Monday, 2 February 2026

// // Leave a Comment

মূলতঃ ডাঃ গুণধর বর্মনের নেতৃত্বে বাংলায় ১৯৭২ সালের পর সংরক্ষণ নীতি চালু হয়। আপনারা কয়জনে সেটা জানেন?

 

   


  মূলতঃ ডাঃ গুণধর বর্মনের নেতৃত্বে বাংলায় ১৯৭২ সালের পর সংরক্ষণ নীতি চালু হয়। আপনারা কয়জনে সেটা জানেন?

কিভাবে সেই অসাধ্যকে তিনি সাধ্য করলেন দেখুন সেই কাহিনি। 3 February তাঁর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে আন্তরিক অভিবাদন জানাই।

(তথ্য সংগ্রহ- সমাজ বিপ্লবের অনবদ্য পথিকৃৎ - ডাঃ শীতল প্রসাদ বেরা সম্পাদিত পৃষ্ঠা ১৩-১৭)  

     ভারতীয় সংবিধানের প্রাণপুরুষ বাবাসাহেব ড. আম্বেদকর এদেশের চির অবহেলিত অস্পৃশ্য জনগোষ্ঠীকে যথাসম্ভব সত্বর শিক্ষায় ও আর্থসামাজিক স্তরে উন্নত করে সমাজে রাষ্ট্রে সর্বমানবের সমান অধিকার ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে অস্পৃশ্য শূদ্রগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা ও চাকরীতে সংরক্ষণব্যবস্থা করে গেছেন। কিন্তু সেই সংরক্ষণ নীতি ১৯৭২ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে পালিত হয়নি। ১৯৭২ খৃষ্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার স্পীকার অপূর্বলাল মজুমদার রাজ্যের মুখ্যসচিবকে ডেকে ঐ সংরক্ষণ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি (চিফ সেক্রেটারী) বলেন যে গত ২০ বৎসর ধরে (অর্থাৎ ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত) রাজ্য সরকারের কোনো বিভাগই ঐ সংরক্ষণ নীতি মানছেন না এবং যাঁরা তা মানছেন না, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত কিছু করার ক্ষমতা মুখ্যসচিব বা কোনো মন্ত্রীরই নাই। সেই আলোচনাকালে ডাঃ গুণধর বর্মন স্পীকারের পাশেই উপস্থিত ছিলেন। এখানে বিশেষ উল্লেখ্য যে মাননীয় অপূর্বলাল মজুমদার স্পীকার হওয়ার পর তাঁর শ্রদ্ধেয় শ্বশুর ডাঃ অতুলকৃষ্ণ বিশ্বাসকে বলেন যে বিধানসভায় স্পীকারের হাতে অনেক ক্ষমতা দেওয়া আছে যাতে তিনি যে কোনো মন্ত্রী, এমনকি মুখ্যমন্ত্রীর উপরেও প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। আর তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায়ের সঙ্গে স্পীকারের যথেষ্ট ঘটিষ্ঠতা ছিল।

     জামাইয়ের কথা শুনে ডাঃ অতুলকৃষ্ণ বিশ্বাস ছুটে আসেন ডাঃ গুণধর বর্মণের কাছে এবং সব কথা খুলে বলেন। পূর্বকথিত 'ছাত্রযুব সংস্থা'র দুর্দান্ত আন্দোলনকালে ডাঃ বিশ্বাস ও ডাঃ বর্মণের মধ্যে বিশেষ অন্তরঙ্গতা গড়ে উঠেছিল। তাই ডাঃ অতুলকৃষ্ণ বিশ্বাসের আবেদনে ডাঃ গুণধর বর্মণ রাজী হন স্পীকার অপূর্বলাল মজুমদারের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করতে। তারই ফলে পুরো পাঁচ (৫) বৎসরই ডাঃ গুণধর বর্মণ প্রতিদিনই স্পীকারের পাশে (বিধানসভা বন্ধ না থাকলে) একান্ত অনুগত ভক্তের মত বসে থাকতেন এবং উভয়ে আন্তরিকভাবে পরামর্শ করতেন কীভাবে সরকারের বিভিন্ন বিভাগে সাংবিধানিক সংরক্ষণ নীতিকে বাধ্যতামূলক ভাবে কার্যকরী করা যায়। বিধানসভা বন্ধ থাকলে স্পীকারের হাওড়া বেনারস রোডের বাড়ীতে ডাঃ গুণধর বর্মণকে অবিরত যেতে হতো এ বিষয়ে গভীর পরামর্শের জন্য। তাতে ঠিক হয় যে সংবিধানে বিশেষ নির্দেশ আছে 'যদি সংরক্ষণ নীতিকে দীর্ঘদিন কার্যকরী করা না হয় তবে মুখ্যমন্ত্রী এবং স্পীকার পরস্পর একমত হয়ে বিধানসভায় বিশেষ আইন পাশ করাতে পারেন ঐ সংরক্ষণকে বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকরী করার জন্য। তখন সেই আইন না মানলে যে কোনো বিভাগীয় কর্মকর্তাকে আইনগতভাবে শাস্তি দেওয়া যাবে।" মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায় এই কথায় রাজী হওয়াতে সেই আইনের খসড়া তৈরী করে চলেন ডাঃ গুণধর বর্মণ এবং স্পীকার স্বয়ং, দীর্ঘ কয়েকমাস ধরে অমানুষিক ভাবে খেটে। কিন্তু বিধানসভায় স্পীকার নিজে তো কোনো আইনের প্রস্তাবনা করতে পরেন না। সেই প্রস্তাব উত্থাপন করতে হয় বিভাগীয় মন্ত্রীর মাধ্যমে। তবে বেদনার কথা তপশিলী আদিবাসী দপ্তরের জন্য কোনো পূর্ণমন্ত্রীর ব্যবস্থা ছিল না পশ্চিমবঙ্গে। একজন 'প্রতিমন্ত্রী'র হাতেই তপশিলী কল্যাণ দপ্তরের দায়িত্ব থাকতো (বর্তমানের পূর্ণমন্ত্রী শ্রী দীনেশ ডাকুয়া পর্যন্ত)। ১৯৭২-৭৬ সালে আনন্দমোহন বিশ্বাসই ছিলেন তপশিলী দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী। স্বাভাবিকভাবে তাঁরই মাধ্যমে বিধানসভায় উক্ত আইনের প্রস্তাব তুলতে হবে। তার আগে সেই আইনের খসড়া মন্ত্রী পরিষদে বা 'ক্যাবিনেটে' আলোচিত হওয়া দরকার। কিন্তু আনন্দমোহন বিশ্বাস পূর্ণমন্ত্রী না হওয়ায় তিনি সরাসরি মন্ত্রী পরিষদে সেই খসড়া উপস্থাপিত করার অধিকার পান নি। তাঁকে চীফ সেক্রেটারীর কাছে আবেদন করতে হয় ঐ আইনের খসড়াকে কাবিনেটের আলোচনায় আনতে। নিদারুণ লজ্জা ও বেদনার কথা এই যে তদানীন্তন মুখ্যসচিব মহাশয় আনন্দমোহনের পাঠান আইনের খসড়াটিকে তার নিজের 'ড্রয়ার'-এ পুরে চাবি দিয়ে ফেলে রাখেন প্রায় ছ'মাস কাল। এ রাজ্যে প্রতিমন্ত্রীদের অবস্থা ও মর্যাদা তখন এমনিই ছিল। যে কোনো দপ্তরের একজন 'হেডক্লার্ক'-এর যে ক্ষমতা একজন প্রতিমন্ত্রীর সেই ক্ষমতাটুকুও ছিল না। সুতরাং আনন্দমোহন বিশ্বাসকে তোয়াক্কা করবে কেন মুখ্যসচিব মহাশয়?

