Tuesday, 7 March 2023

// // Leave a Comment

নারীর অধিকারের জন্য কারা সংগ্রাম করেছেন লেখক- জগদীশচন্দ্র রায়।

 


নারীর অধিকারের জন্য কারা সংগ্রাম করেছেন

লেখক- জগদীশচন্দ্র রায়।

আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই।

প্রথমেই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত বাণী দিয়ে শুরু করছি,

  বিশ্বে যা কিছু সৃষ্টি চির কল্যাণকর,

  অর্ধেক তার করিয়াছে নারী,অর্ধেক তার নর।             

     নারীর অধিকারের জন্য নারীকে যেমন প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়েছে, সেই সঙ্গে অনেক পুরুষও সেই সংগ্রাম করে গেছেন। এক্ষেত্রে আমরা উল্লেখ করতে পারি- গৌতম (বাস্তবে গোতম) বুদ্ধ, হরিচাঁদ ঠাকুর, গুরুচাঁদ ঠাকুর, মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলে, মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ, বাবাসাহেব, পেরিয়ার ইত্যাদি। (আমি এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে শুধু কয়েকজনের সম্বন্ধে আলোচনা করছি)

হরি-গুরুচাঁদ ঠাকুরঃ-

    আমরা হরি-গুরুচাঁদের দর্শনে দেখতে পাই-

“শুনেছি পিতার কাছে আমি বহুবার।

নারী ও পুরুষ পাবে সম অধিকার।।

সমাজে পুরুষ পাবে যেই অধিকার।

নারীও পাইবে তাহা করিলে বিচার।

আবার গুরুচাঁদ ঠাকুর যখন শিক্ষার যে আন্দোলন শুরু করেন, সেই আন্দোলনের স্লোগান ছিল-

“খাও বা না খাও তা’তে দুঃখ নাই।

ছেলে পিলে শিক্ষা দেও এই আমি চাই। (গুরুচাঁদ চরিত পৃষ্ঠা ১৪৪)

                                    বালক বালিকা দোঁহে পাঠশালে দাও।

                                    লোকে বলে “মা’র গুণে ভাল হয় ছা’ও।। -ঐ পৃঃ ৫২৯)

 বাবাসাহেব আম্বেদকরঃ-

      আমরা জানি, বাবাসাহেব নারীর অধিকারের জন্য হিন্দুকোড বিল (যদিও এই হিন্দু কোড মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল প্রথমে খসড়া প্রস্তুত করেছিলেন) বানিয়েছিলেন নারীদের সমমর্যাদার অধিকার দেওয়ার জন্য। পিতার সম্পত্তিতে কন্যার সমান অধিকার, বিবাহিত পুরুষ এক স্ত্রী বর্তমান থাকতে অন্য স্ত্রীকে গ্রহণ করতে পারবেনা। যদিও তখনকার সরকার সেটার মান্যতা দেয়নি। পরবর্তীতে সেটা চালু করা হয়। মহিলাদের মাতৃত্বকালী ছুটি, এবং প্রতিদিন আট ঘন্টা কাজের সময় নির্ধারণ বাবা সাহেবের অবদান। তিনি যখন শ্রমসচিব (মন্ত্রী) তখন (১)কয়লা শ্রমিকদের নানা ধরনের সহায়তা প্রদান, (২) মহিলা শ্রমিকদের প্রসবকালীন ৩২৯ দিন ছুটি, (৩) কর্ম বিনিয়োগ কেন্দ্র, (৪) ৮ ঘণ্টা কাজের আইনী স্বীকৃতি, (৫) ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার সম্প্রসারণ, (৬) ন্যূনতম বেতন —সহ নানা শ্রমিক  কল্যাণ আইন পাস ও কার্যকর করেন।

মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলঃ-

আমরা দেখতে পাই মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথও গুরুচাঁদ ঠাকুরের যোগ্য ভাবশিষ্য হিসাবে সমাজ কল্যাণকর কাজ করেগেছেন। তিনি নারী শিক্ষার জন্য-

    ১৯৪৪ সালে নারী শিক্ষার উপর যোগেন্দ্রনাথ জোর দিয়ে বলেন, পুরুষেরা বেশিরভাগ সময় কাজ কর্মে গৃহের বাইরে থাকে। সেজন্য তারা সন্তানদের পড়াশুনার দিকে লক্ষ্য দিতে পারে না। সেজন্য নারী শিক্ষার একান্ত প্রয়োজন। (তথ্য সূত্রঃ- ক্যুইজ অন- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ, পৃ ১৮/১৯)

    তিনি তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নাজিমুদ্দিন খানের নিকল অবৈতনিক প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বিধান পরিষদে বিপুল ভোটে উক্ত বিলটি পাশ হয়।

    যোগেন্দ্রনাথে চেষ্টার ফলে নাজিমুদ্দিন সাহেবের মন্ত্রীসভায় তপশিলি ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষার জন্য ৮ম শ্রেণির পরিবর্তে ৪র্থ শ্রেণি থেকেই অনুদানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

১৯৪৪ সালে যোগেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে বরিশালে সন্তোষকুমারী তালুকদারের নেতৃত্বে একটি মহিলা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় যোগেন্দ্রনাথ বলেছিলেন, মায়েরাই শিশুদের প্রথম শিক্ষায়ীত্রী। তাই তপশিলি সমাজাকে শিক্ষিত করতে হলে নারী সমাজকে আগে শিক্ষাদান করা দরকার। প্রতিটি পরিবারের মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে হবে। (তথ্য সূত্রঃ- ক্যুইজ অন- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ, পৃ ২২)

 ১৯৪৬ সালে অন্তর্বর্তি সরকারের আইন মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল নারীর অধিকারের উদ্দেশ্যে ‘হিন্দু কোড বিল’-এর খসড়া প্রস্তুত করেন এবং ১৯৪৬ সালে কেন্দ্রীয় আইনসভায় পেশ করেন।  

মাতা সাবিত্রি ফুলে ও মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলেঃ-

মাতা সাবিত্রি প্রথম মহিলা যিনি সকল শ্রেণীর মহিলাদের জন্য শিক্ষা চালু করেছিলেন। এই শিক্ষার নেত্রী মাতা সাবিত্রি শুধু ভারতের প্রথম অধ্যাপিকাই নন, তিনি সমগ্র সমাজের জন্য এক আদর্শ ও প্রেরণা স্রোত, বিখ্যাত সমাজ সংস্কারক, জাগৃতিকারক, আর ভারতের স্ত্রী আন্দোলনের প্রবর্তকও।

    হাজার বছর ধরে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে রাখা সর্ব শ্রেণীর স্ত্রীদের জন্য তিনি যখন এক ঝটকায় শিক্ষার দরজাকে লাথি মেরে উন্মুক্ত করে দেন; তখন শিক্ষার বন্ধ দরজা খোলার আওয়াজ শুনে পুনের ব্রাহ্মণ্যবাদীদের কান ফেটে যায়। তাদের কাছে বজ্রাঘাতের মত এই ঘটনা মনে হয়। তখন তারা অমানবিক সামন্ততাত্রিক প্রথার ঘুমন্ত সিংহ কে জাগিয়ে তোলে। তারা মাতা সাবিত্রী ফুলে ও মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলের উপর বিভিন্নভাবে প্রাণ নাশের চেষ্টা চালায়।

