মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের প্রতি বর্ণ হিন্দুদের দ্বারা বিষ ছড়ানোর পিছনের কারণ কী? যেখানে তিনি না কংগ্রেস না গান্ধীকে ছেড়ে কথা বলেছেন। আবার তাঁর স্বজাতি প্রেম যে কতো গভীর নিচের এই ভাষণ পড়লে সেটা অনুধাবন করা যাবে।
মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল: অধিকার আদায়ের আপসহীন কণ্ঠস্বর
বর্ণহিন্দুদের বিদ্বেষের
অন্যতম প্রধান কারণ ছিল যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের স্পষ্টবাদিতা ও আপসহীন রাজনৈতিক
অবস্থান। বিশেষ করে তাঁর নিচের এই ভাষণটি পড়লে বোঝা যায়, তিনি কেন সেদিন
কংগ্রেস কিংবা গান্ধী—কাউকেই রেয়াত করেননি। এই ভাষণটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং তাঁর প্রগাঢ়
স্বজাতি প্রেমের এক অনন্য দলিল।
করিমগঞ্জে আসাম প্রাদেশিক
তফসিলী ফেডারেশনের অধিবেশন
সভাপতি
মাননীয় শ্রীযুত যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল
(তথ্য- মহাপ্রাণ
যোগেন্দ্রনাথ, ২য় খণ্ড, লেখক- জগদীশ চন্দ্র মণ্ডল, পৃ. ১৩১-১৩৩)
----অতঃপর সম্মেলনের সভাপতি
যোগেন্দ্রনাথ মুহুর্মুহু জয়ধ্বনির মধ্যে তাঁহার আড়াই ঘণ্টাব্যাপী অভিভাষণে
বলেন:-মুসলিম লীগ আমাকে অন্তর্বর্তী সরকারে মনোনীত করায় কংগ্রেসীরা প্রচার
করিয়াছিলেন আমি নাকি মুসলমান হইয়া গিয়াছি। তদুত্তরে আমি বলিতে চাই, বর্ণ-হিন্দু
প্রতিষ্ঠান কংগ্রেস মিঃ আসফ আলী ও মৌলানা আজাদ, যাহারা আজও
মুসলমান বলিয়া পরিচয় দেন এ দুই জনকে মনোনীত করায় তাঁহারা যেমন হিন্দু হন নাই, তদ্রুপ আমিও
মুসলমান হই নাই। যদি তাঁহারা বলেন যে, তাঁহারা হিন্দু হইয়া গিয়াছেন তবে
কংগ্রেস সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠান বলিয়া দাবি করে কিরূপে?
মিঃ গান্ধী বলেন, ইহা মিঃ জিন্নার একটি ষড়যন্ত্র। কিন্তু মিঃ গান্ধী ভুলিয়া যান তিনি যখন
কংগ্রেসী "শো-বয়" মিঃ জগজীবন রামকে অন্তর্বর্তী সরকারে মনোনীত করেন, তখন ষড়যন্ত্র হয় না, ষড়যন্ত্র হয় তখন, যখন মিঃ জিন্না ৮ কোটি তফসিলী জাতির প্রকৃত প্রতিনিধিকে অন্তর্বর্তী সরকারে
স্থান দেন। এটাই বুঝি মহাত্মার মাহাত্ম্যের স্বরূপ?