     এখানে আবার উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ডাঃ গুণধর বর্মনের চেষ্টাতেই আনন্দমোহন ঐ প্রতিমন্ত্রীর পদ পেয়েছিল (সে কথা কী আর আনন্দমোহন বিশ্বাসের এখন মনে আছে?) তাই গুণধর বর্মন বিশেষ খোঁজ নিয়ে আনন্দমোহনের দূরাবস্থার কথা জানতে পারেন কয়েক মাস পরে। সমস্যা সমাধানের জন্য ডাঃ গুণধর বর্মন স্পীকার মহাশয়কে সব কথা বলেন এবং জরুরী তলব পাঠিয়ে চীফ সেক্রেটারীকে স্পীকারের ঘরে ডেকে পাঠান। স্পীকারের হুকুমে পরের দিনই আইনের খসড়া ক্যাবিনেটে 'পুট' করা হয় এবং আনন্দমোহনের হাতে দেওয়া হয় বিধানসভায় আলোচনার জন্য। বিধানসভায় তখন তপশিলী ও আদিবাসী এম.এল.এ. সংখ্যা ছিল ৮২ জন। তাঁদের প্রত্যেকের কাছে ডাঃ গুণধর বর্মন বারে বারে অনুরোধ করেছেন ঐ আইনের খসড়া বিষয়ে বিধানসভায় প্রশ্নোত্তরকালে স্পীকারের কাছে প্রশ্ন করতে যে, কেন দেরী হচ্ছে ঐ আইনের খসড়া আলোচনা করতে। কিন্তু হতভাগ্য তপশিলী এম.এল.এ.-দের কারোর সাহস হয়নি ঐ প্রশ্ন তুলতে। এ দেশের তপশিলী 'এম.এল.এ.'গণ এমনি মেরুদন্ডহীন জীব!! তাঁরা সব বিভিন্ন দলের 'তল্পীবাহক' ছাড়া আর কোনো যোগ্যতার পরিচয় আজও দিতে পারছেন না। এতে স্পীকার অপূর্বলাল মজুমদার পড়েন মহাফাঁপরে। ডাঃ বর্মণের সঙ্গে চলে বেদনার্ত আলোচনা। দুজনে মিলে স্থির করেন এই আইন 'গিলোটিনে' পাশ করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নাই। সাধারণভাবে ঐ আইন নিয়ে পূর্ণ আলোচনা করলে উচ্চবর্ণের সমস্ত এম.এল.এ. সেইআইনের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা। ফলে সেই আইন আর কার্যকারী রূপ পাবে না। এমন অবস্থায় স্পীকারের হাতে একটি বিশেষ ক্ষমতা থাকে। স্পীকার প্রয়োজন মনে করলে কিছু আত্যবশ্যকীয় আইনকে বিধানসভায় পূর্ণ আলোচনা ছাড়াই বিশেষ কায়দায় তা পাশ করিয়ে দিতে পারেন। সেটি হচ্ছে বিধানসভা প্রতি বৎসর কয়েকটি নির্দিষ্ট "সেশন" (Session)-এ ভাগ করে আহৃত হয়, যেমন "বাজেট সেশন', 'অটাম সেশন' (পূজার আগে) প্রভৃতি। এর উপর কিছু জরুরী সেশনও থাকে। প্রত্যেক সেশনে কী কী কাজ হবে তার তালিকা সেই "সেশন" আরম্ভের আগেই প্রত্যেক বিধায়ককে জানিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই তালিকার সব হেডিং ঐ সেসনে পুরোপুরি আলোচননা সম্ভব না হতেও পারে। তারমধ্যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় ঐ সেশনের শেষ দিনে একেবারে শেষের ঘন্টায় স্পীকার মহাশয় অতিদ্রুত সেই বিষয়ের 'হেডিং-টা পাঠ করে উপস্থিত বিধায়ক ও মন্ত্রীমন্ডলীকে শুনিয়ে দেন। আগে থেকে ঠিক করা থাকে মন্ত্রীমন্ডলী সেই আইন বা বিল (Bill) -টাকে অনুমোদন করবেই। হেডিং পাঠের সঙ্গে সঙ্গে তাই হাত তুলেই মন্ত্রীমন্ডলী স্পীকারের আনা আইনটা সমর্থন করেন। আর সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত বিধায়কগণ কোনোকিছু না বুঝেই 'আয়াস' অর্থাৎ 'ইয়েশ' (Yes) বলে চিৎকার করেই সেই 'বিল' বা আইনের সমর্থন করেন, আধ মিনিটের মধ্যেই বিলটা পাশ হয়ে যায়। এইভাবে ঐ সেশনের শেষ ৫/৭ মিনিটে ৮/১০টি অত্যাবশ্যক 'বিল' আইন হিসেবে গৃহীত হয়। একে বলে 'গিলোটিন' (Guillotine) প্রথা। অর্থাৎ পূর্ণ আলোচনা ছাড়াই শেষদিনের বিধানসভায় কিছু 'বিল' অতি সংক্ষেপে গৃহীত হয় শুধু ধ্বনি ভোটে। এ রাজ্যের আদিবাসী ও তপশিলীদের জন্য 'সংরক্ষণ আইন' (সিডিউল্ড কাস্টস্ রিজার্ভেশন এ্যাক্ট) এই 'গিলোটিন' প্রথাতেই পাশ হয়েছে কেবলমাত্র অপূর্বলাল মজুমদারের দয়াতে এবং ডাঃ গুণধর বর্মনের প্রাণপাত প্রচেষ্টায়। একথা কয়জন শিক্ষিত ব্যক্তি জানেন? বিধানসভায় ঐভাবে তপশিলীদের শিক্ষা ও চাকরীতে 'সংরক্ষণ আইন' পাশ করিয়ে স্পীকার তাঁর বিধানসভাস্থ নিজস্ব ঘরে এসে প্রায় কেঁদে ফেলেই বলেছিলেন "ডাঃ বর্মনের অমানুষিক পরিশ্রমে যে আইন পাশ করানোহল তাকে কিভবিষ্যতে কেউ মনে রাখবে? তাতে ডাঃ বর্মন বলিষ্ঠ ভাবেই বলেছিলেন "যতদিন বেঁচে থাকবো অন্তঃত আমি একাই আপনার এই মহান অবদানের কথা প্রকাশ্যে সবার কাছে ঘোষণা করে যাবো।" গত ২৩শে জানুয়ারী সোনারপুরের সভায় রুদ্ধ কণ্ঠে ডাঃ বর্মণ সেই স্মৃতিচারণা করেন।

                                         ______________

Read More
// // Leave a Comment

সমাজ বিপ্লবের অনবদ্য পথিকৃৎ ডাঃ গুণধর বর্মন। সমাজ বিপ্লবের অনবদ্য পথিকৃৎ - ডাঃ শীতল প্রসাদ বেরা সম্পাদিত

 


সমাজ বিপ্লবের অনবদ্য পথিকৃৎ  ডাঃ গুণধর বর্মন

  ৩ ফেব্রুয়ারী তাঁর জন্ম শতবর্ষ উপলক্ষ্যে এই আলেক্ষ্য তুলে ধরা হল। তাঁকে আন্তরিক অভিবাদন জানাই।

     রোগের চিকিৎসার জন্য যে ডাক্তার দরকার হয়, গুণধর বর্মন সেই চিকিৎসাবিদ্যায় এম.বি.বি.সে. পাশ করেছেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে ১৯৫৩ সালে। সেই কলেজেই স্ত্রীরোগ  বিভাগে ইডেন হাসপাতালে দেড় বছর ‘হাউসস্টাফ হিসেবে কাজ করেছেন। তারপরে শিশু বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য কলকাতা ইন্‌স্টিটিউট অফ্‌ চাইল্ড হেস্থ্‌ থেকে ডি.সি. এইচ. পাশ করে সেখানে একবছর কাজ করেছেন। শেষে কলকাতা স্কুল অফ্‌ ট্রপিক্যাল মেডিসিন এবং যুক্তভাবে অল ইন্ডিয়া ইন্‌স্টিটিউট অফ হাইজিন থেকে ডি.টিএম.  এণ্ড এইচ পাশ করেছেন। তারপর শিশু চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথির বৈশিষ্ট্য জানার জন্য কলকাতার বিখ্যাত ‘ক্যাল্কাটা হোমিওপ্যাথি মেডিক্যাল কলেজে’ ভর্তি হয়ে হোমিওপ্যাথি পদ্ধতিতে উপযুক্ত জ্ঞানলাভ করেছেন। ফলে সাধারনভাবে ডাঃ গুণধর বর্মন একজন যথেষ্ট পারদর্শী বিশেষজ্ঞ চিকিতসক।

    সমাজের অতি দীন অবস্থা থেকে স্বীয় প্রতিভা ও একনিষ্ঠ সাধনায় দেশ ও সমাজের অতি উচ্চস্থানে উপনীত হয়েছেন ডাঃ গুণধর বর্মন। একান্ত দরিদ্র অস্পৃশ্য মৎস্যজীবী রাজবংশী পরিবারে ১৯২৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারী জন্মগ্রহণ করে নানা অসুবিধার মধ্যে দিয়েই প্রাইমারী স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা পর্যন্ত অভিভক্ত মেদিনীপুর জেলার প্রত্যেকটি পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করে অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন।

     চিকিৎসাবিদ্যায় ডাঃ বর্মনের দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস এতই প্রবল যে নিজের পুত্রকন্যা, স্ত্রী ও পরিবারের কারোর চিকিৎসায় অন্য কোনো ডাক্তারের সাহায়্য নেন না, বিশেষ কিছু সার্জিক্যাল বিষয় ছাড়া। তিনি জোর দিয়েই বলেন, নিজের ছেলেমেয়ের চিকিৎসায় আত্মবিশ্বাস না থাকলে পরের ছেলেমেয়ের চিকিৎসা করতে যাওয়া উচিত নয়। এই কথা এ দেশের তথা পৃথিবীর অন্য কোনো চিকিৎসক দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারেন না।

    তার চেয়েও বড় কথা যে অবহেলিত দীনহীন সমাজে ডাঃ বর্মন জন্মেছেন সেই হতভাগ্য দরিদ্র লাঞ্ছিত সমাজের বিজ্ঞানসম্মত উন্নতির কাজে তিনি সারাজীবন, এখন অশীতিপর বৃদ্ধ বয়সেও একান্তভাবে নিজেকে উৎসর্গিত করে রেখেছেন। সেই অস্পৃশ্য সমাজের তিনি একান্তই আপনজন হিসেবে পরিচয় দেন, নিজের অর্জিত জ্ঞান-গরিমা-আত্মর্যাদার মোহ ভুলে – যা এ দেশে দেখাই যায় না।

    ভারতে জন্মগত জাতিভেদের ভয়াবহতা দূরীকরণের জন্য ডাঃ বর্মন তাঁর সর্বস্ব পণ করেই চলেছেন। এই ধরণের মণোবৃত্তি এবং মানুষ একান্তই বিরল। লব্ধপ্রতিষ্ঠ চিকিৎসক হিসেবে পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় যথেষ্ট সুনামের সঙ্গে ‘প্র্যাক্টিস’ করেও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর ব্যক্তিগত সঞ্চয় বলে কিছু ছিল না। নিজের ঘরবাড়িও নেই। জরাজীর্ণ একটি ভাঙা বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকতেন। যা আয় করতেন, সবই সমাজের জন্য ব্যয় করতেন। তাতে নিজ পরিবারের দৈনন্দিন বাজার খরচের জন্য অনেকদিনই তাঁকে বিব্রত হতে হত। সমাজে থেকেই সাধারণ মানুষের সেবায় এমন সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর নজির খুঁজে পাওয়া দায়!

