Wednesday, 29 April 2026

// // Leave a Comment

গুরুচাঁদ ঠাকুরের আলোয় মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল কর্তৃক শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের আন্দোলন। লেখক – জগদীশচন্দ্র রায়


 গুরুচাঁদ ঠাকুরের আলোয় মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল কর্তৃক

শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের আন্দোলন

লেখক – জগদীশচন্দ্র রায়

      গুরুচাঁদ ঠাকুরের বয়স পড়ন্ত বিকাল। তখন তিনি ৭০ বছরের বৃদ্ধ। আর তারই ভাব শিস্য যার বয়স মাত্র ২২ বছর। তখন ১৯২৬ সাল। যার শরীরে বইছে উন্মত্তো জোয়ারের ঢেউ। তখনকার দিনে চলছিল জমিদারের অত্যাচারবাহ্মণ্যবাদীদের ধর্মীয় ও সামাজিক শোষণ যার  পরিণতি স্বরূপ চরম দারিদ্র ও অশিক্ষা অন্ধকার হয়ে গ্রাস করে নিয়ে ছিল এই সবকিছুর বিরুদ্ধে প্রতিকারের জন্য যার মনের মধ্যে জ্বলছিল আগুন, তাঁর কন্ঠে ধ্বনিত হোল এই বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত বৃদ্ধেরই বাণী। গুরুচাঁদ ঠাকুর যেমন বলেছিলেন,

খাও বা না খাও      তাতে দুঃখ নেই

চেলে মেয়েকে শিক্ষা দাও এই আমি চাই। (গুরুচাঁদ চরিত পৃ ১৪৪)

ছেলে মেয়েকে দিতে শিক্ষা

 প্রয়োজনে কর ভিক্ষা।

তিনি বুঝতে পেরিছিলেন অশিক্ষা হচ্ছে মারণ রোগ। তার জন্য তিনি বলেন,

অজ্ঞান ব্যাধিতে ভরা আছে এই দেশ।

জ্ঞানের আলোকে ব্যাধি তুমি কর শেষ।। -গুরুচাদ চরিত- পৃঃ ১৩৭

হ্যাতুমি যদি এই অজ্ঞানতার ব্যাধি থেকে মুক্ত হ’তে চাও তাহলে তুমি একমাত্র জ্ঞানের আলোদিয়েই এই ব্যাধি থেকে মুক্তি পাবে। আর তার জন্য তোমাকে বলি-

তাই বলিভাই       মুক্তি যদি চাই

     বিদ্যান হইতে হবে।

পেলে বিধ্যাধন       দুঃখ নিবারণ

     চির সুখি হবে ভবে।। (গুরুচাদ চরিত—ৃঃ ১৩০)

সেই উদিয়মান যুবক ঘোষণা করলেন –    

    “জমিদাররা চিরদিন প্রজাদের শোষণ করে বিসাল বৈভবের সোপান তোরী করে চলেছে। তাদের কাছে আবেদন নিবেদন করে কোনো লাভ হবে না। নিজেদের চেষ্টাতেই নিজেদের উন্নতির সোপান তৈরী করতে হবে। নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থে নিমগ্ন না রেখে সমবেত প্রচেষ্টায়  সমাজের উন্নতি সাধন করতে হবে। স্বার্থত্যাগ ব্যতীত সমাজের কাজ হয় না। শিক্ষা হচ্ছে সমাজ উন্নয়নের চাবিকাঠি। নিরক্ষর  অশিক্ষিত সমাজকে কেউ মর্যাদা দেয় না। মর্যাদা মানুষকে নিজের  চেষ্টায় অর্জন করতে হয়। মর্যাদালাভের প্রথম সোপান হল শিক্ষালাভ। সমাজ থেকে নিরক্ষরতকে দূর করতে হবে। শিক্ষালাভ করলেই মানুষ সচেতন ও সংঘবদ্ধ হতে পারে। সংঘবদ্ধ মানুষকেই সকলে সমীহ করে থাকে ফলে সংঘবদ্ধ মানুষদের কেউ অত্যাচারনিপীড়ন ও শোষণ করতে  পারে না। প্রজারা খাদ্য বস্ত্র ও অন্যান্য সম্পদ তৈরি করে। কিন্তু জমিদারদের শোষণ ও অত্যাচারে তারা দরিদ্র ও নিঃশ্ব। শিক্ষালাভ করলে এবং সংঘবদ্ধ হলে আমরা জমিদারদের শোষণ ও অত্যাচার থেকে মুক্তিলাভ করব।” (তথ্য সূত্রঃ- ক্যুইজ অন- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথপৃ ৪/৫)

