দিয়ে ঢেকে দিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা রং-খেলার উৎসব চালু করেছে।
এই দিন
মূলনিবাসীদের কাছে অতি দুঃখের দিন। কিন্তু বলা হয় Happy Holi. কোনো নারীকে পুড়িয়ে
মারার ঘটনা কি করে Happy হয়?
0 comments:
Post a Comment