  ডাঃ বর্মনের বিশেষ বক্তব্য ব্যক্তিগত রোগের জন্য চিকিৎসকের অভাব নেই। কিন্তু ব্রাহ্মণ্যবাদী ধারায় সুদীর্ঘকাল ধরে যে ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধির প্রকোপ এ দেশকে একান্তই পঙ্গু করে চলেছে সেই মারাত্মক রোগের চিকিৎসায় ডাঃ বর্মন নিজেকে নিয়োজিত করেছেন; নিজের স্ত্রী-পুত্রকণ্যার কথা না ভেবেই। এই দিক থেকে ডাঃ বর্মন যথার্থই উন্নতমান পারদর্শী সমাজবিজ্ঞানী-চিকিৎসক। এই কাজে সারাদেশ জুড়েই তাঁর নাম। তাঁর এই মহান কীর্তি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

     দীর্ঘ বার বছর ধরে (১৯৭৫-১৯৮৭) ‘বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ’-এর শীর্ষ পরিচালক নেতা হিসাবে কাজ করে ডাঃ বর্মন ভারতের প্রায় সমস্ত বিজ্ঞানীর প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে এসেছেন। দেশের প্রয়োজন ভিত্তিক বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে লব্ধ প্রতিষ্ঠ বিজ্ঞানীদের ডেকে তাঁদের মতামত নিয়ে আলোচনা, সেমিনার করে তার সুব্যবস্থার উপায় নির্ধারণ করেছেন- যা আগে বিজ্ঞান পরিষদে হতো না। ফলে দেশ সমাজ, জগৎ ও জীবন সম্পর্কে বিবিধ সমস্যার অনুসন্ধান ও তার বিজ্ঞানসম্মত প্রতিকারের কাজে দেশের উচ্চ চিন্তাবিদ বিজ্ঞানী এবং নেতৃবৃন্দকে সক্রিয়ভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা ডাঃ বর্মন করেছে সসাধারণভাবে। এর আগে বিজ্ঞান পরষদের মতো উচ্চ চিন্তা-চেতনার সংগঠনে এদেশের কোনো নম্নবর্গের উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিও বিশেষ স্থান বা সমাদর পাননি। গুণধর বর্মনই প্রথম অধঃপতিত অস্পৃশ্য সমাজ থেকে দেশের উচ্চবর্ণের উচ্চশিক্ষিত পণ্ডিত ব্যক্তিদের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন এবং সঙ্গে নিম্নবর্ণের কিছুজনকেও সেই কাজে নিয়ে চলেন। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রে ডাঃ বর্মন নিজের জন্মগত জাতি পরিচয় বিন্দুমাত্র গোপন করেননি। তার ফলও কিছুটা জটিল হয়েছিল। একসময় পরিষদের উচ্চবর্ণের অধ্যাপক নেতৃবৃন্দের এক অংশ ডাঃ বর্মনের কাজকর্মে অসন্তুষ্ট হয়ে তাঁড় বিরুদ্ধে অহেতুক কুৎসা রটনায় নামেন (মূলত তাঁদের অবৈজ্ঞানীক জীবনধারা ও কাজকর্মের সমালোচনার জন্যই)। তাতে অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে কলকাতাসহ দেশের উচ্চশিক্ষিত বুদ্ধিজীবী মহল পরিষ্কার দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। এক অংশ যেমন ডাঃ বর্মনের বিরুদ্ধে, অন্য অংশ তেমনি সক্রিয়ভাবে ডাঃ বর্মনের পক্ষে বাস্তব আন্দোলনে নামেন। কোনো একক ব্যক্তিকে নিয়ে উচ্চ চিন্তবিদ মহলে এমন ঘটনা আর কখনো ঘটেনি। তবে শেষ পর্যন্ত গুণধর বর্মনই জয়ী হয়েছেন। তাঁর বিশুদ্ধ বিজ্ঞান মানসিকতার জন্য।

    ডাঃ বর্মনের একটি বিশেষ পরিচয়, তিনি আজীবন একনিষ্টভাবে বাবাসাহেব ড. আম্বেদকরের অনুসারী এবং তাঁরিউ নির্দেশিত পথ ও মতবাদের বিলিষ্ট প্রচারক। বাংলাভাষায় বাবাসাহেব ড. আম্বেদকরের প্রথম জীবনীকার হিসেবে ডাঃ গুণধর বর্মনই সুপ্রসিদ্ধ।

    এইভাবে সারাজীবন তিনি যেসব অসাধারণ কাজ করেছেন তার প্রতি নগণ্য অংশই এই আলোচনায় তুলে ধরা হয়েছে। (তথ্য সংগ্রহ- সমাজ বিপ্লবের অনবদ্য পথিকৃৎ - ডাঃ শীতল প্রসাদ বেরা সম্পাদিত)  

Read More

Sunday, 1 February 2026

// // Leave a Comment

ভারতীয় রাজনীতির ট্রাজিক নায়ক লেখক- কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর

 


*ভারতীয় রাজনীতির ট্রাজিক নায়ক*

লেখক- কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর

(যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলঃ ভারতীয় রাজনীতির স্বতন্ত্র অধ্যায়। পৃষ্ঠা নং ৯২ -১০৫)

      রূপকথায় দুয়োরানির গল্প শুনেছি আমরা। শুনেছি তার সন্তানদের অনাদর, উপেক্ষার নানা কাহিনি। রূপকথার সেই বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করা যায় ভারতের দলিত নেতৃবৃন্দের ক্ষেত্রে। তাঁরা যে প্রকৃতপক্ষেই দুয়োরানির সন্তান এ সত্য আমাদের রাষ্ট্রনায়ক থেকে সমাজনায়ক, ঐতিহাসিক থেকে সাংবাদিক প্রত্যেকের আচরণেই স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। এইসব দুরোরানির সন্তানদের ভূমিকাকে অস্বীকার করার বা মুছে ফেলার, তাদের মুখে কলঙ্কের কালি লেপন করার কত যে-অশুভ প্রচেষ্টা হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। সেই চক্রান্তের জাল ছিঁড়ে সাম্প্রতিককালে আম্বেদকরের মতো এক-আধজন বেরিয়ে আসতে পারলেও অধিকাংশই এখনও অপ্রচার বা অপপ্রচারের ঘরে তালাবন্দি হয়ে আছেন। বাংলায় গুরুচাঁদ ঠাকুর, ঠাকুর পঞ্চানন বর্মার মতো সার্বভৌম দলিত নেতাদেরই যেখানে অদ্যাবধি স্বীকৃতি জোটেনি-অন্যদের কথা সেখানে না বলাই ভালো।

     তবে ভারতের দলিত নেতাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অপপ্রচার বা বলা চলে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারের শিকার হয়েছে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। দলিত জাগরণ ও সমাজ উন্নয়নে তাঁর অবদান ও আত্মত্যাগের পাশাপাশি বিকৃত প্রচারে ক্ষত-বিক্ষত ভাবমূর্তিটি যদি নিরপেক্ষভাবে মেলানো ও বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে এ কথা না বলে উপায় থাকে না যে, তিনি হলেন ভারতীয় রাজনীতির ট্রাজিক নায়ক। কীভাবে এ সিদ্ধান্তে আমরা পৌঁছোতে পারি সে-কথা বুঝতে হলে অন্তর্বর্তী ভারত ও খণ্ডিত পাকিস্তানের প্রথম আইনমন্ত্রী, সংবিধান পরিষদে বাবাসাহেব আম্বেদকরকে পাঠাবার মূল স্থপতি, তপশিলি ফেডারেশনের প্রাণপুরুষ, জননেতা যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল সম্পর্কে বিরোধী পক্ষের আনা অভিযোগগুলি জানা ও তা পর্যালোচনা করা দরকার।

     যোগেন্দ্রনাথ সম্পর্কে বিরোধীদের প্রধান অভিযোগ হল- (১) যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ভারত বিভাগ তথা পাকিস্তান আন্দোলনের প্রবল ও কট্টর সমর্থক (২) তিনি মুসলিম লিগের অন্ধভক্ত ও সহায়ক শক্তি (৩) এসব প্রশ্নে রাজনৈতিক গুরু আম্বেদকরের পরামর্শও তিনি অমান্য করেছেন (এই অভিযোগটি সাম্প্রতিক কালের) (৪) সমগ্র বাংলাকেই তিনি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন এবং (৫) পাকিস্তান দাবি করেও শেষমেশ সংখ্যালঘুদের সেখানে অসহায় ফেলে রেখে নিজের প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন।

      এসব কারণে তাঁকে ভীরু’, ‘অদূরদর্শী’, ‘মুসলমানের গোলাম’, ‘পাকিস্তানের দালাল’, ‘যোগেন আলী' ইত্যাদি নানা অভিধায় অভিহিত করে মনের ঝাল মেটাবার পাশাপাশি, জনমনে তাঁর বিকৃত ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিল অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিপক্ষ-ভারতের সুয়োরানির সন্তানেরা। এখনও দলিত সমাজের কেউ কেউ সে-পথেই যোগেন্দ্রনাথের মূল্যায়ন করে আনন্দলাভ করে থাকেন বই-কি। বলাবাহুল্য, এদের বিশ্লেষণে যুক্তির চেয়ে উচ্চবর্ণীয় স্বার্থের উদ্‌দ্গারই প্রবল।