   ১৯৩৭ সালের ৭ ফেবরুয়ারী বাখরগঞ্জ উত্তর-পূর্ব নির্বাচন কেন্দ্র থেকে স্বনামধন্য আইনজীবি ও জমিদার অশ্বিনীকুমার দত্তের ভ্রাতুস্পুত্র কংগ্রেসের প্রার্থী সরল দত্তকে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল (১২০৬৯-১০৬১৩=) ১৮১৬ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে আগৈলঝাড়া ভেগাই হালদার পাবলিক একাডেমীকে হাইস্কুলে পরিণত করেন এবং তিনি এই বিদ্যালয়ের সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। (তথ্য সূত্রঃ- ক্যুইজ অন- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথপৃ ৯/১০)

   পুলিশ বিভাগে তপশিলি  পুলিশদের জন্য আলাদা কোয়াটার্‌স -এর ব্যবস্থা করেন। কারণ তখকার দিনে তপশিলি পুলিশদের সাধারণ কোয়াটার্‌স-এ বসে থাকতে দেওয়া হত না। যোগেন্দ্রনাথ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীন সাহেবকে ধরে তপশিলি পুলিশদের জন্য সাধারণ ব্যারাকের একটি অংশ বরাদ্দ করেন।

    এই সময় গ্রাম অঞ্চলে জল নিকাশের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ফলে চাষীদের যথেষ্ট ক্ষয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হত। তাঁর চেষ্টায় গ্রামাঞ্চলে অনেক বাঁধ তৈরিখাল খনন এবং রাস্তা নির্মাণ করা হয়।  

   তপশিলি জাতির ছাত্রদের কলকাতা শহরে থেকে পড়াশুনা করার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। সে জন্য তপশিলিদের জন্য তিনি দুটি ছাত্রাবাসের দাবি করেন। মুসলিম লীগের সর্থনে তপশিলি ও মুসলমান্দের জন্য দুটি করে ছাত্রাবাস নির্মাণের প্রস্তাব অনুমোদন লাভ করে।

    তৎকালীন অর্থমন্ত্রী নলিনী রঞ্জন সরকারকে যোগেন্দ্রনাথ বলেন প্রতিটি কলেজ হোস্টেলে কিছু সংখ্যক আসন তপশিলি ছাত্রদের জন্য সংরক্ষিত করলেদরিদ্র ছাত্রদের সিটরেন্ট ফ্রি করে এবং তাদের ভরণপোষণের জন্য মাসে ১৫ টাকা অনুদানের ব্যবস্থা করা হলে সাধারণ ছাত্রাবাস থেকে তপশিলি ছাত্রদের পড়াশুনা করতে কোনো অসুবিধা হবে না। অর্থমন্ত্রী যোগেন্দ্রনাথের প্রস্তাব পুরোপুরি মেনে নিলেন। তপশিলি শ্রেণির ছাত্ররা আজ পর্যন্ত পড়াশুনার ক্ষেত্রে যেসব সুযোগ সুবিধা পেয়েছে তার সূত্রপাত যোগেন্দ্রনাথ করেছিলেন।

    তপশিলি ছাত্রদের ৭ম শ্রেণির পরিবর্তে ৪র্থ শ্রেণি থেকে বৃত্তি প্রদানমফঃস্বল শহরের ছাত্রাবাসগুলিতে আসল সংরক্ষণ এবং উক্ত ছাত্রদের জন্য সরকারী ব্যবস্থা করা এম এল সি হিসাবে যোগেন্দ্রনাথের উল্লেখযোগ্য কাজ। (তথ্য সূত্রঃ- ক্যুইজ অন- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথপৃ ৯/১০)  

    এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে গণতন্ত্রের আদর্শ অনুযায়ী কংগ্রেসহিন্দু মহাসভা ও তপশিলি বিধায়কদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠিত হলে এই মন্ত্রীসভায় যোগেন্দ্রনাথ কৃষকদের স্বার্থে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ করে কৃষকদের মধ্যে জমি বিলির ব্যবস্থা করেন। (তথ্য সূত্রঃ- ক্যুইজ অন- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথপৃ ১০/১১)

     এই সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদগুলি অস্থায়ী ছিল এবং তাঁরা নিয়মিত মাসিক বেতন পেতেন না। যোগেন্দ্রনাথ শিক্ষকদের পদগুলি স্থায়ীকরণের ব্যবস্থা করেন। (তথ্য সূত্রঃ- ক্যুইজ অন- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথপৃ ১১)

     ১৯৩৯ সালে কলকাতা কর্পোরেশনে মুসলমান ও তপশিলিদের জন্য আসন সংরক্ষণ ও পৃথক নির্বাচনের জন্য বিল আনা হয়। যোগেন্দ্রনাথ তপশিলি প্রার্থীদের জন্য শতকরা ৫টি করে আসন সংরক্ষিত করেন। এ কাজে তাঁকে কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে হয়েছিল। (তথ্য সূত্রঃ- ক্যুইজ অন- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথপৃ ১১/১২)

    ১৯৪৩ সালে যোগেন্দ্রনাথ নাজিমুদ্দিন মন্ত্রীসভায় যোগদানের শর্ত স্বরূপ তপশিলিদের জন্য দাবি আদায় করেন-

১) তপশিলিদের ৩ জন্য মন্ত্রী ও ৩ জন্য পার্লামেন্টারী সেক্রেটারী নিয়োগ করতে হবে।

২) তপশিলি ছাত্রদের শিক্ষার জন্য বার্ষিক ৫ লক্ষ টাকার রেকারিং গ্রান্ট মঞ্জুর করতে হবে।

৩) সাম্প্রদায়িক অনুপাত অনুসারে সকল সরকারী চাকুরীতে তপশিলি প্রার্থীদের নিয়োগ করতে হবে। ‘গেজেটেড পোস্টেও সংরক্ষণ’ নীতি মানতে হবে। তপশিলি এম এস সি-রা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যেউক্ত দাবি সমূহ যিনি মেনে নেবেন তাঁকেই নেতা হিসাবে সমর্থন করবেন। (তথ্য সূত্রঃ- ক্যুইজ অন- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথপৃ ১৪)

    খাজা নাজিমুদ্দিনের আমলে তপশিলিদের জন্য সরকারী চাকরীতে সংরক্ষিত কোটা থাকলেও কিছু কিছু বিভাগ থেকে অভিযোগ আসছিল যেএই কোটা সঠিকভাবে দেওয়া হচ্ছে না। তখন যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল মন্ত্রীসভার মিটিং-এ এই ঘটনার উল্লেখ করেনএবং এটাও বলেন, যদি অন্যান্য বিভাগে তপশিলিদের কোটা পুরণ করা না হয়তবে আমার বিভাগের একটি চাকরিও মুসলমান অথবা বর্ণ হিন্দুকে দেবো না। সমস্ত চাকরি তপশিলি জাতির প্রার্থীগণকে দিয়ে অন্য বিভাগের ক্ষতি পূরণ করব।।” তপশিলি ছাড়া অন্য কাউকেই চাকরীতে নিয়োগ করব না।”

      এরূপ মন্তব্যে হামিদুল হক চৌধুরীসহ লিগের প্রভাবশালী সদস্যগণ ক্রুদ্ধ স্বরে যোগেন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে বাক্য প্রয়োগ করতে থাকেন। তখন যোগেন্দ্রনাথও অনুরূপ ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলেন-“মিঃ হামিদুল হক চৌধুরীলালচোখ দেখাবেন না। লালচক্ষু আমাদেরও আছে। আমি মন্ত্রীত্ব করিচাকরি নয়এই মন্ত্রী কারো দেওয়া দান নয়। যে সুখের ঘর বেঁধে দিয়েছিপ্রয়োজন হলে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে সেটা ভেঙ্গে দিতে পারি।” এই মন্তব্য শুনে খাজা নাজিমুদ্দিন তাঁকে আশ্বাস দিলেন যেসমস্ত দপ্তরে যাতে সংরক্ষিত কোটা পূরণ হয় তা তিনি অবশ্যই দেখবেন। (তথ্য- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ ১ম খণ্ডলেখক- জগদীশ্চন্দ্র মণ্ডলপৃষ্ঠা ১১০)।