    সাবিত্রী ও জ্যোতিরাও দ্বারা প্রজ্বলিও শিক্ষার জ্যোতিকে নিভিয়ে দেওয়ার জন্য ব্রাহ্মণ্যবাদীরা জ্যোতিরাও এর পিতা গোবিন্দ রাও কে ধমকী দিয়ে ভয় দেখিয়ে জ্যোতিরাও কে ঘর থেকে বের করার কাজে সফল হয়। ঘর ছাড়া হয়েও সাবিত্রী ও জ্যোতিরাও তাঁদের শিক্ষা প্রদানের কাজ চালিয়ে যান।

    মাতা সাবিত্রি যখন মহিলাদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য বাইরে যেতেন, তখন তাঁর উপর ব্রাহ্মণ্যবাদীরা গোবর ও পাথর ছুড়ে মারত। তাঁকে রাস্তায় চলার সময় বাঁধা সৃষ্টি করে উঁচু জাতির গুন্ডারা খারাপ খারাপ গালি দিত। এমনকি তাঁকে মেরে ফেলারও ধমকি দিত। মহিলাদের জন্য চালানো স্কুল বন্ধ করার চেষ্টা করত। সাবিত্রী এদের ধমকীতে যাতে ভয় পেয়ে ঘরে বসে যান, সেই চেষ্টা করত। এমনকি ব্রাহ্মণ্যবাদী অনেক নিয়ম তুলে নরকে যাওয়ার ভয়ও দেখাত। এরকমই এক বদমাশ প্রায় প্রতিদিনই সাবিত্রির পিছে পিছে এসে উত্যক্ত করত। একদিন তো ঐ বদমাশ হঠাৎ সাবিত্রীর রাস্তা বন্ধ করে দাঁড়ায়। আর শারীরিকভাবে আক্রমন করে। তখন সাবিত্রি দুঃসাহস করে ঐ বদমাশকে থাপ্পড় লাগান। থাপ্পড় খেয়ে বদমাশ আর দ্বিতীয় বার সাবিত্রীর সামনে আসেনি।

 

উপসংহারঃ-

     দুঃখে বিষয় এই মহামানবদের নারীর অধিকারের জন্য সংগ্রামের ফলে আজ সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে নারীদের যেভাবে প্রগতি হয়েছে সেই তুলনায় বেশিরভাগ নারী এই অধিকারের ইতিহাস জানেন না বা জানতে চান না। সব কিছু আজ কেমন যেন ফর্মালিটিতে এসে দাঁড়িয়েছে। যার জন্য একদিকে এক নারীর পুড়িয়ে মারার ঘটনা নিয়ে এক শ্রেণির নারীরা হোলী উৎসবে মেতে ওঠে ও নারী দিবসের নারীদের অধিকারের জন্য চিৎকার করে। অন্য এক শ্রেণির নারীরা অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবে, দারিদ্রতার জালায় ছটফট করে। কী বিচিত্রতা!

 

Read More

Saturday, 25 February 2023

// // Leave a Comment

কোনো কোনো মার্ক্সবাদী মনে করেন- "আর্থিক সাম্য প্রতিষ্ঠা হলেই সামাজিক সাম্য আসতে বাধ্য।" এ বিষয়ে আম্বেদকর কী ব্যাখ্যা দিয়েছেন? লেখক- ড. বি আর আম্বদেকর

 কোনো কোনো মার্ক্সবাদী মনে করেন- "আর্থিক সাম্য প্রতিষ্ঠা হলেই সামাজিক সাম্য আসতে বাধ্য।" এ বিষয়ে আম্বেদকর কী ব্যাখ্যা দিয়েছেন?

কার্ল মার্ক্সের  অর্থনৈতিক সংস্কার ও আম্বেদকরের সামাজিক সংস্কারের মধ্যে 


 কোনটা বেশি প্রয়োজনীয়?

লেখক- ড. বি আর  আম্বেদকর (book- Annihilation of Caste) 

অনুবাদক- জগদীশচন্দ্র রায়

  সমাজবাদীরা কি ভারতের সমাজ ব্যবস্থা থেকে উৎপন্ন সামাজিক সমস্যাকে উপেক্ষা করতে পারেন? ভারতের সমাজবাদীরা ইউরোপের সমাজবাদী বন্ধুদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে (কার্ল মার্ক্সের তৈরি) ‘ইতিহাসের অর্থ – নৈতিক ব্যাখ্যা’ ভারতীয় ঘটনাবলির উপর প্রয়োগ করার জন্য চেষ্টা করছে। তাঁরা এটা বলেন যে, মানুষ একটি অর্থনৈতিক জীব। মানুষের কার্যকলাপ এবং আশা-আকাঙ্খা অর্থনৈতিক ঘটনাবলির দ্বারা সীমাবদ্ধ   এবং শুধুমাত্র সম্পদই সকল শক্তির উৎস। সুতরাং একথা প্রচার করেন যে, রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংস্কার আন্দোলন একটি ভুল পদক্ষেপ এবং সকল প্রকার সংস্কারের পূর্বে সম্পদের সমবন্টনের জন্য অর্থনৈতিক সংস্কার অবশ্যই আগে হওয়া দরকার। ‘অন্যান্য সংস্কারের পূর্বে অর্থনৈতিক সংস্কার হওয়া দরকার’– সমাজবাদীদের এই মতবাদের যুক্তিগুলি বিশেষভাবে আলোচনা করা দরকার। 

   যেকোনো ব্যক্তির এই ধারণা হতে পারে যে, আর্থিক প্রেরণাই একমাত্র প্রেরণা নয়, যার থেকে মানুষ প্রেরিত হতে পারে। সামাজিক ইতিহাস ও সমাজ বিদ্যার কোনো ছাত্র একথা গ্রহণ  করতে পারেনা যে, অর্থনৈতিক ক্ষমতাই একমাত্র ক্ষমতা। ভারতের মহাত্মা নামধারী রাজনৈতিক নেতা, সাধু-সন্যাসী, ধর্মীয় গুরুদের সাধারণ মানুষের উপর বিরাট প্রভাব এই সত্যই প্রতিষ্ঠিত করে যে, একজন মানুষের সামাজিক মর্যাদা অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের উৎস হিসাবে গণ্য  হয়ে থাকে। ভারতের লক্ষ লক্ষ টাকার মালিকেরা কেন নিঃস্ব সাধু ও ফকিরদের কাছে মাথা নত করে তাদের নির্দেশ মান্য করে থাকে? ভারতের লক্ষ লক্ষ দরিদ্র মানুষ তাদের সর্বস্ব বিক্রি করে কেন বেনারস আর মক্কায় তীর্থ করতে যায়? ভারতের ইতিহাস এই উদাহরণ থেকে প্রমাণ করে যে, ধর্ম ক্ষমতার উৎস। 

 ভারতের ইতিহাস এই সাক্ষ্য বহন করে যে, বিচারকের চেয়ে সামান্য একজন পুরোহিতের প্রভাব সাধারণ মানুষের উপরে বেশি হয়। ভারতের প্রত্যেকটি বিষয় এমনকি ধর্মঘট এবং নির্বাচনের উপরও সহজেই ধর্মীয় প্রভাব পড়ে। আর এই ধরণের ঘটনাকে ধর্মীয় সুড়-সুড়ি দিয়ে প্রভাবিত করে। (That, religion is the source of power in illustrated by the history of India where the priest holds a sway over the common man often greater than the magistrate and where everything, even such things as strikes and elections, so easily take a religious turn and can so easily be given a religious twist.)