     বিরোধীদের তোলা অভিযোগগুলি বিশ্লেষণ করার আগে সংক্ষেপে যোগেন্দ্রনাথের কার্যকলাপ ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে অবহিত হওয়া দরকার। যোগেন্দ্রনাথ বরিশাল জেলার অস্পৃশ্য নমঃশূদ্র কৃষকের সন্তান হলেও বাগ্মিতা ও সমাজ উন্নয়নে উদ্যোগী ভূমিকার জন্য তরুণ বয়স থেকেই সর্বশ্রেণির সমর্থন ও ভালোবাসা লাভ করেছেন। এই কারণেই তাঁর জীবনের প্রথম বঙ্গীয় আইন পরিষদ নির্বাচনে (১৯৩৬) নির্দল প্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও কংগ্রেস প্রার্থী বরিশালের প্রবাদপ্রতিম নেতা অশ্বিনী দত্ত-র ভাইপো সরল দত্তকে হারিয়ে জয়লাভ করতে সমর্থ হয়েছিলেন মুখ্যত উচ্চবর্গীয় পৃষ্ঠপোষকদের সহায়তায়। পরবর্তীকালে সুভাষচন্দ্র বসু ও শরৎচন্দ্র বসুর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। তাঁদের সমর্থনে কলকাতা কর্পোরেশনের কাউন্সিলরও নির্বাচিত হন তিনি।

     এ পর্যন্ত যোগেন্দ্রনাথের ভূমিকা অবিতর্কিতই। কিন্তু এরপরই তিনি বিতর্কিত হয়ে ওঠেন কয়েকটি কারণে। (ক) প্রচলিত রাজনীতির ধারা থেকে সরে গিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন ভারতীয় সমাজ-ত্রিভুজের তৃতীয় বাহু, দলিত তথা দুয়োরানির সন্তানদের জাগরণ ও তাদের রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করবেন। কেন-না, অন্য দুই বাহু-অভিজাত হিন্দু ও মুসলমানরা ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে অন্ধ-আবেগে দ্রুত উঠে আসছিল। ভারতের ভূমিপুত্রদের কোনো অধিকার বা গুরুত্ব স্বীকার করতে দুইয়ের কেউই প্রস্তুত ছিল না।

     লক্ষণীয়, কংগ্রেসের মূলস্রোতে গিয়ে দেশের সবচাইতে প্রগতিশীল ও শ্রদ্ধেয় দুই রাজনীতিবিদ সুভাষচন্দ্র বসু ও শরৎচন্দ্র বসুর সংস্পর্শে যাওয়ার পরেও এই নতুন উপলব্ধি লাভ করেছিলেন তিনি। গুরুত্ব পেতে গেলে যে ভূমিপুত্রদের স্বতন্ত্র শক্তি হিসাবে উঠে দাঁড়াতে হবে এই অবস্থান নিয়ে ইতিপূর্বে অনড় থেকেছিলেন গুরুচাঁদ ঠাকুর। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন থেকে গান্ধিজি, কারুর অনুরোধেই তিনি টলেননি। গুরুচাঁদের মৃত্যুর পর তাঁর পৌত্র প্রমথরঞ্জন ঠাকর ও অন্যান্যরা সে-অবস্থান থেকে সরে এলেও তাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করলেন যোগেন্দ্রনাথ। প্রকৃত গুরুচাঁদ অনুগামীরা পাশে দাঁড়ালেন তাঁর। ফলে তিনিই হয়ে উঠলেন যাবতীয় বিতর্কের আধার।

     (খ) স্বতন্ত্র এই ধারায় চলার পথে যোগেন্দ্রনাথ সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে নেতা হিসাবে মেনে নিলেন বাবাসাহেব আম্বেদকরকে। দায়িত্ব নিলেন বাংলায় তপশিলি ফেডারেশন গড়ে তোলার এবং যে-কোনো মূল্যে আম্বেদকরকে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে তৃতীয় ফ্রন্টের প্রধান নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার। নতুন সমাজ গঠন করতে শোষিত বঞ্চিতদের সব ধরনের শোষণ এ বঞ্চনা থেকে মুক্তি দিতে এর চেয়ে বৈপ্লবিক ও কার্যকরী কোনো পথ তাঁর সামনে ছিল না। বামপন্থীদের অনেক ক্ষেত্রে সহযোগী হিসাবে মেনে নিয়েও তাদের নানান সীমাবদ্ধতা তাঁকে তেমন উৎসাহী করেনি।

     পূর্বোক্ত দুটি সিদ্ধান্তই যোগেন্দ্রনাথকে প্রবল বিতর্কের মুখে ঠেলে দিল। বিশেষত, আম্বেদকরকে সমর্থন জানানো ও তাঁর মতবাদ প্রচার করা সেকালে ছিল নিদারুণ হঠকারিতা। অস্পৃশ্যদের মধ্যেও অস্পৃশ্য বলে গণ্য করা হত তাঁদের। কেন-না তাঁরা হিন্দুধর্মের জগদ্দল পাথরটাকে মান্য না করে, বরং ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াতে চাইছিলেন।

     এরই মধ্যে আরও বিতর্কের কারণ হয়ে দাঁড়ালেন তিনি শ্যামা-হক মন্ত্রিসভার পতনের পর (১৯৪৩-এর ২৮ মার্চ) ২০ জন তপশিলি সদস্যসহ নাজিমুদ্দিন নেতৃত্বাধীন সর্বদলীয় সরকারকে সমর্থন করায়। বলাবাহুল্য, তাদের এই সমর্থন নিঃশর্ত ছিল না। তিন দফা শর্ত রেখে বলেছিলেন-এই শর্ত যারা মেনে নেবেন তাদেরই তাঁরা সমর্থন জানাবেন। শর্তগুলি হল- (১) তপশিলি জাতির তিন জন মন্ত্রী এবং তিন জন পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি নিযুক্ত করতে হবে (২) তপশিলি জাতির শিক্ষার জন্য বার্ষিক পাঁচ লক্ষ টাকা রেকারিং ট্রাস্ট মঞ্জুর করতে হবে। (৩) কমিউনাল রেশিয়োঅনুসারে সকল চাকরিতে তপশিলি জাতির প্রার্থী নিয়োগ করতে হবে। বড়ো বড়ো চাকরিতেও তপশিলি জাতির প্রার্থী নিয়োগ করতে হবে।

     বলাবাহুল্য, এই শর্তাবলির মধ্যে নিহিত ছিল তৃতীয় শক্তি হিসাবে দলিতদের উঠে দাঁড়াবার স্পর্ধা, যা কায়েমি স্বার্থান্বেষীদের অহং-এ আঘাত করেছিল। উপরন্তু সদ্য সদ্য দলিত-মুসলিম জোটের কাছে ক্ষমতা হারিয়ে ক্রোধান্ধ তারা আক্রমণের জন্য বেছে নিলেন যোগেন্দ্রনাথকেই। মুসলিম লিগের ‘চামচা’ বলে গালি দেওয়া হল তাঁকে। দলিতদের অধিকার ও গুরুত্ব না দেবার অপরাধটা তাঁরা এইভাবে ধামাচাপা দেবার চেষ্টা করলেন। কেন-না মুসলিম সরকার যোগেন্দ্রনাথদের দাবি মেনে বাংলায় দলিতদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বর্ণবিদ্বেষী কায়েমি স্বার্থান্বেষীদের ক্ষমতার ভাগ ছেড়ে দিতে বাধ্য করেছিল। মন্ত্রিত্বে, প্রশাসনে, চাকরিতে, শিক্ষায় দাঁত বসাচ্ছিল দলিতরা। মনুবাদীদের পক্ষে এ জিনিস মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না।

     প্রকারান্তরে কমিউনিস্টদের শ্রেণিতত্ত্বকেই শক্তিশালী করে। শোষণ ও সাম্প্রদায়িকতার অবসানে শ্রমজীবী দলিত-হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য স্থাপনে জোর দিচ্ছিলেন তিনি। গ্রামগঞ্জের সভায় সভায় বলছেন-কৃষকভাইরা শুনুন, আপনার পাশ আলেই (পার্শ্ববর্তী জমির কৃষক) আপনার সব থেকে বড় বন্ধু। শ্রেণিবোধের এমন নিজস্ব ভাষা গ্রামবাংলার কৃষকেরা ইতিপূর্বে কারুর মুখ থেকেই শোনেনি। ফলে তারা আপ্লুত ও অনুপ্রাণিত। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তপশিলি ফেডারেশনের সব প্রার্থী মায় আম্বেদকর পর্যন্ত পরাজিত হলেও যোগেন্দ্রনাথের বিজয় পতাকা তাই উড্ডীন রইল। এবং এই নব শ্রেণিচেতনার নায়ক হিসাবেই বাংলার প্রতিনিধিরূপে অবিভক্ত ভারতের প্রথম আইন ও শ্রমমন্ত্রীর মর্যাদা লাভ করেছিলেন তিনি মহম্মদ আলি জিন্নার সুপারিশে, যদিও তখন অবধি জিন্না সাহেবের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ কোনো আলাপ-পরিচয় বা সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি।

     এর পর পরই আরও একটি অঘটন ঘটিয়ে ফেললেন যোগেন্দ্রনাথ। সংবিধান পরিষদে কিছুতেই আম্বেদকরকে প্রবেশ করতে দেবে না, কংগ্রেস নেতৃত্বের এই আকাশচুম্বী স্পর্ধাকে তিনি ধুলায় নামিয়ে আনলেন-মহারাষ্ট্রে পরাজিত আম্বেদকরকে বাংলা থেকে নির্বাচিত করে। যে অসম্ভব প্রতিকূলতাকে এক্ষেত্রে তিনি জয় করেছিলেন তা তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, সাহস, জেদ ও দূরদর্শিতার অমলিন উদাহরণ হিসাবে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

