আমরা কি এই ইতিহাস জানি বা মানি? (সংবিধান, আম্বেদকর ও যোগেন্দ্রনাথ)
লেখক- জগদীশচন্দ্র
রায়
২৬ শে জানুয়ারী গণতন্ত্র দিবস। এই দিন ভারতের সংবিধান লাগু হয়। এই সংবিধান লেখেন
ডঃ বাবাসাহেব আম্বেদকর। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে বাবাসাহেব যদি সংবিধান সভায় যেতে না পারতেন
তাহলে তিনি এই সুযোগ পেতেন না। বাবাসাহেবের সংবিধান সভায় যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।
তখন তপশিলি ফেডারেশনের পক্ষ থেকে সারা ভারতে শুধুমাত্র মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল
নির্বাচিত হয়ে ছিলেন। সংবিধান সভায় প্রবেশের জন্য কমপক্ষে পাঁচটি ভোটে (পাঁচ জন এম
এল এ)-র প্রয়োজন। এদিকে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বাবাসাহেব যাতে সংবিধান সভায় যেতে না পারেন
তার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা করে রেখেছে। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ঘোষণা করেছেন, ‘সংবিধান
সভার দরজা তো দূর, ভেন্টিলেটরও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে আম্বেদকর যাতে সংবিধান সভায় প্রবেশ
করতে না পারেন সে জন্য।
মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথকে বাংলার আম্বেদকর বলা হয়। তিনি বাবাসাহেবকে রাজনৈতিক
গুরু মনে করতেন। তাই তিনি বলেছিলেন, ‘ফেডারেশনে
যোগ দেওয়ার আগে আমি ডঃ আম্বেদকরকে দেখেছিলাম,
আমি তাঁর কাছ থেকে যা
আশা করেছিলাম এবং আমি আজও বলছি, তাঁর কাছ থেকে আমি যা পেয়েছি তা এতটাই
মূল্যবান যে সারা বিশ্বও আমাকে তা দিতে পারবে না। Before I joined
the Federation I saw Dr. Ambedkar, what I expected from him was and still I say
what I got from him has been so precious that the entire world cannot give it
to me. (26শে ডিসেম্বর 1946-এ/(মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, লেখক- জগদীশ চন্দ্র মণ্ডল, ২য়
খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০০)
মহাপ্রাণ প্রতিজ্ঞা করলেন বাবাসাহেবকে সংবিধান
সভায় পাঠাতে হবে। যেটা এক অকল্পনীয় ঘটনা। বাংলার তপশিলিরা মহাপ্রাণের নেতৃত্বে সেদিন
দেখিয়ে দিয়ে ছিল অসাধ্যকে কিভাবে সাধ্য করতে হয়। যে ঘটনাকে কর্নেল সিদ্ধার্থ বার্ভে
বলেছেন, ‘এটা বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্য’ ঘটনা।
বাবাসাহেব সংবিধান সভার জন্য নির্বাচিত হলেও দেখা
গেল কংগ্রেস তাদের কূটকৌশলের চাল চেলে বাবাসাহেব বাংলার যে সব ক্ষেত্রের এম এল এ-দের
দ্বারা নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেই সব ক্ষেত্র ভারতভাগের সময় পূর্বপাকিস্তানে দিয়ে দেয়।
ফলে বাবাসাহেবের সদস্য পদ রদ হয়ে যায় ভারতের সংবিধা সভার জন্য।
বাবাসাহেব জানতেন কংগ্রেস কিছুতেই তাঁকে সংবিধান
সভায় যেতে দিতে চাইবে না। তাই তিনি ১৫ অক্টোবর ১৯৪৬ সালে ঈংলণ্ডে যান। ৩১ অক্টোবর ১৯৪৬
ওখানকার রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। চার্চিলের সঙ্গে দেখা করেন। চার্চিল
বাবাসাহেবকে বলেন, ‘অচ্ছুতদের সব রকমের প্রশ্নের উপর আমার পার্টি সহৃদয়তার সঙ্গে সহানুভুতি
দেখাবে’। ব্রিটিশ সরকার এই বিষটিকে খুব গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে গ্রহণ করে। কারণ, দেশভাগের
ব্যাপারে নির্ধারিত নীতিকে লঙ্ঘন করা হচ্ছিল। ফলে ব্রিটিশ সরকার নেহেরুকে বলেন, ডঃ
আম্বেদকর যে স্থান থেকে জয়ী হয়ে সংবিধান সভায় এসেছেন, সেই স্থান হয় ভারতের মধ্যে হোক
আর না হয় তাঁকে পুনরায় সংবিধান সভায় পাঠানোর ব্যবস্থা করুন অন্যথা এই বিষয়ের সমস্যা
মেটাতে সময় লাগতে পারে। এর ফলে বিভাজনের প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হবে। (তথ্য- ‘সংবিধান সভা
কা সফর’। লেখক- ডঃ সঞ্জয় গজভিয়র। পৃষ্ঠা-৭৭/৭৮)
এর পরও কেউ কেউ বলবেন, কংগ্রেসইতো বাবাসাহেবকে
সংবিধান সভায় পাঠিয়ে ছিল। কিন্তু প্রথম্ বার যদি বাবাসাহেব সংবিধান সভায় যেতে না পারতেন,
তাহলে ব্রিটিশ সরকার কোনো যুক্তিতেই এইভাবে চাপ দিতে পারত না। যেহেতু ডঃ আম্বেদকর প্রথমেই
সংবিধান সভায় ছিলেন তাই নিরুপায় হয়ে পুনরায় তাঁকে কংগ্রেস নিতে বাধ্য হয়েছে। এখানে
কংগ্রেসের কোনো কৃতিত্ব নেই।
তাহলে আমরা কী দেখলাম, এই পূর্ণ ঘটনার দিসলাইয়ের
কাঠি স্বরুপও যদি ধরি, সেই বারুদ জ্বালিয়েছিলেন, মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। এখানে
কোনো অংশেই তাঁর কৃতিত্ব কম নয়। তাই একথা বলা যায়, ‘যোগেন্দ্রনাথ
মুসলিম লীগ তথা মুসলমানদের সঙ্গে গাঁট বাঁধার 'অপরাধে' হিন্দু
আধিপত্যবাদীদের দ্বারা যতই ধিকৃত হন না কেন এবং তিনি যতই বিতর্কিত ব্যক্তি বলে
নিন্দিত হন না কেন, অধ্যাপক অমলেন্দু
দে যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, "The history of Modern India cannot be
complete without Mr. J.N. Mandal.’ (তথ্য- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গ ও অন্যান্য
প্রসঙ্গ, লেখক- সদানন্দ বিশ্বাস, পৃষ্ঠা-২৩৪)।

0 comments:
Post a Comment