    সাধারণ মানুষের উপর ধর্মের প্রভাব বোঝানোর জন্য প্লেবিয়ানদের উদাহরণ আমরা দেখতে পারি। এই উদাহরণটি এই বিষয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ঘটনা। প্লেবিয়ানরা রোমের প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সার্বভৌমিক ক্ষমতার অংশ লাভের জন্য সংগ্রাম করেছিল এবং তার ফলে একজন প্লেবিয়ান কনসাল(বাণিজ্য দুত) নিয়োগের অধিকার লাভ করে। ঐ প্লেবিয়ান কনসাল  প্লেবিয়ানদের ‘কমিটিয়া সেঞ্চুরিয়াটা’ (commitia Centuriata) নামক সংগঠনের দ্বারা পৃথক নির্বাচনের মাধ্যমে নিযুক্ত হত। তারা তাদের জন্য একজন পৃথক কনসাল চেয়েছিল। কারণ, তারা এটা উপলব্ধি করেছিল যে, শাসন ব্যবস্থা পরিচালনায় প্যাট্রিসিয়ান জাতি প্লেব জাতির বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণ করে। আপাততঃ দৃষ্টিতে তারা একটা বিরাট অধিকার অর্জন করতে সমর্থ হয়েছিল। কারণ, রোমের প্রজাতান্ত্রিক সংবিধানে একজন কনসালের ভিটো প্রয়োগ করার  ক্ষমতা ছিল। কিন্তু বাস্তবে এতে তাদের কি কোনো লাভ হয়েছিল? এর উত্তর হচ্ছে ‘না’। প্লেবিয়ানদের এরকম কোনো প্লেবিয়ান কনসাল অর্জিত হয়নি, যাকে শক্তিশালী কনসাল বলা যেতে পারে। প্লেবিয়ানদের দ্বারা পৃথক নির্বাচনের মাধ্যমে নিযুক্ত হওয়ায় সাধারণভাবে তাদের জন্য একজন শক্তিশালী কনসাল পাওয়া উচিত ছিল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, তারা তাদের জন্য একজন শক্তিশালী কনসাল কেন অর্জন করতে পারেনি? এই প্রশ্নের জবাব এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করবে যে, সাধারণ মানুষের উপর ধর্মের আধিপত্য কতটা সুদূর প্রসারিত। সমগ্র রোম জনসাধারণের সর্বজন স্বীকৃত ধর্মবিশ্বাস ছিল যে, কোনো কর্মচারী সরকারি অফিসে ততক্ষণ কাজ করার উপযুক্ত নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত ‘ডেলফির ওরাকল’ (আদেশ) ঘোষণা না করতো যে, তিনি মন্দিরের দেবীর নিকট গ্রহণযোগ্য হয়েছেন। ডেলফির দেবী মন্দিরে প্যাট্রিসিয়ান জাতির মধ্যে থেকেই পুরোহিত পদে নিযুক্ত করত। যখন প্লেবিয়ানরা তাদের স্বার্থ সম্পর্কে সচেতন একজন শক্তিশালী কনসাল নির্বাচন করত, যিনি প্যাট্রিসিয়ানদের স্বার্থের পরিপন্থী, তখনই ডেলফি মন্দিরের ‘ওরাকল’ (আদেশ) ঘোষণা করত যে, মন্দিরের দেবীর নিকট ঐ ব্যক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। এভাবে প্লেবিয়ানরা তাদের অধিকার থেকে প্রতারিত হত।

    এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্য করার বিষয় এই যে, প্লেবিয়ান জাতি নিজেরাই এইভাবে প্রতারিত হবার অনুমতি দিয়েছিল। কারণ তারাও প্যাট্রিসিয়ান জাতির মতো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত যে, শুধুমাত্র নির্বাচনই যথেষ্ট নয়, সেই সঙ্গে সরকারী অফিসের দায়িত্ব নিতে হলে ডেলফি  মন্দিরের দেবীর সম্মতির প্রয়োজন। যদি প্লেবিয়ানরা এই দাবি করত যে, নির্বাচনই যথেষ্ট এবং তারপর আর দেবীর সম্মতির প্রয়োজন নেই, তাহলে তারা তাদের রাজনৈতিক অধিকারের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে পারত। কিন্তু তারা সেটা করেনি। তারা এমন একজন ব্যক্তিকে নির্বাচন করতে সহমত হত, যিনি তাদের জন্য অনুপযুক্ত হতেন। কিন্তু দেবীর জন্য উপযুক্ত হতেন। অর্থাৎ প্যাট্রিসিয়ানদের স্বার্থের অনুকূল হতেন। যে বাস্তব স্বার্থলাভের জন্য প্লেবিয়ানরা এত কঠোর  সংগ্রাম করেছিল, সেই বাস্তব স্বার্থ তারা ত্যাগ করল; কিন্তু ধর্মীয় বিশ্বাস পরিত্যাগ করতে পারল না। রোমের ইতিহাসের এই সত্য ঘটনা কি এটা প্রমাণ করেনা যে, অর্থের চেয়ে বেশি না হলেও অর্থের সমকক্ষ ধর্মও একটি ক্ষমতার উৎস?

     ভারতীয় সমাজবাদীদের চিন্তাধারায় মারাত্মক ভুল রয়েছে যে, ইউরোপীয় সমাজের বর্তমান সামাজিক অবস্থায় সম্পদই যেহেতু ক্ষমতার উৎস, সেই সত্য ভারতের সমাজব্যবস্থার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য এবং প্রাচীনকালে ইউরোপীয় সমাজের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য ছিল। ধর্ম, সামাকিজ মর্যাদা এবং সম্পদ এই তিনটি জিনিস ক্ষমতা এবং কর্তৃত্বের উৎস হিসাবে কাজ  করে। এই তিনটির যে কোনো একটি দ্বারা একজন মানুষ আর একজন মানুষের স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। একটা অবস্থায় একটা উপাদান প্রভাব বিস্তার করে, অন্য অবস্থায় অন্য একটা উপাদান প্রভাব বিস্তার করে – এটাই শুধু পার্থক্য। যদি স্বাধীনতাকে আদর্শ হিসাবে ধরা হয় এবং স্বাধীনতা বলতে একজনের উপর আর একজন মানুষের প্রভুত্বের অবসান বোঝায় তাহলে একথা দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায়না যে, অর্থনৈতিক সংস্কারের পথই একমাত্র পথ। যাকে অবশ্যই অনুসরণ করা দরকার। যদি কোনো সময়ে কোনো সমাজের প্রচলিত ধর্ম এবং সামাজিক অবস্থা, ক্ষমতা ও প্রভুত্ব বিস্তারের উৎস হিসাবে কাজ করতে থাকে, তবে সেখানে সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারকে একই প্রয়োজনীয় পথ হিসাবে গ্রহণ করতে হবে। (Religion, social status and property are all sources of power and authority, which one man has, to control the liberty of another. One is predominant at one stage, the other is predominant at another stage. That is the only difference. If liberty is the ideal, if liberty means the destruction of the dominion which one man holds over another then obviously it cannot be insisted upon that economic reform must be the one kind of reform worthy of pursuit. If the source of power and dominion is at any given time or in any given society social and religious then social reform and religious reform must be accepted as the necessary sort of reform.)