     এর কিছুদিন পরই যোগেন্দ্রনাথ করলেন তাঁর সবচেয়ে বড়ো বিতর্কমূলক (?) কাজটি। ইংরেজ-কর্তৃক ভারত ভাগের সিদ্ধান্তের পর পরই বঙ্গভঙ্গের দাবি উঠতেই ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের থেকেও তীব্র যুক্তি ও আবেগ এবং তার সঙ্গে দলিত সমাজের সর্বনাশের পূর্বাভাস জানিয়ে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বঙ্গভঙ্গ রুখতে গ্রামেগঞ্জে জনসভার পর জনসভা করতে লাগলেন। তৈরি হতে লাগল নতুন আবেগ। যার ফলে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনাও থিতিয়ে আসতে লাগল তাঁর একক চেষ্টায়। স্বতন্ত্র বাংলার আশা পনরুজ্জীবিত হতে লাগল। রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে হয়তো যোগেন্দ্রনাথকে আশীর্বাণীই পাঠাতেন, তাঁরবাঙালীর ঘরে যত ভাই-বোন, এক হউক, এক হউক এই আবেদনকে বাস্তবায়িত করার আপ্রাণ উদ্যোগের জন্য। কিন্তু তার পরিবর্তে শত শত কৎসা, বিদ্রুপ ও জীবননাশের হুমকি পেতে থাকলেন যোগেন্দ্রনাথ।

     এরপর বঙ্গবিভাগ হলে পুর্ববঙ্গের মানুশ তিনি পূর্বঙ্গেই থেকে যান। দায়িত্ব পান পাকিস্তান গণপরিসষদে প্রথমে সভাপতি (স্বল্পকালীন) ও আইন মন্ত্রীর। পরিশেষে, সে দেশের মৌলবাদী সরকারের বিরোধিতা করে মন্ত্রীত্ব ছুড়ে দিয়ে নতুনভাবে রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলার সংকল্প নিয়ে চলে আসেন পশ্চিমবঙ্গে ১৯৫০ সালে।

     পশ্চিমবঙ্গে এসে বামপন্থী গণসংগঠনগুলির সঙ্গে একযোগে তিনি সর্বহারা মানুষদের স্বার্থে লডাই আন্দোলন চালিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন। আরও পরে রিপাবলিকান দলের নেতা হিসাবে বামপন্থীদের সঙ্গে জোট বেঁধে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠনে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন।

     এই হল সংক্ষেপে যোগেন্দ্রনাথের রাজনৈতিক জীবন ও ভাবনা। এবারে একে একে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থিত অভিযোগগুলি বিশ্লেষণ করে যোগেন্দ্রনাথের সিদ্ধান্তের যথার্থতা আমাদের বিচার করে দেখতে হবে।

     বিরোধীদের প্রথম অভিযোগ-যোগেন্দ্রনাথ পাকিস্তান আন্দোলনের প্রবল সমর্থক। কথাটা এমনই, যেন যোগেন্দ্রনাথের চেষ্টাতেই পাকিস্তান তৈরি হয়েছে। সকলেই জানেন পাকিস্তান সৃষ্টির নানা ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। শোষণ, বঞ্চনা ও ছুঁৎমার্গিতার প্রতিক্রিয়ায় মুসলমানদের হারানো মর্যাদা ও অধিকার ফিরে পাওয়ার ঐকান্তিক ইচ্ছা এবং সেই ইচ্ছাকে সর্বতোভাবে উপেক্ষা করার অপরিণামদর্শী বিরোধী চেষ্টাই পাকিস্তানকে ডেকে এনেছিল। মুসলমানদের অধিকারের দাবিকে যোগেন্দ্রনাথ সমর্থন করেছেন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দৃষ্টিকোণ থেকেই। ধর্মান্ধতার প্রতি সমর্থন তা নয়, বরং বঞ্চিতের প্রতি বঞ্চিতের সহানুভূতি ছিল তাতে। ধর্মের ভিত্তিতে ভারত বিভাজন চাননি তিনি। কারণ, মনেপ্রাণে তিনি ছিলেন সমমর্যাদা ও সম্প্রীতির দর্শনে বিশ্বাসী। তাই শরিয়ত ও সংহিতা উভয় ধর্মীয় পন্থাই তাঁর চোখে ছিল ঘৃণ্য। তাঁর লক্ষ্য ছিল শুধু শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মানুষের চিরমুক্তি।

     পাকিস্তান দাবির কট্টর কেন, কোনোরূপ সমর্থকই যে তিনি ছিলেন না। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খানকে লেখা পদত্যাগ পত্রের স্বীকারোক্তিই তার বড়ো প্রমাণ। যোগেন্দ্রনাথ লিখেছেন-

For the sake of truth I must admit that I had always considered the demand of Pakistan by the Muslim League as a bargaining counter. Although I honestly felt that in the context India as a whole Muslims had legitimate cause for grievance against upper class Hindu chauvinism, I held the view very strongly indeed that the creation of Pakistan would never solve the communal problem. On the contrary, it would aggravate the communal hatred and bitterness.

Besides, I maintained that it would not ameliorate the condition of Muslims in Pakistan. The inevitable result of the partition of the country would be to prolong, if not perpetuate, the poverty, illiteracy and miserable condition of the toiling masses of both the States.

     এরপরেও বলা যায় যোগেন্দ্রনাথ ছিলেন পাকিস্তানের প্রবল সমর্থক?

     তাঁর সম্পর্কে দ্বিতীয় অভিযোগ-তিনি মুসলিম লিগের সহায়ক ছিলেন। প্রমাণ হিসাবে বলা হয় ১৯৪৩-এ ফজলুল হক সরকারের (যা শ্যামা-হক নামে কথিত) পতনের পর যোগেন্দ্রনাথ-সহ ২০ জন তপশিলি বিধায়ক মুসলিম লিগকেই সমর্থন করেন। কিন্তু এ প্রসঙ্গে এ কথাটা মনে রাখা হয় না যে, যোগেন্দ্রনাথরা মুসলিম লিগ কেন, কোনো দলকেই শর্তহীন সমর্থন করতে চাননি। তাঁরা শুধু চেয়েছিলেন দলিতদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে অন্যদের সহায়তায়। এজন্য তিন দফা শর্ত দিয়েছিলেন তারা-যা পূর্বেই উল্লেখিত হয়েছে। ফজলুল হক, শ্যামাপ্রসাদরা সে-শর্ত মানতে চাননি। যারা মেনেছেন তপশিলি সমাজের স্বার্থে যোগেন্দ্রনাথরা তাঁদেরই সমর্থন করেছেন। এ জাতীয় ঘটনা ভারতবর্ষে ইদানীং আকছার ঘটছে-বিপরীত আদর্শের দলগুলি জোট বাঁধছে। তবে সবই প্রায় ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থে। যোগেন্দ্রনাথরা আত্মস্বার্থের উপরে উঠে দলিত সমাজের স্বার্থে তা করেছিলেন। অন্যদিকে শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা গঠনের আগে অবধি ফজলুল হকও ছিলেন মুসলিম লিগেই। তিন-চার বছর বাদ দিয়ে আবার তিনি মুসলিম লিগেই যোগ দেন।

     এ প্রসঙ্গে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, সে-সময়ে মুসলিম লিগকে দূরে রেখে বাংলায় রাজনীতি করা সম্ভব ছিল না, বা মুসলিম লিগকে অস্পৃশ্যও ভাবা হত না। সেজন্যই ১৯৪৬ সালের নির্বাচনের পর সরকার গঠনের জন্য কংগ্রেস-মুসলিম লিগ আলোচনা চলে কিরণশংকর রায় ও সুরাবর্দির নেতৃত্বে। উভয় পক্ষে মতানৈক্য ঘটে স্পিকার পদ নিয়ে, না হলে কংগ্রেস-লিগ মন্ত্রিসভা গঠিত হত যা বাংলার সৌভাগ্যের কারণ হতে পারত। শরৎচন্দ্র বসুর উদ্যোগে বেঙ্গল প্যাক্টও ছিল খুবই সময়োচিত পদক্ষেপ।

     যা হোক লিগ নেতা সুরাবর্দি মন্ত্রিসভা গঠন করেন এবং তপশিলি ফেডারেশনের একমাত্র জায়ী প্রার্থী যোগেন্দ্রনাথকে মন্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করেন। এতেও হইচই বাধে। কংগ্রেস জোট বাঁধলে দোষ নেই, শুধু তপশিলিরা জোট বাঁধলেই দোষের- এমন বিচারকে কি ন্যায়বিচার বলা যায়? আসলে আপত্তি বোধহয় শূদ্র সন্তানের গুরুত্ব বৃদ্ধিতে। সেজন্যই এত হইচই।

     যাই হোক, পরিস্থিতি আকস্মিকভাবে জটিল হয় ১৯৪৬ সালের ১১ আগস্ট মুসলিম লিগ কর্তৃক ডাইরেক্টর অ্যাকশন ডেঘোষণার পর পরই দাঙ্গা শুরু হওয়ায়। দাঙ্গার কারণ রহস্যাবৃত হলেও মন্ত্রিসভা থেকে যোগেন্দ্রনাথের পদত্যাগের দাবি ওঠে। তার পর সুরাবর্দির বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এলে যোগেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে কংগ্রেসের চার জন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ও চার জন তপশিলি বিধায়ক সমর্থন করায় মন্ত্রিসভা টিকে যায়।