বর্ণহিন্দুদের যুগ যুগ ব্যাপী
নির্যাতনের কথা উল্লেখ করিয়া যোগেন্দ্রনাথ বলেনঃ “ভগবানের
সৃষ্ট মানুষ আমরা, কিন্তু মানুষ হইয়াও জন্মগত কারণে আজ আমরা মানুষের
অধিকার হইতে বঞ্চিত।” ভারতের দক্ষিণাংশে আজও
আমাদের উপর যে নির্যাতন চলিতেছে তাহার তুলনা সমস্ত সভ্যজগতে মিলে না। সেখানে
মন্দিরের দ্বার আমাদের নিকট চিরদিনের জন্য বন্ধ। শাস্ত্র আলোচনা তো দূরের কথা, শাস্ত্রের
বচন শুনিলেও যে শাস্তির বিধান আছে, তাহা মানবতার কলঙ্ক। সেখানে
রাস্তা-ঘাট, পুকুর, বাজার, স্কুল সব
কিছুই আমাদের জন্য পৃথক। তাই আজ আমাদের দাবি, সব কিছুই যখন আমাদের পৃথক করিয়া
দিয়াছ, তখন
নির্বাচনটাও আমাদের জন্য পৃথক করিয়া দাও, কিন্তু ইহাতে বাপুজীর স্বার্থে আঘাত
পড়ে, আজ
তফসিলী জাতি তাহাদের সম্বন্ধে সচেতন, তাহারা তাহাদের দাবি আদায় করিবেই
করিবে।
মিঃ
গান্ধীর রাম রাজত্বের কথা উল্লেখ করিয়া তিনি বলেন: আজ মিঃ গান্ধী রাম রাজত্বের
জন্য চিৎকার করিতেছেন। কিন্তু এই রাম রাজত্বেই রামচন্দ্রের গুরু 'বশিষ্ঠদেব' শূদ্রের ছেলের ব্রহ্মার আরাধনা করিবার
অধিকার নাই-এই বলিয়া রামচন্দ্রকে দিয়া শম্বুককে হত্যা করেন। এই তো গান্ধীজীর রাম
রাজত্বের নমুনা।
তফসিলীগণের রাজনৈতিক দাবি
আদায়ের আন্দোলনকে ব্যর্থ করিবার জন্য কীটদষ্ট শাস্ত্রের পাতার বচন উদ্ধৃত করিয়া
তিনি ব্যবস্থা দিতেছেন- “সর্বজাতি হিন্দুর জলচলে কোনও বাধা
নাই।” এতদিন এই শাস্ত্রের বচন কোথায় ছিল?
বর্ণহিন্দুরা মনে করিয়াছেন,
জলচলের আন্দোলনে তফসিলীগণকে ব্যস্ত রাখিয়া তাহাদের রাজনৈতিক দাবি ভুলাইয়া
ফেলিবেন। গ্রুপিং এর বিরুদ্ধে আমাদের মত জাহির করিয়া শাসনতন্ত্র রচনা করিয়া
ফেলিবেন। বন্ধুগণ,
"জলচলের ছলনায় ভুলিবেন না, আমাদের জল অচলই থাকুক। আমরা চাই
আমাদের রাজনৈতিক দাবি,
চাই স্বতন্ত্র আসন,
স্বতন্ত্র বৃত্তি,
চাকুরী। কংগ্রেসীদের আমাকে হিংসা করিবার কারণ-দেবগুরু বৃহস্পতি ছিলেন
স্বর্গের আইন সচিব। কিন্তু মর্তের সেই আসনে আজ এক চণ্ডালের ছেলে। এটা তাহাদের সহ্য
হয় না। তফসিলীরা আজ চায় সেই শাসনতন্ত্র, যে শাসনতন্ত্রে আমাদের লোক বৃহস্পতির
আসনে বসিতে পারে।”
আমি সমস্ত জীবন ধরিয়া আমার
নির্যাতিত তফসিলী ভাইদের জন্য সেবা করিয়া আসিতেছি। তফসিলী ভাইদের উদ্ধারের জন্য
আমি বাঁচিয়া আছি। “যদি আজ কেহ নিশ্চয় করিয়া বলিতে পারে যে, আমার জীবনের বিনিময়ে ৮ কোটি তফসিলীরা সার্বভৌম মুক্তি আসিবে, তবে আমি সেই মৃত্যুকে তিলে তিলে বরণ করিতে পারিব। যদি সমুদ্রে ঝাঁপ দিলে অথবা
জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে আমাকে নিক্ষেপ করিলে সে মুক্তি মিলে, তবে আমি দুর্বার আকাঙ্খা লইয়া তাহাতেই ঝাঁপাইয়া পড়িব।”

0 comments:
Post a Comment