  এইভাবে ভারতের সমাজবাদীদের দ্বারা গৃহীত (কার্ল মার্ক্সের) ইতিহাসের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা নামক তত্ত্বকে যে কোনো ব্যক্তি সমালোচনা করতে পারেন। কিন্তু আমি একথা স্বীকার করি যে, ইতিহাসের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যাটি সমাজবাদীদের মতবাদ প্রতিষ্ঠা করার জন্য এটার প্রয়োজন নেই    যে,-‘সম্পদের সমবন্টনই একমাত্র প্রকৃত সংস্কার এবং সকল প্রকার সংস্কারের পূর্বে অর্থনৈতিক সংস্কার আগে হওয়া দরকার।’

   যাহোক, আমি সমাজবাদীদেরকে জিজ্ঞাসা করতে চাই যে, আপনারা সামাজিক ব্যবস্থার সংস্কার না করে অর্থনৈতিক সংস্কার করতে পারেন কি? মনে হয়, ভারতের সমাজবাদীরা এই প্রশ্নটি বিবেচনা করেননি। আমি তাদের প্রতি অবিচার করতে চাইনা। এ প্রসঙ্গে আমি একটা চিঠি থেকে উদাহরণ দিচ্ছি। যেটা কিছুদিন আগে আমার একজন বন্ধুকে একজন সমাজবাদী লিখেছিলেন। এতে তিনি লিখেছেন যে, “আমি একথা বিশ্বাস করিনা যে, যতোদিন পর্যন্ত এক শ্রেণি দ্বারা অন্য শ্রেণির উপর অন্যায় অত্যাচার দমননীতি এবং এই ধরণের দুর্ব্যবহার চলতে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত আমরা ভারতের একটা স্বাধীন ও মুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে পারব। যেহেতু আমি সমাজবাদী আদর্শে বিশ্বাসী, তাই আমি বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর মধ্যে পূর্ণ সমব্যবহারের নীতিতে বিশ্বাস করি। আমি মনেকরি, সমাজতন্ত্র এই সমস্ত সমস্যা এবং অন্যান্য সকল সমস্যার একমাত্র প্রতিকার।”

   এখন আমি এই প্রশ্ন করতে চাই, এইটুকু কথা বলাই কি একজন সমাজবাদীর পক্ষে যথেষ্ট  যে, “বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে পূর্ণ সম ব্যবহারের নীতিতে আমি বিশ্বাস করি?’’ যদি বলা হয় যে, এরকম বিশ্বাস যথেষ্ট তাহলে সমাজতন্ত্র সম্বন্ধে পূর্ণ জ্ঞানের অভাবই প্রকাশ পায়। যদি সমাজতন্ত্র একটি বাস্তব প্রোগ্রাম হয় এবং যদি সেটা শুধুমাত্র দূরের এবং বহুদূরের আদর্শ না হয়, তবে সমতার নীতিতে বিশ্বাস করেন কিনা – এই প্রশ্ন একজন সমাজবাদীর কাছে বড় প্রশ্ন নয় একজন সমাজবাদীর কাছে বড় প্রশ্ন হল, ভারতে যে এক শ্রেণির মানুষ আর এক শ্রেণির মানুষের উপর ক্রমাগত অন্যায়, অত্যাচার ও শোষণ করছে – তার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ করবেন কি না এবং এই অত্যাচার ও নির্দয় ব্যবহারের ফলে বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে যে বিক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছে, তার প্রতিকারের জন্য আন্দোলন করবেন কি না?

   এখন আমি আমার মতবাদকে সম্পূর্ণ রূপে ব্যাখ্যা করার জন্য সেই কারণগুলোর বিশ্লেষণ করব, যেটা সমাজবাদ প্রাপ্তির মধ্যে নিহিত আছে। একথা সুস্পষ্ট যে, রাষ্ট্র বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল না করা পর্যন্ত সমাজবাদীদের মতানুসারে অর্থনৈতিক সংস্কার আসতে পারেনা। সেই রাষ্ট্র বিপ্লবে ক্ষমতা দখল অবশ্যই সর্বহারার নেতৃত্বে হাওয়া দরকার। এ বিষয়ে আমার প্রথম প্রশ্ন এই যে, ভারতের সর্বহারাবর্গ এই বিপ্লব অর্জনের জন্য সংগঠিত হবে কি? এই ধরণের বিপ্লব করার জন্য কিভাবে তারা অনুপ্রেরিত হবে? আমার মনে হয় মানুষের মধ্যে অন্যান্য বিষয়গুলি সমান  হলেও যে বিষয়টি মানুষকে বিপ্লবের পথে অগ্রসর হতে অনুপ্রেরণা যোগায়, সেটা হল আত্ম অনুভূতি। একজন মানুষের যদি এই অনুভূতির দৃঢ় বিশ্বাস থাকে যে, যাদের সঙ্গে সে বিপদসংকুল আন্দোলনের পথে অগ্রসর হবে সেই সব আন্দোলনকারীরা সমতা, ভ্রাতৃত্ববোধ বা ভাইচারা আর এর থেকেও বড় ন্যায় বিচারের নীতিগুলি মনে প্রাণে মেনে চলবে, তাহলে সে আন্দোলন করতে এগিয়ে আসতে পারে। যতক্ষণ পর্যন্ত বুঝতে না পারবে যে, রাষ্ট্রব্যাপী আন্দোলন সফল হওয়ার পর তারা সকলে সমব্যবহার পাবে এবং জাতিগত শ্রেণিগত বর্ণগত ও ধর্মগত কোনো বৈষম্য থাকবেনা, ততক্ষণ পর্যন্ত শুধুমাত্র সম্পদের সমবন্টনের প্রলোভনে পড়ে কোনো মানুষ আন্দোলনে যোগদান করবেনা। (The only thing that will move one man to take such an action is the feeling that other man with whom he is acting are actuated join in a revolution for the equalization of property unless they know that after the revolution is achieved they will be treated equally and that there will be no discrimination of caste and creed. The assurance of a socialist leading the revolution that he does not believe in caste, I am sure, will not suffice. The assurance must me the assurance proceeding from much deeper foundation, namely, the mental attitude of the compatriots towards one another in their spirit of personal equality and fraternity.)