     এই সময়েও কেন যোগেন্দ্রনাথ সুরাবর্দি সরকারকে সমর্থন করেছিলেন তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেন সে-সময় মুসলিম লিগকে ত্যাগ করলে সাম্প্রদায়িক বিভাজন আরও তীব্র হবে। অন্যদিকে, সরকারহীন অবস্থা বাংলার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। বরং ক্ষমতায় থেকে তা প্রয়োগের মাধ্যমে সম্প্রীতি গঠনের পক্ষে কাজ করাটাই অধিক যুক্তিযুক্ত হবে। অসংখ্য সভা-সমিতির মাধ্যমে সে-কাজটাই করেছিলেন যোগেন্দ্রনাথ। তাঁরই চেষ্টায় পরবর্তীকালে গোপালগঞ্জের মারমুখী নমঃশূদ্রেরা সাম্প্রদায়িক প্রতিহিংসার পথ পরিত্যাগ করেছিল।

১৯৪৬-এর অক্টোবরে অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভায় মুসলিম লিগ তথা জিন্নার সুপারিশে যোগেন্দ্রনাথের আইনমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করায় নতুন বিতর্ক ওঠে। যোগেন্দ্রনাথ লিখেছেন, এই পদ গ্রহণ করা নিয়ে তিনি নিজেও দ্বিধান্বিত ছিলেন। কিন্তু বিবেচনার জন্য সময় ছিল মাত্র এক ঘণ্টা। তিনি মন্ত্রিসভায় যোগ দেন এক শর্তে-তাঁর নেতা আম্বেদকরের অনুমতি না পেলে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেবেন।

     এভাবে উভয় কূল রক্ষা করেন যোগেন্দ্রনাথ। প্রথমত, জিন্নার অনুরোধ উপেক্ষা করা যায় না। কারণ, গোলটেবিল বৈঠকে (১৯৩০) গান্ধিজি ও কংগ্রেসের বিরোধিতা সত্ত্বেও একমাত্র জিন্নার সমর্থনই তপশিলিদের অধিকার আদায়ে সহায়তা করেছিল।

     অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় যোগদানের ফলে সামাজিক শক্তির তৃতীয় বাহু হিসাবে দলিতদের অবস্থান আরও দৃঢ় হবে এ কথাও তিনি ভেবেছিলেন। তাঁর এ কাজকে আম্বেদকর তাই সমর্থন জানিয়ে ছিলেন। (দ্র.-Star of India, 4 Nov. 1946)

     সমালোচকদের তৃতীয় অভিযোগ (সাম্প্রতিকও বটে) যোগেন্দ্রনাথের এসব কাজ ছিল আম্বেদকরের মতের বিরোধী। কথাটা মোটেও সত্য নয়। আম্বেদকর সর্বাংশেই যোগেন্দ্রনাথকে সমর্থন করেছেন। বরং বলা যায়, প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল উভয়ের পূর্ব পরিকল্পিত। বর্তমান সংকলনে কনফিডেন্সিয়ালচিহ্নিত ২ জুন ১৯৪৭ তারিখের চিঠি (নং ৩) তার উজ্জ্বল উদাহরণ।

     যোগেন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে বিরোধীদের চতুর্থ অভিযোগ, সমগ্র বাংলাকেই তিনি পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন। এই অপপ্রচার মানুষের মনে এতটাই দৃঢ় হয়েছিল যে, ১৯৫০ সালে তিনি ভারতে চলে এলে অনেকেই তাঁর চলে আসাকে অনৈতিক বলেছিলেন।

     প্রকৃতপক্ষে, যোগেন্দ্রনাথ বাংলাকে পাকিস্তান করতে চাননি, বরং সার্বভৌম বাংলা হিসাবেই দেখতে চেয়েছিলেন। তাঁর অজস্র জনসভায় এমনকি সাংবাদিক সম্মেলনেও এ কথা বলেছেন তিনি।

     ১৭ মে ১৯৪৭-এর The Statesman লিখেছে- Answering a query Mr. Mandal said that he did not visualise Bengal of the future as a province linked with either Pakistan or Hindusthan, but as an independent Undivided Sovereign State.”

     ১৭ মে তারিখের দৈনিক কৃষক, হিন্দু মহাসভা পরিচালিত ভারত পত্রিকাতেও সংবাদটি ছাপা হয়েছিল।

      এরপরেও যারা বলেন যোগেন্দ্রনাথ পাকিস্তান চেয়েছিলেন, তাদের ইতিহাস বিশ্লেষণে ইচ্ছাকৃত বিকৃতি মেশানো। বরং বলা যায়, বঙ্গবিভাগ হলে যে-ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, সে-ভবিষ্যৎবাণী অত্যন্ত নির্ভুলভাবে সবার আগে যোগেন্দ্রনাথই করেছিলেন। ২১ এপ্রিল ১৯৪৭-এ দিল্লির বাসভবনে ডাকা এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন-বঙ্গভঙ্গে কোনো সমস্যা সমাধান হবে না। আমি নিঃসন্দেহ বলতে পারি যে, এরূপ যদি ঘটে তাহলে পূর্ববঙ্গের হিন্দুরা পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিতে বাধ্য হবে। (২৩ এপ্রিল ১৯৪৭-এর The Statesman. The Hindusthan Times ইত্যাদি পত্রিকা দ্রষ্টব্য)

     ১৬ মে ১৯৪০ ভারত সভা হলে আরও স্পষ্টভাবে বলেন, পূর্ববঙ্গের বর্ণহিন্দুরা দেশত্যাগ করলে দরিদ্র তপশিলি কৃষক-শ্রমিক-মৎস্যজীবীরা আরও সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে ও মুসলমানদের দয়ার উপর তাদের বেঁচে থাকতে হবে, না হলে তাদের ধর্মান্তরিত হতে হবে। কারণ, এত ব্যাপক সংখ্যক লোকের পুনর্বাসন সম্ভব নয়। উপরন্তু বঙ্গবিভাগের ফলে তপশিলিরাই সবথেকে ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্বল হবে।

     ভাবলে অবাক হতে হয় যে, বঙ্গবিভাগের পরিণতি সম্পর্কে যোগেন্দ্রনাথ কত নিখুঁত ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন। পাকিস্তান ও মুসলিম লিগ সম্পর্কে এই যার ভবিষ্যৎবাণী তাঁকে কীভাবে পাকিস্তানপন্থী বা তার গোঁড়া সমর্থক বলা চলে?

     প্রকৃতপক্ষে, যোগেন্দ্রনাথ ছিলেন তৎকালীন বাংলার সবথেকে বাস্তববাদী রাজনীতিক। তিনিই বুঝেছিলেন বাংলার অধিকাংশ মুসলমানের মধ্যে আছে একটা প্রগতিমনস্কতা ও উদার সহনশীলতা, যা মিলনপন্থী ভারতীয় সংস্কৃতির প্রাণ। বাঙালি জাতীয়তা তথা শোষিতের শ্রেণিচেতনা জাগরণের মধ্য দিয়ে তাই সাম্প্রদায়িকতার সমস্যা কাটিয়ে অর্থনৈতিক ও অন্যান্য উন্নয়ন সম্ভব। তাঁর ধারণা কত সঠিক ছিল বোঝা যায় ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন এবং দ্বিজাতি তত্ত্বকে মিথ্যা প্রমাণ করে নতুন বাংলাদেশের জন্ম হওয়ায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদী এই মুসলিম চেতনাকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যোগেন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র বসু প্রমুখ হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র রাজনীতিক। কিন্তু আজ যাদের মহান রাজনীতিক বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে তাদের অনেকেই সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি ও আপন গোষ্ঠীস্বার্থের জেরে এই সহজ সত্যটুকু খুঁজে পাননি।

     যোগেন্দ্রনাথের ঐক্যবদ্ধ বাংলার দাবিকে শ্যামাপ্রসাদ বলেছিলেন-প্রকারান্তরে পাকিস্তানের দাবি। কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভার অধিকাংশ নেতাই শ্যামাপ্রসাদকে সমর্থন করেছেন। বাংলার মুসলিমরা যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ (৫৩ শতাংশ) তাই সংখ্যালঘু হয়ে হিন্দুদের সেখানে বাঁচা সম্ভব নয়, এই ছিল তাঁদের সিদ্ধান্ত।

     এই সিদ্ধান্তের মধ্যে যে-নির্লজ্জ কাপুরুষতা ছিল তাকে প্রবলভাবে আক্রমণ করে যোগেন্দ্রনাথ বলেছিলেন-হিন্দুরা যদি এত ভীরু কাপুরুষ হয় তবে পৃথিবীতে তাদের বেঁচে থাকার কোনো দরকার নেই। হিন্দুদের জগৎ থেকে মুখে যাওয়াই ভালো। (ভারত সভা হলে ভাষণ-১৬ মে ১৯৪৭)

     বস্তুতপক্ষে, যোগেন্দ্রনাথ বাংলার বীরজাতি নমঃশূদ্র ঘরের সন্তান। যারা বহুবার একক শক্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের দাঙ্গা-হাঙ্গামার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে জয়ী হয়েছে। সেখানে ৪৭ শতাংশ হিন্দু ৫৩ শতাংশ মুসলিমকে ভয় পেলে যোগেন্দ্রনাথ তাদের কাপুরুষ ছাড়া আর কীবা বলতে পারেন।