    যোগেন্দ্রনাথের মন্ত্রীত্বকাল কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও ক্যাম্বেল মেডিকেল স্কুলে সংরক্ষণ প্রথা চালু হয়। তাঁর তত্ত্বাবধানে প্রচুত তপশিলি ছাত্র-ছাত্রী মেডিকেন কেলেজে ও মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হয়ে পরবর্তিকালে চিকিৎসক সিসাবে জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিলেন। (তথ্য সূত্রঃ- ক্যুইজ অন- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথপৃ ১৬)

    যোগেন্দ্রনাথের উদ্যোগে কলকাতা শহরে কলেজ ও উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে পাঠরত তপশিলি ছাত্রদের জন্য উদয়ন ছাত্রাবাস’ এবং ওয়েলিংটন স্ট্রীটে ভারতী ভবন’ ৭৬ নং চিত্তরঞ্জন এভিনিউতে প্রতিষ্ঠিত হয়।

  নাজিমুদ্দিন মন্ত্রীসভা গঠিত হবার পর একদিন মন্ত্রীমণ্ডলীর সভায় একজন মন্ত্রী কলকাতায় মুসলিম ছাত্রদের দজন্য দুটি হোস্টেল করার প্রস্তাব তোলেন। সঙ্গে সঙ্গে যোগেন্দ্রনাথও প্রস্তাব তোলেন যে তপশিলি ছাত্রদের কলকাতা শহরে লজিং বা থাকার মত জায়গা পাবার সুযোগ নেই। উচ্চবর্ণের হিন্দুরা তপশিলিদের ঘর ভাড়া দেয় না। (সেই সময় দেওয়া হতো না)। যোগেন্দ্রনাথের এই প্রস্তাবকে কেউই অস্বীকার করতে পারলেন না। ফলে একই সঙ্গে মন্ত্রীসভায় প্রস্থাব গৃহীত হল যেমুসলিম ছাত্রদের জন্য ২টি এবং তপশিলি ছাত্রদের জন্য ২টি হোস্টেল স্থাপন করা হবে। (তথ্য সূত্রঃ- ক্যুইজ অন- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথপৃ ১৭)  

নারী শিক্ষার জন্য গুরুচাঁদ ঠাকুর যেমন বলেছেন-

শুনেছি পিতার কাছে আমি বহুবার।

নারী ও পুরুষ পাবে সম অধিকার।।

সমাজে পুরুষ পাবে যে অধিকার।

নারীও বাইবে তাহা করিলে বিচার।।

তাই তাঁর উদ্যোগে ১৯৩২ সালে ওড়াকান্দীতে হরি-গুরুচাদ মিশন’ প্রতিষ্ঠা করে সেই মিশিনের সহায়তায় ওড়াকান্দীর তালতলায় নারী শিক্ষার জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। আবার 

নারী শিক্ষা তরে প্রভু আপন আলয়।

শান্তি-সত্যভামা’ নামে স্কুল গড়ে দেয়।।”(গুরুচাঁদ চরিত পৃ ৫৪৬)

অর্থাৎ শান্তি সত্যভামা’ (শান্তি গুরুচাঁদ ঠাকুরের মাআর সত্যভামা গুরুচাঁদ ঠাকুরের জীবনসঙ্গিনী) –এর নামে একটা আলাদা নারীদের জন্য স্কুল তৈরি করেন। তিনি ঘোষণা করেন-

বালক বালিকা দোঁহে(দুজনেপাঠশালে দাও।

লোকে বলে মার গুণে ভালো হয় ছাও(সন্তান)” (গুরুচাঁদ চরিত পৃ ৫২৯)