    বিপ্লব পরিচালনাকারী কোন সমাজবাদী যদি এই আশ্বাস দেন যে, তিনি জাতিভেদ প্রথায় বিশ্বাস করেন না। আমার মতে এটা যথেষ্ট নয়। আশ্বাস এমন হওয়া দরকার যে, যার পিছনে সুগভীর ভিত্তি থাকে। অর্থাৎ একজন দেশবাসীর মানসিক ব্যবহার অন্যের প্রতি ব্যক্তিগত সমানতা আর ভাইচারার ভাবনা পূর্ণ হওয়া দরকার। একথা বলা যেতে পারে কি ভারতের সর্বহারা বর্গ ধনী আর দরিদ্র ছাড়া অন্য কোনো বিভেদ বা পার্থক্য স্বীকার করেনা? এটা বলা যেতে পারে কি  যে, ভারতে গরীব লোকেরা জাতি-বর্ণ-ধর্ম, উচ্চনীচ এই ধরণের বিভেদ স্বীকার করেনা? যদি   এটা সত্য হয় যে, ভারতের দরিদ্র শ্রেণি ঐ সব ভেদাভেদ স্বীকার করে, তবে এরকম সর্বহারাদের থেকে ধনীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য কোন্‌ ঐক্যবদ্ধতার আশা করা যেতে পারে? যদি সর্বহারাবর্গ সংগঠিতভাবে আন্দোলন না করে তাহলে বিপ্লব কিভাবে হবে? তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া হয়, যে কোনো কারণে বিপ্লব হল এবং সমাজতন্ত্রীদল ক্ষমতা দখল করল তখন কি তাদের ভারতের প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা থেকে উদ্ধৃত সমস্যাবলী নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না? আমি ভাবতে পারি না যে, ভারতের জনগণের মধ্যে যে উচ্-নীচ, পবিত্র-অপবিত্র ভেদাভেদ আছে এবং ঐ রকম ভেদাভেদের কারণ বা ধারণা থেকে উৎপন্ন সমস্যাগুলির সমাধান না করে ভারতবর্ষে একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র এক সেকেণ্ড সময়ের জন্যও কিভাবে কাজ করতে পারে?

যদি প্রকৃত সমাজবাদীরা সমাজতন্ত্রের সুন্দর সুন্দর বুলিতে খুশি না থাকেন, যদি তাঁরা সমাজতন্ত্রকে বাস্তব রূপ দিতে চান, তাহলে তাদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, ভারতের সমাজ সংস্কারের সমস্যাই প্রধান এবং এই সমস্যার সমাধান ছাড়া অন্য কোনো রাস্তা নেই। ভারতের প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে সমাজতান্ত্রিকদের অবশ্যই ভাবতে হবে। যতক্ষণ তাঁরা এটা না করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁরা তাদের কাঙ্খিত বিপ্লব অর্জন করতে পারবেন না। আর যদি সৌভাগ্যবশত বিপ্লব অর্জন করেন তখন তাদের আদর্শ প্রাপ্ত করার জন্য এই সমস্যার সঙ্গে লড়তে হবে। আমার মতে, এটা এমন একটা তথ্য যেটা নির্বিবাদ।

   আপনারা যেদিকেই তাকাবেন, জাত নামক শয়তানটাকে সেদিকেই দেখতে পাবেন; সে আপনার পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আপনারা যতক্ষণ এই জাত নামক শয়তানটাকে মারতে না পারছেন, ততক্ষণ রাজনৈতিক সংস্কার কেন, অর্থনৈতিক সংস্কার ও করতে পারবেন না। (Turn in any direction you like, caste the monster that crosses your path. You cannot have political reform, you cannot have economic reform, unless you kill this monster.)

Read More

Sunday, 22 January 2023

// // Leave a Comment

হিন্দু কোড বিল ও সংরক্ষণে মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের অবদান। লেখক -জগদীশচন্দ্র রায়

 



হিন্দু কোড বিল ও সংরক্ষণে মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের অবদান।

লেখক -জগদীশচন্দ্র রায়

(লেখাটি শেষ পর্যন্ত না পড়ে কেউ অভিমত প্রকাশ করবেন না আশা করি। এখানে দয়া করে কেউ বাবা সাহেব এবং মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করার চেষ্টা করবেন না।)      

     আমরা প্রায় সকলেই জানি, হিন্দু কোড বিল ড. বাবাসাহেব আম্বদেকর প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু এই বিলের খসড়া সর্বপ্রথম কে প্রস্তুত করেছিলেন সেটা আমরা অনেকেই জানি না।


আসুন সেই আলোচনায় প্রবেশ করা যাক।

    হিন্দু সমাজের মহিলাদের অধিকার নিয়ে ইংরেজরা বিভিন্ন সময় আইনের পরিবর্তন করেছেন। হিন্দুদের সর্বজনগ্রাহ্য নিশ্চিত কোনো গ্রন্থ না থাকার জন্য স্থান, কাল, পরিস্থিতি এবং পরম্পরার উপর নির্ভর করে বিভিন্ন নিয়ম প্রচলিত ছিল। ইংরেজ শাসকরা ভারতীয় মহিলাদের মানবিক অধিকারকে আইনগত চেষ্টা চালিয়ে গেছে। যেমন-

১) জাতিগত অযোগ্যতা বিলোপ আইন– ১৮৫০

২) হিন্দু বিধবা আইন-১৮৫৬

৩) ভারতীয়দের উত্তরারিধার আইন- ১৯২৫

৪) স্থানীয় ধর্মান্তরিতদের বিবাহ-বিচ্ছেদ আইন- ১৮৬৬

৫) সম্পত্তি হস্তান্তরণ আইন-১৮৮২ সংশোধন-১৯২৯ 

৬) ভারতীয় প্রাপ্তবয়স্কতা আইন-১৮৭৫

৬) (১) ভারতীয় বিবাহবিচ্ছে আইন-১৮৮৯

৭) অভিভাবক ও সংরক্ষক আইন-১৮৯০

৮) সম্পত্তি হস্তান্তরণ (পরিপুরক) আইন-১৯১৪, ১৯১৬ আর ১৯২১

৯) হিন্দু অধ্যায়ন সুবিধা আইন- ১৯৩০

১০) হিন্দু মহিলাদের সম্পত্তির অধিকার আইন- ১৯৩৭

         হিন্দু আইন সংশোধন ও সঙ্কলন করার কাজ বেশ কিছুদিন পূর্বে থেকেই চলে আসছিল ব্রিটিশদের করে দেওয়া কমিটির মাধ্যমে। ১৯৪১ সালে স্যার বি.এন.রাও এই কমিটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। সারা দেশে ঘুরে বিভিন্ন মতামত ঐ কমিটি সংগ্রহ করে। আর কমিটির রিপোর্ট জমা পড়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আইনমন্ত্রী মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের কাছে। উল্লেখিত আইনের সঙ্গে তার বিকাশের গতি প্রদানের জন্য ৪ নভেম্বর ১৯৪৬ সালে অন্তর্বর্তি সরকারের আইন মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল ‘হিন্দু কোড বিল’-এর খসড়া প্রস্তুত করেন এবং ১৯৪৬  সালে কেন্দ্রীয় আইনসভায় পেশ করেন। বিলটি আইন সভায় পেশ করার কয়েকদিনের মধ্যেই ভারত ভাগের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়ে যায়। তাই এই হিন্দু কোড বিল নিয়ে মহাপ্রাণ আর কিছু করার সুযোগ পাননি।   