     তবে কাপুরুষতা ছাড়াও এর পিছনে আরেকটা কারণ ছিল, তা হল শাসন ক্ষমতায় কর্তৃত্ব হারানো। ব্রাহ্মণ্যবাদীরা শুধুমাত্র নিজেরা শাসক হবার জন্যই যে বঙ্গভঙ্গের সমর্থক হয়ে উঠেছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কৃষক-শ্রমিক সমস্যাকে গুরুত্ব দিতে তারা রাজি ছিল না। এতে বাধা দিয়েছিল বলেই যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের উপর তারা এত খাপ্পা হয়ে উঠেছিল। কলঙ্কিত করেছিল শোষণ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী, সাম্যবাদী চেতনার এক মহান নেতাকে; ভারত বিভাগ অনিবার্য হয়ে যাবার পর বাঙালি জাতীয়তাবাদকে আঁকড়ে ধরে যিনি বাঙালির সমূহ সর্বনাশ রোধ করতে চেয়েছিলেন।

     যোগেন্দ্রনাথ সম্পর্কে বিরোধীদের শেষ অভিযোগ হল, পাকিস্তান চেয়ে, কায়েম করেও শেষমেশ তিনি সবাইকে পাকিস্তানে অসহায় ফেলে রেখে নিজের জীবন বাঁচাতে পালিয়ে এসেছিলেন।

     আমরা ইতিপূর্বেই দেখেছি যে, যোগেন্দ্রনাথ পাকিস্তান কখনও চাননি। বঙ্গবিভাগ হলে অসহায় হয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসতেই হবে সে-কথাও তিনি বারবার বলেছিলেন। সুতরাং তাঁর পশ্চিমবঙ্গে আসাকে অভাবনীয়, অনৈতিক ও আকস্মিক বলা যায় না কোনো যুক্তিতেই। বরং বঙ্গভঙ্গের পরেও যে তিনি পূর্ববঙ্গে থেকে গিয়েছিলেন, তা শুধু কয়েক কোটি অসহায় মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে এবং অবশ্যই নিজের ব্যক্তিস্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে।

     সম্ভবত এই সিদ্ধান্তের পিছনে ছিল পূর্ব পরিকল্পনাও। যার ইঙ্গিত আম্বেদকরের পূর্বোক্ত চিঠি (চিঠির তারিখ ১৪ জুন ১৯৪৭) থেকে জানা যায়। ওই চিঠিতেই স্পষ্ট, দেশভাগ হলে পূর্ববাংলা নিয়ে কী করণীয় সে-সম্পর্কে যোগেন্দ্রনাথ ও আম্বেদকর পরস্পর মত বিনিময় করেছেন। বাবাসাহেবের শেষ পরামর্শ ছিল পূর্ববাংলার তপশিলিদের রক্ষাকবচের জন্য (safe guard) যা যা করণীয় তা যোগেন্দ্রনাথ নিজস্ব বিবেচনামতো করবেন। তবে যেকোনো আপৎকালীন অবস্থার জন্যও প্রস্তুত থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। শুধু পূর্ববাংলার ক্ষেত্রে নয়, সমগ্র ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে তপশিলিদের স্বার্থরক্ষার জন্য লড়াই করে যেতে হবে এই ছিল তাঁর শেষ নির্দেশ।

     লক্ষ করলে দেখা যাবে, পাকিস্তানে মন্ত্রিসভায় অংশ নিয়ে যোগেন্দ্রনাথ সাধ্যমতো এই কাজ করে গেছেন। অন্য সব নেতা ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের হিসাব কষলেও, স্বেচ্ছায় নিজ কাঁধে যে-ঐতিহাসিক দায়িত্ব যোগেন্দ্রনাথ তুলে নিয়েছিলেন-তা থেকে তিনি কখনও মুক্তি পেতে চাননি।

     তা সত্ত্বেও অনেকে প্রশ্ন করেন, তিনি পূর্ববঙ্গ ছেড়ে গেলেন কেন? কেন সেখানকার তপশিলিদের জন্য জীবন দিলেন না?

     বস্তুতপক্ষে, কখনো কখনো আবেগে আমরা এমন অন্ধ হয়ে যাই যে, ঘটনার বিচার করতে গিয়ে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ভুলে যাই। যোগেন্দ্রনাথের মতো অত প্রাজ্ঞ বিবেকবান মানুষ কেন এমন একটা কাজ করলেন, সুস্থির চিত্তে একবার ভেবে দেখি না। শুধু কাদা ছিটিয়ে আনন্দলাভ করি। নিজেদের সীমিত বুদ্ধির গর্বে অকারণে বুক ফুলিয়ে বেড়াই।

     যোগেন্দ্রনাথ বঙ্গবিভাগের পরিণাম কী হবে আগেই জানতেন। তা সত্ত্বেও জিন্নার ঘোষণা (পাকিস্তান গণপরিষদে সভাপতিরূপে ১১ আগস্ট ১৯৪৭)-পাকিস্তানের কেউ যেন মুসলমানরূপে নয়, হিন্দুরূপে নয় পাকিস্তানিরূপেই নিজেদের পরিচয় দেন-তাঁকে আশ্বস্ত করেছিল। কিন্তু জিন্নার মৃত্যুর পর পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা পুরোপুরি শরিয়তপন্থীদের কব্জায় চলে যাওয়ায় তাঁর আশঙ্কাই ক্রমে ক্রমে সত্য হচ্ছিল। সাধ্যমতো চেষ্টা করেও তিনি তা রোধ করতে পারেননি। পদত্যাগপত্রেই তিনি বলেছিলেন-এই সরকারের সংখ্যালঘু-বিদ্বেষী ভাবমূর্তিকে বিশ্বের সামনে প্রকট করাই তাঁর প্রথম উদ্দেশ্য।

     দ্বিতীয় উদ্দেশ্য কী ছিল? সবাই আমরা জানি পূর্ববাংলা থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ তখন ছিন্নমূল হয়ে ভারতের পথে-প্রান্তরে ভেসে বেড়াচ্ছেন। নেতারা পূর্ব প্রতিশ্রুতি সব ভুলে বসে আছেন। যেসব তপশিলি নেতারা যোগেন্দ্রনাথের বিরোধিতা করে এক সময় আশ্বাস দিয়েছিলেন-উদ্বাস্তুদের সবরকম পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হবে, তাঁরাও তখন ঠুটো জগন্নাথ হয়ে বসে আছেন। অথচ ওই উদ্বাস্তু স্রোতই শেষ কথা নয়। যোগেন্দ্রনাথের ভবিষ্যৎবাণী অনুসারে পূর্ববঙ্গের অন্যদেরও একে একে চলে আসতে হবে। কিন্তু এলে কী হবে? পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে এলেও তাদের দুর্দশার অন্ত থাকবে না। এ অবস্থায় পাকিস্তানে থেকে সরকারের বিরোধিতা করে জেলে গেলেই কী উপমহাদেশ জোড়া এই লক্ষ লক্ষ মানুষের দুর্দশা ঘুচবে?

     বরং, যে-দেশে বসবাস করা যাবে না বলেই তিনি জানেন, সেখানে জেলে বন্দি থাকার চেয়ে ভারতে তাদের দুর্দশামোচন ও প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করা অনেক বেশি জরুরি ও সময়োপযোগী ছিল। এবং সকলেই জানেন যোগেন্দ্রনাথ ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে উদ্বাস্তুদের নিয়ে সেই আন্দোলনেরই সাহস ও শক্তি জুগিয়েছেন।

     যোগেন্দ্রনাথ ব্যক্তিস্বার্থ লোভী হলে মুখ বুঁজে পাকিস্তানে বসে মন্ত্রিত্ব করতে পারতেন। বিরোধীদের অভিযোগমতো মুসলমানও হয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু তা না করে কষ্ট ও উপেক্ষা পাবেন জেনেও পশ্চিমবঙ্গে এলেন কেন? এলেন, কারণ ততদিনে দলিতদের অস্তিত্ব একেবারে বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে। তৃতীয় শক্তি হিসাবে উঠে দাঁড়াবার যে-স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন-যার জন্য আজীবন কঠিন লড়াই করেছেন তিনি-তাকে আবার পুনর্গঠিত করতে হলে তপশিলি শূন্যপ্রায় পূর্ব পাকিস্তান নয়, তপশিলিদের ঢল নামা পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতই হতে পারত তাঁর উপযুক্ত কর্মস্থল। সেই সিদ্ধান্তই তাই তিনি গ্রহণ করেছিলেন।

     কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত না নিয়ে, হারিয়ে যাওয়া জমি পুনরুদ্ধারের জন্য একজন রাষ্ট্রনায়ক যেমন পুনরায় শক্তি ও সৈন্য সংগ্রহ করে যেতে থাকেন, যোগেন্দ্রনাথও তাই করেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি যারা বুঝতে চাননি কোনোদিন, তাঁদের কাছে তাঁর এই দিকটি তাই কোনোদিনই উন্মোচিত হয়নি। তিনি তো বারবার স্পষ্ট ভাষায় লেছেন-

আমরা চাই আট কোটি মুক, নিঃস্ব, নির্যাতিত, নিষ্পেষিত জনগণের রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান ও সামাজিক মুক্তি। আমার দাবি কি হিন্দুস্তান’, কি পাকিস্তানযে-ই স্বীকার করিয়া নিবে তাহার সাথে মিলিতে আমরা দ্বিধাবোধ করিব না।... তপশিলি জাতি কি কংগ্রেস কি লীগ কাহারও উপর নির্ভর করিতে চাহে না। তপশিলি জাতি নিজের পায়ে দাঁড়াইতে চায়। অন্যে দয়া করিয়া কাহাকেও কিছু দেয় না, কিন্তু অধিকার আদায় করিবার মতো শক্তি অর্জন করিতে হয়। তপশিলি জাতির সেই শক্তি অর্জন করিতে হইবে।