                 নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে যোগেন্দ্রনাথে অবদান-

    ১৯৪৪ সালে নারী শিক্ষার উপর যোগেন্দ্রনাথ জোর দিয়ে বলেনপুরুষেরা বেশিরভাগ সময় কাজ কর্মে গৃহের বাইরে থাকে। সেজন্য তারা সন্তানদের পড়াশুনার দিকে লক্ষ্য দিতে পারে না। সেজন্য নারী শিক্ষার একান্ত প্রয়োজন। (তথ্য সূত্রঃ- ক্যুইজ অন- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথপৃ ১৮/১৯)

    তিনি তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নাজিমুদ্দিন খানের নিকল অবৈতনিক প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বিধান পরিষদে বিপুল ভোটে উক্ত বিলটি পাশ হয়।

    যোগেন্দ্রনাথে চেষ্টার ফলে নাজিমুদ্দিন সাহেবের মন্ত্রীসভায় তপশিলি ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষার জন্য ৮ম শ্রেণির পরিবর্তে ৪র্থ শ্রেণি থেকেই অনুদানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

    নিরক্ষরতা দূরীকরণের পরিকল্পনায় যোগেন্দ্রনাথের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ভারত দরিদ্র দেশসেজন্য সরকারী অর্থ যাতে সাশ্রয় করা যায় সেদিকে তিনি লক্ষ্য দিলেন। তিনি ছাত্র সমাজকে প্রত্যেক বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা দেবার ব্যবস্থা করেন। এই সময় ছাত্র সমাজে এক নবী উৎসাহের সঞ্চার হয়েছিল। (তথ্য সূত্রঃ- ক্যুইজ অন- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথপৃ ১৯)

    ১৯৪৪ সালে যোগেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে বরিশালে সন্তোষকুমারী তালুকদারের নেতৃত্বে একটি মহিলা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় যোগেন্দ্রনাথ বলেছিলেন, মায়েরাই শিশুদের প্রথম শিক্ষায়ীত্রী। তাই তপশিলি সমাজাকে শিক্ষিত করতে হলে নারী সমাজকে আগে শিক্ষাদান করা দরকার। প্রতিটি পরিবারের মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে হবে। (তথ্য সূত্রঃ- ক্যুইজ অন- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথপৃ ২২)

    যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের মন্ত্রীত্বকালে তপশিলি ছাত্ররা সরকারী বৃত্তি লাভ করে বিদেশে উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ পেয়েছিল। এইসব ছাত্রদের মধ্যে একজন ছিল গোপালগঞ্জের কুমুদবন্ধু মজুমদার। তিনি আমিরিকার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা লাগের সুযোগ পান। আমেরিকা যাওয়ার জন্য তাঁর কিছু অর্থের অভাব ঘটে। তিনি তখন যোগেন্দ্রনাথের কাছে সাহায্য চান। তিনি বলেন ফিরে এসে চাকরি পাওয়ার পর এই টাকা পরিশোধ করবেন। যোগেন্দ্রনাথ তাঁকে ৭৫০ টাকার একটি চেক লিখে দেন।

    কুমুদবন্ধু উচ্চশিক্ষা লাভ করে ফিরে এসে বাংলার সরকারের শিক্ষা দপ্তরে উচ্চপদে চাকরি করেন। কিন্তু যোগেন্দ্রনাথের ঋণ পরিশোধের কথা কখনো মনে করেননি।

    পরবর্তীকালে যোগেন্দ্রনাথ আর্থিক অনটনে যখন কাল কাটাচ্ছিলেনতখন তিনি কুমুদবাবুকে তাঁর ঋণের কথা স্মরণ করিয়ে দেন এবং মাসে অন্ততঃ ৫০ টাকা করে পরিষোধ করার প্রস্তাব দিয়ে পত্র দেন। কিন্তু কুমুদবাবু সেই পত্রের জবাব দেওয়ার মতো সৌজন্যবোধটুকুও দেখাননি। এই ধরনের নেমকহারাম ব্যক্তির সংখ্যা তপশিলি সমাজে নিতান্ত কম নয়। (তথ্য সূত্রঃ- ক্যুইজ অন- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথপৃ ২২)

 