     দেশ বিভাগের নানা পরিবেশ পরিস্থিতির জন্য হিন্দু কোড বিল নিয়ে পার্লামেন্টে আর আলোচনা হয়নি। বিলটি পার্লামেন্টে থেকে যায়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ফলে খণ্ডিত ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রী হন ড. বাবাসাহেব আম্বেদকর। সামাজিক বৈষম্য দূর করতে এবং নারীদের অধিকার  প্রতিষ্ঠার  জন্য বাবাসাহেব আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। আর সেই ক্ষেত্রে মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল কর্তৃক হিন্দু কোড বিলের খসড়া বাবাসাহেবের হাতে পড়ায় তাঁর কাজ অনেক সহজ হয়েছিল। সামাজিক সমতা ও নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য একটি আইন সম্মত স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার জন্য বাবাসাহেব আইনমন্ত্রী হিসেবে তিনি মহান দায়িত্ব পালন অবশ্যই করতেন। কিন্তু  হিন্দুকোড বিলের মতো একটি খসড়া পূর্ব থেকেই আইন সভায় ছিল, যেটা তৈরি করে অখণ্ড ভারতের ব্রিটিশ আইনসভায় পেশ  করেছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের আইনমন্ত্রী মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। মহাপ্রাণের পেশ করা সেই হিন্দু কোড বিলটি মহান বাবাসাহেবের হস্তগত হয়। তিনি মহাপ্রাণের রেখে যাওয়া খসড়া হিন্দুকোড বিলটি বঞ্চিত জনতার মহান মুক্তিদূত বাবাসাহেব হাতে পড়লে তিনি সেটিকে আরো সুন্দর পরিমার্জিত ও সময় উপযোগী করে পার্লামেন্টে পেশ করেন। যেটি ঐতিহাসিক হিন্দুকোড বিল নামে খ্যাত।   

     এবার অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন হিন্দুকোড বিলের খসড়া মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল তৈরি করেছিলেন তার প্রমাণ কী? এবার সে বিষয়ে আসল তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করছি। অনুসন্ধানী পাঠকরা তথ্য যাচাই করে দেখতে পারেন।    

Sixth Legislative Assembly 1947, 3rd Session, Volume V - Pg 3327 Hindu Code Bill


HINDU CODE

The Honourable Mr. Jogendra Nath Mandal (Law Member): Sir, I move for leave to introduce a Bill to amend and codify certain branches of the Hindu Law.

Mr. President: The question is:

    “That leave be granted to introduce a Bill to amend and codify certain branches of the Hindu Law.”

    The motion was adopted.

    The Honourable Mr. Jogendra Nath Mandal: Sir, I introduce the Bill. With your permission I want to make mention of one other, point, as the Honourable Members of this House might be interested to know what steps Government propose to take regarding this Bill. Government propose to circulate the Bill by Executive Order for eliciting public opinion, and on receipt of public opinion Government propose to move a motion in the next Session of the Assembly for the reference of the Bill to a Joint Committee of both the Houses o Legislature. I only wanted to make this known to the Honourable Members of this House.

           এই ঐতিহাসিক তথ্যের প্রমাণ হিসাবে তৎকালীন সংবিধান সভার অধ্যক্ষের দ্বারা সংবিধান সভায় প্রশ্ন-উত্তরের কিছু বক্তব্য তুলে ধরা হল। হিন্দু কোড বিল পার্ট-২ এর বিবাহ এবং ভরণপোষণ বিষয়ের উপর বিতর্কে Mr. Naziruddin Ahmed বলেন- “When the Bill was prepared it was introduced by Mr. Jogendra Nath Mandal, the Minister of Law of the Interim Government.” (Dr. Babasaheb Ambedkar Writing and Speeches Vol. 14 part-1 page-534) অর্থাৎ বিলটি যখন তৈরি করা হয়েছিল তখন এটি অন্তর্বর্তী সরকারের আইনমন্ত্রী মি. যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল এটি উপস্থাপন করেছিলেন।  

Mr. Naziruddin Ahmad: I submit that the original Bill was introduced by Mr. Jogendra Nath Mandal. It bears the printing date 1st, August 1946. This was the Bill which was sent to the Select Committee. A Bill printed on 16th August 1948 is the Bill that came out of the Select Committee with the report. (Vol -14, part-1, p- 450)

      বিলটি গণপরিষদে পর্যালোচনার সময় Mr. Naziruddin Ahmed অন্য সময় বলেন, “He (এখানে He বলতে মহান বাবাসাহেব) pointed out with commendable thoroughness the departures made in the Final Bill from the Original Mr. Jogendra Nath Mondals Bill.” (তথ্য: ঐ page number 467) অর্থাৎ তিনি (বাবা সাহেব আম্বেদকর) প্রশংসাতীত পুঙ্খানুপুঙ্খতার সাথে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের মূল বিল থেকে চূড়ান্ত বিলের উপস্থাপনের কথা বলেছেন।

      বিলটি গণপরিষদে পর্যালোচনার সময় অন্য আর এক স্থানে Mr. Naziruddin বলেন, “It is easy for anyone who has the patience to compare the original Bill presented by Mr. Jogendranath Mandal to the House with the revised Bill to see the difference.” (তথ্য: ঐ p- 466) অর্থাৎ যার ধৈর্য আছে তাঁর পক্ষে মি. যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল কর্তৃক হাউসে উপস্থাপিত মূল বিলটিকে সংশোধিত বিলের সাথে তুলনা করা সহজ।)  

    স্পিকার বলেন, “মি. যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল যে মূল বিলটি পেশ করেছিলেন তার পরিকল্পনা ও বিষয়বস্তুতে ব্যাপক পার্থক্য করা হয়েছে।”(ক)  

       মি. নাজিরুদ্দিন সদস্যদের সামনে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “অতএব মি. যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল যে বিলটি পেশ করেছিলেন তা ড. আম্বেদকর অনানুষ্ঠানিকভাবে (Informal) বিলে রুপান্তরিত করেছিলেন।(খ)    

    সরদার বি. এস. মান শিখদের পক্ষ থেকে বিল সম্পর্কে বলেন, “ যদিও ড. আম্বেদকর মাননীয় যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল কর্তৃক প্রস্তুত করা হিন্দু কোড বিলকে বিকশিত করার চেষ্টা করছেন তবুও এই বিলকে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের সন্তান (offspring) বলা হবে।”গ ( উপরের তিনটি তথ্য অর্থাৎ ক,খ, গ  গ্রহণ করা হয়েছে- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল জীবন আউর বিচার (হিন্দি)- লেখক- শিলপ্রিয় বৌদ্ধ, পৃ. ৮০-৮১) 

   এবার আমরা দেখে নেই ড. আম্বেদকর নিজেই তাঁর বিবৃতিতে বলেছিলেন, “Now I came to an important circumstance to which I would like to make definite reference. The House will remember that after the Bill was introduced in the House by Mr. Mandal – and it was introduced after the Rau Committee’s investigation was complete- even then Government promised that they would issue an executive circular to the various provincial Governments and invite their opinion on the Bill as introduced. That circular was also sent to Punjab.” (তথ্য: ঐ- Vol.-2, page– 1173) অর্থাৎ আমি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতিতে এসেছি যা আমি নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করতে চাই। হাউস মনে করবে যে বিলটি মি. মণ্ডল কর্তৃক উত্থাপন করা হয়েছিল। যেটি রাও কমিটির তদন্ত শেষ হবার পর উত্থাপিত হয়েছিল। এরপর সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিভিন্ন প্রাদেশিক সরকারকে একটি কার্যনির্বাহক বিজ্ঞপ্তি জারি করবে এবং তাদের মতামতের জন্য আমন্ত্রণ জানাবে। উত্থাপন করা বিলের সার্কুলার পাঞ্জাবেও পাঠানো হয়েছিল।

     পরিশেষে জানাই, ড. সঞ্জয় গাজভীয়ে, যিনি মহাপ্রাণ ও বাবাসাহেবের উপর পি এইচডি করেছেন। তাঁর বইয়ের নাম “সাংবিধানিক ভারত কী নির্মাতা ড. বাবাসাহেব আম্বেদকর ও মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল।” তিনি কিছুদিন আগে এক লাইভ বক্তব্যে জানিয়েছেন যে, “হিন্দু কোড বিলের জননী মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল।”