     বলাবাহুল্য, বঙ্গবিভাগের মাধ্যমে তাঁর সেই প্রত্যাশায় কঠারাঘাত হানতে পেরেছিল শাক্তিশালী প্রতিপক্ষ। তারা তপশিলি-ভূমিপুত্রদের হারানো অধিকার পুনরুদ্ধারের সুযোগ দিতে সম্মত ছিল না। অন্যদিকে, পাকিস্তান কায়েম হবার পর মৌলবাদী মুসলমান নেতৃত্বের কাছে তপশিলিদের প্রয়োজন ফুরিয়ে গিয়েছিল তাই এদের বিতাড়িত করতে তারা বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি।

     এই পরিস্থিতিতে তৃতীয় ফ্রন্টের নেতা হিসাবে যোগেন্দ্রনাথের জীবননাশ বা জেলবন্দি হয়ে যাওয়ার চেয়েও নতুনভাবে সৈনিকদের সংগঠিত করা বেশি জরুরি ছিল সে-কথা আগেই বলেছি। সেই শক্তি সংগ্রহ করে ভারতে দলিতমক্তি আন্দোলন ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি পাকিস্তানি নেতৃত্বের কাছেও তিনি বঞ্চনা প্রতিকারের সংগ্রামী ঘোষণা পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। পদত্যাগপত্রে বীর সেনাধ্যক্ষের মতোই খোদ পাকিস্তানের সংখ্যালঘু নিপীড়ক প্রধানমন্ত্রীকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন-

I may tell you and your fellow workers that Hindus will never allow themselves, whatever the threat or temptation, to be treated as jimmies in the land of their birth. To day they may. as indeed many of them had already done, abandon their hearths and homes in sorrow but in panic. Tomorrow they will strive for their rightful place in the economy of life. Who knows what is in the womb of the future?

     অর্থাৎ, আপনি এবং আপনার অনুগামীরা জেনে রাখুন, হিন্দুরা নিজেদের জন্মভূমিতে জিম্মি হয়ে থাকতে রাজি নয়। আজ অতি দুঃখে ও ত্রাসে নিজেদের জন্মভূমি পরিত্যাগ করে গেলেও আগামীতে কঠোর সংগ্রামের ভেতর দিয়েই নিজেদের ন্যায্য অংশ তারা আদায় করে নেবে। কে বলতে পারে কী লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের গর্ভে?

     লক্ষ করার বিষয়, জন্মভূমির অধিকার নির্বিবাদে ছেড়ে দিতে চাননি যোগেন্দ্রনাথ। স্বপ্ন দেখেছেন কঠোর সংগ্রামের ভেতর দিয়ে ন্যায্য অধিকার ছিনিয়ে নেবার। কী সেই ন্যায্য অংশ বা অধিকার? তা কি জন্মভূমির শরিকি ভাগ? তেমনই ইঙ্গিত রয়েছে তাঁর হুঁশিয়ারিতে। তাহলে পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করা ছাড়া সে-কাজ কীভাবে সম্ভব ছিল? যারা বলেন পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যোগেন্দ্রনাথ শহিদ হয়ে গেলেই ভালো হত, তারা তাঁর এই ভাবনার দিকটা খেয়াল করেননি। অবশ্য ভারতীয় রাজনীতিকদের অসহযোগিতা ও বিরূপ প্রচার তাঁকে কোণঠাসা করে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ করে ফেলতে সক্ষম হওয়ায় এবং আপন স্বজনদের চরমতম দুর্দশার জন্য যোগেন্দ্রনাথ মজবুত সংগঠন ও শক্ত জমি খুঁজে পাননি। জনসমক্ষে মিটিং করার সুযোগ পেতেই তাঁর কেটে গিয়েছিল প্রায় দু-বছর সময়। তাই হয়তো কার্যকরী কিছুই তিনি করে উঠতে পারেননি। কিন্তু অন্যসব ক্ষেত্রের ভবিষ্যৎবাণীর মতো তাঁর এই ভবিষ্যৎবাণীটিও বিফলে যায়নি। আমরা দেখেছি, সাতের দশকেই নিখিল বঙ্গ নাগরিক সংঘের ব্যানারে বীরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, কালিদাস বৈদ্য, সুব্রত চ্যাটার্জি প্রমুখ নেতৃবৃন্দ পূর্ববঙ্গের বিতাড়িত সংখ্যালঘুদের জন্য হোমল্যান্ডদাবি করে জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলে বাংলাদেশের সামরিক শাসকদের বেশ অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিলেন। প্রায় স্তিমিত হলেও এখনও কোথাও কোথাও তাদের দেওয়াল লিখন চোখে পড়ে। ১৯৭১-এর পর আগত উদ্বাস্তুদের জন্য নাগরিকত্ব বন্ধ হওয়ায় আগামীতে কোন্ পথ অবলম্বন করতে হবে এই দেশহারা লক্ষ লক্ষ অসহায় মানুষদের, কে বলতে পারে? যোগেন্দ্রনাথের ভাষায়-Who knows what is in the womb of the future?”

     সমস্ত দিক পর্যালোচনা করে এ কথা এখন নির্দ্বিধায় বলা যায়, ভারতের সর্বাপেক্ষা শোষিত-বঞ্চিত অংশের মানুষের অধিকারের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তিনি। দুয়োরানির ছেলে, সম্প্রীতি ও সাম্যের লক্ষ্যে ভারতের প্রকৃত সর্বহারাদের স্বপ্নদর্শী নেতা যোগেন্দ্রনাথের স্বপ্ন সফল হয়নি। অনেক কৌশলে সাহেবকে সংবিধান পরিষদে পাঠিয়েও শুধুমাত্র দেশভাগের বিপর্যয়ে চরমতম পরাজয়ের মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। বর্ণবাদীদের বিরুদ্ধে মুসলিম শক্তির সাহায্যে যথেষ্ট শক্তি অর্জন করলেও শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার ফাঁকিতে তলিয়ে যায় তাঁর সমস্ত প্রচেষ্টা। উল্টে, মিথ্যা প্রচারে পর্বতপ্রমাণ কলঙ্কের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয় তাঁর মাথায়। কারণ, ভারত বিভাগ অপরিহার্য জেনে শেষপর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ বাংলা টিকিয়ে রাখার যে-স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন তাতে মুসলমানরা প্রথম, দলিতরা দ্বিতীয় এবং অভিজাত হিন্দুরা নগণ্য তৃতীয় শক্তিতে রূপান্তরিত হত। আপন শ্রেণি ও গোষ্ঠীস্বার্থে সুয়োরানির সন্তান তথা কায়েমি স্বার্থভোগীদের তা মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। তাই দুয়োরানির সন্তানদের বলির পাঁঠা করা ছাড়া তাদের উপায় ছিল না। এতে অপরিহার্য ছিল যোগেন্দ্রনাথের চরিত্রহনন এবং বঙ্গবিভাগ।

     দুঃখের কথা, যাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি আমৃত্যু সংগ্রামী থেকে রিক্ত, নিঃস্ব, সর্বহারার জীবনযাপন করলেন, তাদের একাংশই বর্ণবাদীদের সুরে সুর মিলিয়ে তাঁর অবমূল্যায়ন করে। এর চেয়ে বড়ো ট্রাজেডি আর কী হতে পারে? ভারতীয় রাজনীতিতে মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথের চেয়ে বড়ো ট্র্যাজিক চরিত্রই বা আর কে হতে পারেন?

তথ্যসূত্র

 ১ বরিশাল মতুয়া ধর্মান্দোলনের অগ্রণী পুরুষ বিপিন গোঁসাই স্বয়ং ১৯৫৬ সালের নির্বাচনে ছিলেন যোগেন্দ্রনাথের প্রার্থীপদের প্রস্তাবক। তাঁর অনুগামীরাও ছিলেন খুবই সক্রিয়।

সূত্র: জগদীশচন্দ্র মণ্ডল, মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ, প্রথম সং, খণ্ড ১, পৃ. ১৪৮।

মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ, ১ম সং, ১ম খণ্ড, পৃ. ২১৫ দ্র.

 ওই, পৃ. ১৭২-১৭৫ দ্র.

8  The Stateman পত্রিকা ২২ ও ২৩ এপ্রিল ১৯৪৬-এ প্রকাশিতরায়-সুরাবর্দী পত্রাবলী

৫ পাকিস্তান মন্ত্রিসভা থেকে যোগেন্দ্রনাথের পদত্যাগপত্র দ্র. প্যারা-৫ He (Surawardy) requested me to visit those areas and address meetings of Muslims and Namasudras. The fact was that Namasudras in those areas had made preparations for retaliation. I addressed about a dozen of largely attended meeting. The result was that Namasudras gave up the idea of retaliation”.

 বঙ্গবঙ্গ, জগদীশচন্দ্র মণ্ডল, পৃ. ২৬, ১ম সংস্করণ দ্র.

 আম্বেদকরের একান্ত সেবক নানক চাঁদ রত্তুর ফাইল থেকে এই চিঠির কপি সংগ্রহ করে এনে দিয়েছেন রণেন্দ্রলাল বিশ্বাস। দ্রষ্টব্য, বর্তমান সংকলনের ৩নং চিঠি।

মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ, খণ্ড ২, পৃ. ৪৪, ১ম সং. দ্র.

                               _______________________

 

Read More