Tuesday, 13 January 2026

// // Leave a Comment

প্রিয় সম্পাদক অস্পৃশ্যতার শিকার বিবেকানন্দ লেখক- অঞ্জন সাহা

                        প্রিয় সম্পাদক- অস্পৃশ্যতার শিকার বিবেকানন্দ

              


                                             লেখক- অঞ্জন সাহা

      ১৮৯৩ সালে বিবেকানন্দ এক পত্রে আলাসিঙ্গাকে এক লিখেছেন, ‘হিন্দু ধর্ম যেমন পৈশাচিকভাবে গরিব ও পতিতদের গলায় পা দেয় জগতের আর কোনও ধর্ম এক্সপ করে না।’ এই ‘পৈশাচিক পা’ বিবেকানন্দকেও রেহাই দেয়নি। শূদ্র বলে অনেক সন্ন্যাসী মঠে আশ্রমে তাঁকে অপরাপর সন্ন্যাসীদের সঙ্গে পঙক্তি ভোজনে বসতে দেওয়া হয়নি। বিখ্যাত জজসাহেব ও প্রখ্যাত সমাজসেবী স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বিশ্ববিজয়ী বিবেকানন্দর সংবর্ধনা সভায় সভাপতিত্ব করতে অস্বীকার করেন। এমনকি তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর শোকসভায় সভাপতিত্ব করতে অনুরোধ করা হলে শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘দেশে যদি হিন্দু রাজা থাকত তবে শূদ্র হয়েও সন্ন্যাসী হওয়ার অপরাধে তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানো হাত’ (বিবেকানন্দ ও সমকালীন ভারতবর্ষ, শঙ্করীপ্রসাদ বসু, খ-৪, পৃঃ- ৬২)। এমনকি এটাও জ্বলন্ত সত্য যে, শ্রী রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর মথুর বিশ্বসেরা বিবেকানন্দকে দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে ঢুকতে দেননি তার শদ্রত্বের কারণে। ‘স্বামী বিবেকানন্দ মন্দিরে ঢুকেছিলেন বলে বেবীর পনরাভিষেকের প্রয়োজন হয়েছিল।’ (ঐ, পৃঃ- ১৫৫)। এতদসত্বেও তিনি সেই পৈশাচিক ধর্মের মহিমা কীর্তন করে গেছেন এবং জাতবাদ-এরও তিনি ছিলেন প্রবল সমর্থক। জাতবাদ-এর আর এক শিকার ড. আম্বেদকর। তাঁর পরীক্ষার উত্তর-পত্রাদি গঙ্গাজল ছিটিয়ে প্রথমে পবিত্র করা হত, তারপরই শিক্ষকরা তা মার্কিং-এর জন্য দেখতেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবু জগজীবন রাম বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে ড. সম্পূর্ণানন্দের মূর্তি উন্মোচন করেন। মুচির ছেলের স্পশে মূর্তি অপবিত্র হওয়ায়, পরে গঙ্গাজলে ধুয়ে তাকে পুনরায় পবিত্র করা হয়। কিন্তু মাঝগঙ্গার অতলে ডুবিয়েও ড. আম্বেদকরদের পবিত্র করা যায়নি। তাঁরা রয়ে গেছেন অস্পৃশ্যই। আবার শূদ্রাণী কৈবর্ত রাণি রাসমণি তাঁর দক্ষিণেশ্বরের কালীমন্দিরের সম্পত্তি ব্রহ্মোত্তর করে না দেওয়া পর্যন্ত গদাধরের পুজোর প্রসাদ গ্রহণ না করার জেদ মুগ্ধ করেছিল সনাতনপন্থী হিন্দু সম্প্রদায়কে। তাঁরা তুরীয় আনন্দে রামকষ্ণদেবকে অবতার বলে ঘোষণা করে দিলেন। প্রকৃতপক্ষে গোঁড়া ব্রাহ্মণ রামকৃষ্ণ নিম্নবর্ণকে চিরকাল নিচ চোখে দেখে এসেছেন। ‘শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পুঁথি-র লেখক অক্ষয় সেন (শাকচুন্নী) লিখেছেন,

 ‘প্রভুদেব রামকৃষ্ণ বসিলা ভোজনে।।

 একাত্তরে সবে কিন্তু স্বতন্ত্রর স্থান।

 বর্ণ ভেদ রক্ষাকরা প্রভুর বিধান।।’ (পৃঃ-৫২২)।

 কিংবা

 ‘পবিত্র ব্রাহ্মণ বিনা বন্দন না হয়।

 অন্যে পরশিলে অন্ন ঘৃণ্য অতিশয়।।’ (পৃঃ- ৪৮৮)।

 গান্ধীজি ‘বর্ণাশ্রম’ ধর্মের সমর্থক ছিলেন। কিন্তু অচ্ছুৎ প্রথাকে ঘৃণা করতেন। কিছুকাল অস্পৃশ্যতা। দুরীকরণের প্রয়াস চালিয়ে ধর্মের ঠিকাদারদের আক্রমণের শিকার হন। গোঁড়া হিন্দু সমাজের বাঘা বাঘা সমালোচকরা তাঁকে অভিহিত করেন ‘শয়তান’ বলে। গান্ধীজির প্রয়াস সফল হয়নি। তিনি বোঝেননি, বর্ণভেদ-জাতিভেদ প্রথা সমূলে উচ্ছেদ না করে এবং যে ধর্মের ঈশ্বর সমস্ত শ্রমজীবী মানুষকে ‘পাপযোনি’ এবং ‘দাস’ করে সৃষ্টি করেছেন, সেই ধর্ম এবং তার ধর্মগ্রন্থের আধুনিক ভাষ্যের মাধ্যমে ব্রহ্মণ্য ধর্মের চতুর্থ ও পঞ্চম বর্ণের মানুষদের শৃঙ্খল মোচন সম্ভব নয়। প্রমাণ, চুনী কোটাল ও রোহিত ভেমুলা।

     আজও প্রতিদিন এই মহান ভারতের কোথাও না কোথাও অস্পৃশ্যদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, তাঁদের নারীদের ধর্ষণ করা হয়। ভৌতিক উল্লাসে তাঁদের পুড়িয়ে মারা হয়। তথ্য বলছে, ২০০০ সাল থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে উচ্চবর্ণের সন্ত্রাসবাদীরা নিম্নবর্ণের ২৬০০০ মানুষকে হত্যা করেছে। মূল থেকে পচে যাওয়া সমাজব্যবস্থায় রোহিতের মৃত্যু আরও একটি সংখ্যা মাত্র। নানা মিডিয়ায় কিছুদিন ফাটাফাটি যুক্তি-তর্ক চলবে, তারপর সব শান্তিকল্যাণ হয়ে যাবে। 

     মানুষ নয়, অস্পৃশ্য হোক অমানবিক ধর্মীয় বিধান।

অঞ্জন সাহা। কলকাতা-৫১

(কোন পত্রিকায় এটা ছাপা হয়েছে, সেটা জানিনা।)


0 comments:

Post a Comment