 উপরোক্ত রেফারেন্স থেকে জানা যায় যে, “মন্ডলজি দ্বারা প্রস্তুত করা তথা ড. আম্বেদকর দ্বারা সংশোধিত ও পরিবর্ধিত বিলের যে বিরোধ হয়েছিল তার যথোপযুক্তভাবে ড. আম্বেদকর মোকাবিলা করেছিলেন। তিনি হিন্দু, শিখ, পার্সি, খ্রীষ্টান, মুসলমানদের জন্য বুদ্ধিমত্তা পূর্ণ আইন সঙ্গত অকাট্য যুক্তির মাধ্যমে বিরোধিদের বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর সেই প্রচেষ্টার ফলে ১৭ই নভেম্বর ১৯৪৭ সাল থেকে ২৫শে সেপ্টেম্বর ১৯৫১ সাল পর্যন্ত হিন্দু কোড বিলটি নিয়ে ড. আম্বেদকর তাঁর শারীরিক অসুস্থতা থাকা সত্ত্বেও অনেক ঝুঁকি নিয়েও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে লড়াই করেছিলেন। কিন্তু রক্ষণশীলরা ভারতীয় নারীদের অধিকারের হিন্দু কোডবিল গ্রহণ করেনি।” (হিন্দি থেকে অনুবাদ)। (তথ্য গ্রন্থ- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্র নাথ মন্ডল জীবন আউর বিচার, লেখক -শিলপ্রিয় বৌদ্ধ, পৃষ্ঠা ৮০-৮১)    

     এখানে অবশ্যই মনে রাখতে হবে বাবা সাহেব যখন হিন্দু কোড বিল নিয়ে পার্লামেন্টে জোর লড়াই করছেন তখন কিন্তু মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল পাকিস্তানের সংবিধান রচনায় এবং হিন্দু, বৌদ্ধদের সাংবিধানিকভাবে সংখ্যার ভিত্তিতে সবকিছুতে সংরক্ষণ অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন।

দেশভাগ তথা বাংলাভাগ হওয়ার পর বাংলার নিরিহ অসহায় অমুসলমানদের দেখার জন্য কোনো নেতৃত্বকে তেমনভাবে চোখে পড়ে না। যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলও দিশাহীন হয়ে পড়লেন। তখন তিনি বাবাসাহেব আম্বেদকরের শরনাপন্ন হয়ে চিঠি লিখলেন। কারণ, বাবাসাহেবকে তিনি রাজনৈতিক গুরু হিসাবে মেনে চলতেন। তাই এই রকম পরিস্থিতিতে তাঁর কী করা উচিত সে বিষয়ে বাবাসাহেব একটা চিঠি লিখলেন ২রা জুন ১৯৪৭। যায় কয়েকটি লাইন এখানে তুলে ধরছি। (সম্পূর্ণ চিঠিটি পরিশিষ্টে দেওয়া হয়েছে।)    

“The only course left to the Scheduled castes is to fight for safeguards either in United Bengal or a divided Bengal. ---- I agree that you should work in alliance with the League and secure adequate safeguards for them. ----The Muslim League, however, will be ready to give to the Scheduled Castes separate electorates more probably because they themselves want separate electorates for their own community. So far as the Eastern Bengal Scheduled Castes are concerned that no doubt is an advantage.” (তথ্য- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ, লেখক-জগদীশচন্দ্র মণ্ডল, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ২-৪)

    বাবাসাহেবের পরামর্শ মতো তিনি ভারতে না গিয়ে আপন সমাজের দরিদ্র অসহায়দের স্বার্থে পূর্বপাকিস্তানে থেকে গেলেন। দুঃখের বিষয় বাবাসাহেবের এই চিঠির বিষয়ে এখনো বেশিরভাগ মানুষ জানেন না বা জানলেও না জানার ভান করে কুৎসা রটাতে থাকেন।    

    এরপর তিনি পূর্বপাকিস্তানের তপশিলি ও অন্যান্য নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের পরামর্শক্রমেই ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট পাকিস্তানের মুসলিমলীগ মন্ত্রীসভায় আইন ও শ্রম মন্ত্রী হিসাবে যোগদান করেন।

    মন্ত্রীসভায় যোগদান করে তিনি তপশিলিদের স্বার্থে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তবে তাঁর এই মন্ত্রীসভায় যোগদানকে জিন্না, নাজিমুদ্দিন ও সুরাবর্দি ছাড়া অন্যরা ভালোভাবে মেনে নিতে পারছিলেন না। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকৎ আলি। এখান থেকেই শুরু হয় যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে বিতাড়িত করার চিত্রনাট্য।

 সেই মর্মে মহাপ্রাণ যোগেন্দ্র নাথ মন্ডল পাকিস্তানের সংবিধান লেখা সম্পূর্ণ করে জিন্নাসহ অনেককেই দেখান এবং তাদের সঙ্গে অগ্রিম পরামর্শ করেন। কিন্তু প্রায় হঠাৎ করে জিন্নার অকাল প্রয়াণ ঘটে। যদিও বলা হয় তিনি যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। শুধুমাত্র সংবিধান নয় জিন্নার সর্ব ধর্মের প্রতি উদার মানসিকতা পশ্চিম পাকিস্তানের কট্টর ইসলাম ধর্মের মৌলবাদীরা মেনে নিতে পারছিলেন না। জিন্না ছিলেন সংস্কারপন্থী। জিন্না একই সঙ্গে মন্দির মসজিদ, গির্জা, এবং সমস্ত ধর্মের ধর্ম  ব্যবসায়ীর ধর্ম গুরুদের বিপক্ষে ছিলেন। এমনকি জিন্না জীবনে কোনদিন নামাজ পর্যন্ত পড়েননি। আর কট্টর ইসলাম ধর্মের মৌলবাদীরা ছিল ইসলাম ধর্মের সংস্কারের বিপক্ষে। জিন্নার মৃত্যু মানে মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের হিন্দু সহ সমস্ত সংখ্যা লঘুদের জন্য সুরক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের পরিসমাপ্তি। যার পরিণতিতে পূর্ব এবং  পশ্চিম পাকিস্তানের হিন্দুসহ সমস্ত সংখ্যা লঘুদের উপর পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের মুসলিম আগ্রাসন। মহাপ্রাণ যোগেন্দ্র নাথ মণ্ডলকেও মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র হলে মহাপ্রাণ ১৯৫০ সালে পূর্ব  পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে যাবার নাম করে কলকাতা বিমানবন্দরে নেমে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। মহাপ্রাণ শেষ মূহুর্তে এ বিষয়ে পরামর্শ করে নিয়েছিলেন তৎকালীন পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ড.বিধান চন্দ্র রায়ের সঙ্গে।

     মহাপ্রাণ ১৯৫০ সালে ভারতে চলে আসেন। তখন হিন্দু কোড বিল নিয়ে ভারতের আইনসভায় উত্তাল পরিস্থিতি। মহাপ্রাণ এতটাই বাবা সাহেবকে সম্মান ও বিশ্বাস করতেন যে হিন্দু কোড বিলের জোর লড়াইয়ের সময় মহাপ্রাণ যোগেন্দ্র নাথ মন্ডল একবারও দাবি করেননি যে ঐ হিন্দু কোড বিলের খসড়া তিনি প্রস্তুত করেছিলেন। আর এক্ষেত্রেও আবার প্রমাণিত হল যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল উদারতা ও মহত্ত্ব। যার জন্য তাঁর আর এক নাম ‘মহাপ্রাণ’।     