Read More
// // Leave a Comment

মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের প্রতি বর্ণ হিন্দুদের দ্বারা বিষ ছড়ানোর পিছনের কারণ কী? লেখক- জগদীশ চন্দ্র মণ্ডল

 

 


মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের প্রতি বর্ণ হিন্দুদের দ্বারা বিষ ছড়ানোর পিছনের কারণ কী? যেখানে তিনি না কংগ্রেস না গান্ধীকে ছেড়ে কথা বলেছেন। আবার তাঁর স্বজাতি প্রেম যে কতো গভীর নিচের এই ভাষণ পড়লে সেটা অনুধাবন করা যাবে।

মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল: অধিকার আদায়ের আপসহীন কণ্ঠস্বর

     বর্ণহিন্দুদের বিদ্বেষের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের স্পষ্টবাদিতা ও আপসহীন রাজনৈতিক অবস্থান। বিশেষ করে তাঁর নিচের এই ভাষণটি পড়লে বোঝা যায়, তিনি কেন সেদিন কংগ্রেস কিংবা গান্ধী—কাউকেই রেয়াত করেননি। এই ভাষণটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং তাঁর প্রগাঢ় স্বজাতি প্রেমের এক অনন্য দলিল।

 করিমগঞ্জে আসাম প্রাদেশিক তফসিলী ফেডারেশনের অধিবেশন

সভাপতি মাননীয় শ্রীযুত যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল

(তথ্য- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ, ২য় খণ্ড, লেখক- জগদীশ চন্দ্র মণ্ডল, পৃ. ১৩১-১৩৩)     

     ----অতঃপর সম্মেলনের সভাপতি যোগেন্দ্রনাথ মুহুর্মুহু জয়ধ্বনির মধ্যে তাঁহার আড়াই ঘণ্টাব্যাপী অভিভাষণে বলেন:-মুসলিম লীগ আমাকে অন্তর্বর্তী সরকারে মনোনীত করায় কংগ্রেসীরা প্রচার করিয়াছিলেন আমি নাকি মুসলমান হইয়া গিয়াছি। তদুত্তরে আমি বলিতে চাই, বর্ণ-হিন্দু প্রতিষ্ঠান কংগ্রেস মিঃ আসফ আলী ও মৌলানা আজাদ, যাহারা আজও মুসলমান বলিয়া পরিচয় দেন এ দুই জনকে মনোনীত করায় তাঁহারা যেমন হিন্দু হন নাই, তদ্রুপ আমিও মুসলমান হই নাই। যদি তাঁহারা বলেন যে, তাঁহারা হিন্দু হইয়া গিয়াছেন তবে কংগ্রেস সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠান বলিয়া দাবি করে কিরূপে?

     মিঃ গান্ধী বলেন, ইহা মিঃ জিন্নার একটি ষড়যন্ত্র। কিন্তু মিঃ গান্ধী ভুলিয়া যান তিনি যখন কংগ্রেসী "শো-বয়" মিঃ জগজীবন রামকে অন্তর্বর্তী সরকারে মনোনীত করেন, তখন ষড়যন্ত্র হয় না, ষড়যন্ত্র হয় তখন, যখন মিঃ জিন্না ৮ কোটি তফসিলী জাতির প্রকৃত প্রতিনিধিকে অন্তর্বর্তী সরকারে স্থান দেন। এটাই বুঝি মহাত্মার মাহাত্ম্যের স্বরূপ?

    বর্ণহিন্দুদের যুগ যুগ ব্যাপী নির্যাতনের কথা উল্লেখ করিয়া যোগেন্দ্রনাথ বলেনঃ ভগবানের সৃষ্ট মানুষ আমরা, কিন্তু মানুষ হইয়াও জন্মগত কারণে আজ আমরা মানুষের অধিকার হইতে বঞ্চিত। ভারতের দক্ষিণাংশে আজও আমাদের উপর যে নির্যাতন চলিতেছে তাহার তুলনা সমস্ত সভ্যজগতে মিলে না। সেখানে মন্দিরের দ্বার আমাদের নিকট চিরদিনের জন্য বন্ধ। শাস্ত্র আলোচনা তো দূরের কথা, শাস্ত্রের বচন শুনিলেও যে শাস্তির বিধান আছে, তাহা মানবতার কলঙ্ক। সেখানে রাস্তা-ঘাট, পুকুর, বাজার, স্কুল সব কিছুই আমাদের জন্য পৃথক। তাই আজ আমাদের দাবি, সব কিছুই যখন আমাদের পৃথক করিয়া দিয়াছ, তখন নির্বাচনটাও আমাদের জন্য পৃথক করিয়া দাও, কিন্তু ইহাতে বাপুজীর স্বার্থে আঘাত পড়ে, আজ তফসিলী জাতি তাহাদের সম্বন্ধে সচেতন, তাহারা তাহাদের দাবি আদায় করিবেই করিবে।