     আমরা অনেকেই জানি ১৯৬৫ সালের লকুড় কমিটির সুপারিশ বাতিল করতে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর শরনাপন্ন হয়েছিলেন এবং কমিটির সুপারিশ বাতিল করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যার ফলশ্রুতিতে এখনও পর্যন্ত বাংলার নম:শুদ্র, রাজবংশী, ধোপা, সাহা(সুড়ি) সহ সারা ভারতের আরো পঁচিশটি সর্বমোট ঊনত্রিশটি জাতি সংরক্ষণ এর সুযোগ বা অধিকার ভোগ  করে চলেছে।  

      কিন্তু এটাও আমাদের অনেকেরই জানা নেই ১৯৫৭ সালে জহরলাল নেহরুর তথা কংগ্রেসী মন্ত্রীসভা বৌদ্ধধম্মে ধর্মান্তরিত তফশিলি সমাজকে সংরক্ষণ এর যাবতীয় সুযোগ থেকে বাদ দেবার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৫৬ সালে বাবা সাহেব প্রয়াত হন। তাই বৌদ্ধধম্ম গ্রহণকারী তফশিলি ও আদিবাসী   সমাজের মহাসংকটে তাদের হয়ে লড়াইয়ের নেতৃত্ব দেবার মতো কাউকে তাঁরা খুঁজে পাচ্ছিলেন না।  বৌদ্ধধম্ম গ্রহণকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশিরভাগ ছিলেন বাবাসাহেবের নিজের মহারাষ্ট্রের মাহার  সম্প্রদায়। শেষ পর্যন্ত তফশিলী ও আদিবাসী অথচ বৌদ্ধধম্ম গ্রহকারীদের পক্ষ থেকে সংরক্ষণের  সুযোগ ধরে রাখতে মহাপ্রাণ যোগেন্দ্র নাথ মন্ডলের শরনাপন্ন হন। মহাপ্রাণকে অনুরোধ করা হয়, ‘আপনি কিছু করুন।’ তখন তিনি প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরুকে চিঠি লেখেন। নেহেরুজি সেই চিঠির জবাবে জানালেন, ‘আমার ব্যক্তিগত কোনো অমত নেই। কিন্তু আমার মনে হয় সংবিধান এটা পারমিট করছে না।’   

     তখন নেহেরুর এই জবাবে যোগেন্দ্রনাথ জানান, “আপনি হয়তো ভুলে গেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আইনমন্ত্রী আমি ছিলাম। কাজেই ভারতের সংবিধানে কতটা আইনগত বাধা আছে বা সুযোগ আছে সেটা সম্বন্ধে আমি ওয়াকিবহাল। Caste is by birth কাজেই এটার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই।” (জগদীশ চন্দ্র মণ্ডলের সাক্ষাৎর, বই- ইতিহাসে প্রেক্ষাপটে মহাপ্রাণ, পৃষ্ঠা ৬২)

 যোগেন্দ্রনাথ নেহেরুজিকে আরো জানানা, “No where is our Constitution the terminology “Scheduled Castes,” Has been defined except a reference to Article 341 which again refers to the notification of the president specifying the castes which shall be deemed to be Scheduled Castes for the purpose of this Constitution. There is no mention anywhere that the communities to be included in the list Scheduled Castes shall profess Hindu religion. Many I reiterate, religion was never taken to be the criterion in this regard.

--May I Point out to you in this connection, that although the Sikhs do not subscribe to caste system, the following four castes among the Sikhs viz Mazhabi, Ramdasi, Kabirpanthi and Sikligar have been included in the President’s constitution (Scheduled Castes) order 1950.78 (তথ্য– মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ ৭ম খণ্ড, লেখক- জগদীশ চন্দ্র মণ্ডল, পৃষ্ঠা ৭৯-৮৬)  

    এইভাবে আইনের বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে জহরলাল নেহরুকে বৌদ্ধধম্মে ধর্মান্তরিতদের জন্য সংরক্ষণের পক্ষে চিঠি পত্রের মাধ্যমে জোর সওয়াল করেন। মহাপ্রাণ জহরলাল নেহরু সঙ্গে তীব্র লড়াই করে বৌদ্ধদের সংরক্ষণের আওতায় রেখে দিতে সমর্থ হন। এখানেও যোগেন্দ্র নাথ মন্ডল মহান, মহৎ প্রাণ যার আর এক নাম মহাপ্রাণ।  

      এখানেই মহাপ্রাণ এবং বাবা সাহেবের মহত্ব। আমরা প্রায় শুনতে পাই ৫০ থেকে ৫৬ এর মধ্যে বাবাসাহবে ও মহাপ্রাণের কোনো যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু এই দুই মহামানব আজীবন সমাজ কল্যাণ কর্মে হরিহর আত্মা ছিলেন। এ প্রসঙ্গে জানাই, ‘১৯৫৬ সালের শেষ দিকে পাটনায় ডাঃ রাম মনোহর লোহিয়ার নেতৃত্বে একটি সভা হয়। যেখানে সমস্ত অবহেলিত নিপীড়িত শ্রণীকে একটি যৌথ ফোরামে এনে আম্বেদকরের নেতৃত্বে চালানো হবে। যোগেন্দ্রনাথ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। দুর্ভাগ্য  অসুস্থতার জন্য আম্বেদকর উপস্থিত হতে পারেননি। ১৯৫৬ সালের ৬ই ডিসেম্বর একটি বিষণ্ণ দিন। ডঃ আম্বেদকরের পরিনির্বাণে ভেঙে পড়েন যোগেন্দ্রনাথ। পরবর্তী শোকসভায় তাঁর কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে গেছিল। ( তথ্য- জয় ভীম, লেখক- পীযুষ গায়েন, পৃষ্ঠা ১৮৬)। অথচ ইদানিং দেখতে পাই তথাকথিত  আম্বেদকরবাদীদের একটা বিরাট অংশ বিভিন্নভাবে মহাপ্রাণের ভুল ধরে তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করে চলেছেন। আম্বেদকর ও মহাপ্রাণের দর্শন না বোঝা এই অতিশয় বহুজন আন্দোলন বোঝা পণ্ডিত বর্গের জন্য একটাই  উপাধি “ধ্বংসাত্মক ভয়ংকর আম্বেদকরবাদী”। বেশ কয়েকজন তো আগে পিছে না ভেবে বাবা সাহেবকে মুসলমান বিদ্বেষী তকমাও লাগিয়ে দিয়ে চলেছে এবং মহাপ্রাণকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। এর বিষময় ফল এবং ভবিষ্যত পরিণাম কী হতে পারে? উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম। যারা মহাপ্রাণের রেখে যাওয়া সংরক্ষণের সুযোগ নিয়ে তাঁরই বিপক্ষে কথা বলছে আর যাইহোক বাংলাসহ সারাভারতে তাদের মুখে বহুজন আন্দোলনের কথা মানায় কি?

                          --------------------------------

https://youtu.be/6Zm4QY0ftXw?si=CWRHribE45Bv6uyG

Read More