     মিঃ গান্ধীর রাম রাজত্বের কথা উল্লেখ করিয়া তিনি বলেন: আজ মিঃ গান্ধী রাম রাজত্বের জন্য চিৎকার করিতেছেন। কিন্তু এই রাম রাজত্বেই রামচন্দ্রের গুরু 'বশিষ্ঠদেব' শূদ্রের ছেলের ব্রহ্মার আরাধনা করিবার অধিকার নাই-এই বলিয়া রামচন্দ্রকে দিয়া শম্বুককে হত্যা করেন। এই তো গান্ধীজীর রাম রাজত্বের নমুনা।

     তফসিলীগণের রাজনৈতিক দাবি আদায়ের আন্দোলনকে ব্যর্থ করিবার জন্য কীটদষ্ট শাস্ত্রের পাতার বচন উদ্ধৃত করিয়া তিনি ব্যবস্থা দিতেছেন- সর্বজাতি হিন্দুর জলচলে কোনও বাধা নাই। এতদিন এই শাস্ত্রের বচন কোথায় ছিল? বর্ণহিন্দুরা মনে করিয়াছেন, জলচলের আন্দোলনে তফসিলীগণকে ব্যস্ত রাখিয়া তাহাদের রাজনৈতিক দাবি ভুলাইয়া ফেলিবেন। গ্রুপিং এর বিরুদ্ধে আমাদের মত জাহির করিয়া শাসনতন্ত্র রচনা করিয়া ফেলিবেন। বন্ধুগণ, "জলচলের ছলনায় ভুলিবেন না, আমাদের জল অচলই থাকুক। আমরা চাই আমাদের রাজনৈতিক দাবি, চাই স্বতন্ত্র আসন, স্বতন্ত্র বৃত্তি, চাকুরী। কংগ্রেসীদের আমাকে হিংসা করিবার কারণ-দেবগুরু বৃহস্পতি ছিলেন স্বর্গের আইন সচিব। কিন্তু মর্তের সেই আসনে আজ এক চণ্ডালের ছেলে। এটা তাহাদের সহ্য হয় না। তফসিলীরা আজ চায় সেই শাসনতন্ত্র, যে শাসনতন্ত্রে আমাদের লোক বৃহস্পতির আসনে বসিতে পারে।

     আমি সমস্ত জীবন ধরিয়া আমার নির্যাতিত তফসিলী ভাইদের জন্য সেবা করিয়া আসিতেছি। তফসিলী ভাইদের উদ্ধারের জন্য আমি বাঁচিয়া আছি। যদি আজ কেহ নিশ্চয় করিয়া বলিতে পারে যে, আমার জীবনের বিনিময়ে ৮ কোটি তফসিলীরা সার্বভৌম মুক্তি আসিবে, তবে আমি সেই মৃত্যুকে তিলে তিলে বরণ করিতে পারিব। যদি সমুদ্রে ঝাঁপ দিলে অথবা জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে আমাকে নিক্ষেপ করিলে সে মুক্তি মিলে, তবে আমি দুর্বার আকাঙ্খা লইয়া তাহাতেই ঝাঁপাইয়া পড়িব।

 

Read More

Saturday, 25 April 2026

// // Leave a Comment

মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের ঐতিহাসিক ভাষণ। লেখক- জগদীশ চন্দ্র মণ্ডল। মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ, ২য় খণ্ড

 


মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের ঐতিহাসিক ভাষণ

বঙ্গীয় প্রাদেশিক তফসিলী জাতি ফেডারেশনের চতুর্থ বার্ষিক অধিবেশন

তারিখ -৩১ ডিসেম্বর, ১৯৪৬

স্থান-কলিকাতা

(তথ্য- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ, ২য় খণ্ড, লেখক- জগদীশ চন্দ্র মণ্ডল, পৃ. ১১৭, ১১৯-১২৮)

     ৩১ ডিসেম্বর, কলিকাতার বি. এণ্ড এ. ম্যানসন হলে বঙ্গীয় তফসিলী জাতি ফেডারেশনের বার্ষিক অধিবেশন হয়। বঙ্গীয় তফসিলী জাতি ফেডারেশনের সভাপতি যোগেন্দ্রনাথ উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করেন। ----

সভাপতির মূল অভিভাষণ

      ফেডারেশনের প্রতিনিধি হিসাবে আমি যোগেন্দ্রনাথ বাংলার মন্ত্রীপদ লাভ করিয়াছিলাম। ফেডারেশনের পক্ষ হইতে একমাত্র আমি নির্বাচনে জয়লাভ করিয়াছিলাম, কিন্তু মুসলিম লীগ বিবেচনার সহিত আমাদের ফেডারেশনকে বৃহত্তম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বলিয়া স্বীকার করেন এবং ফেডারেশন হইতে নির্বাচিত একজনকে তাঁহারা মন্ত্রীমণ্ডলীতে স্থান দেন। তাহার পরে আমাদের সঙ্গে পরামর্শ করিয়া নূতন যে কয়জন সভ্য ফেডারেশনে যোগদান করিয়াছেন, তাঁহাদের মধ্য হইতে দুইজনকে বাংলার মন্ত্রীমণ্ডলীতে স্থান দেওয়া হইয়াছে। তজ্জন্য আমি বাংলার প্রধানমন্ত্রী সুরাবর্দী সাহেবকে আমার পক্ষ হইতে ও বাংলার তফসিলীদের পক্ষ হইতে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতেছি। আমি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি, আমাদের নব নিযুক্ত মন্ত্রীদ্বয় যেন সুচারুরূপে ও সুস্থদেহে তাঁহাদের কর্তব্য পালন করিতে পারেন। তাঁহাদের জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করিবার ক্ষমতা ও দীর্ঘ জীবন লাভের জন্য আমি ভগবানের নিকট প্রার্থনা করি। আজ এখানে আলোচনার দ্বারা আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হইবে। আলোচনার মধ্য দিয়া ফেডারেশনকে কিরকম ভাবে গঠন করিতে হইবে, কেন আমরা কংগ্রেস সমর্থন করিব না বা তাহাদের দ্বারা পরিচালিত হইব না সেই সমস্ত কথাই আপনারা শুনিতে পাইবেন এবং এই জন্যই কতগুলি কঠিন প্রশ্ন আলোচনা করিতে হইবে।

      ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে নাগপুর শহরে আমাদের সর্ব ভারতীয় বরেণ্য নেতা ডঃ বি.আর. আম্বেদকরের নেতৃত্বে এবং আমাদের নিখিল ভারত তফসিলী জাতি ফেডারেশনের সভাপতি মিঃ শিবরাজের সভাপতিত্বে নিখিল ভারত তফসিলী জাতি ফেডারেশনের সভা হয়। এই সভার উদ্দেশ্য ছিল ভারতের তফসিলী জাতির রাজনীতিক অধিকার লাভ। তফসিলী জাতির স্বতন্ত্র রাজনীতিক সত্বা স্বীকার করিয়া লওয়া-যেমন আইনসভায় হিন্দু, শিখ, মুসলমান ও এ্যাংলো ইণ্ডিয়ানদের স্বতন্ত্র প্রতিনিধি পাঠাইবার ব্যবস্থা আছে, তদ্রুপ তফসিলী জাতির জন্যও স্বতন্ত্রভাবে সেই অধিকার থাকিবে। এই রাজনৈতিক স্বতন্ত্র অধিকার অর্জন করাই তফসিলী ফেডারেশনের প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য।

    আপনারা বলিতে পারেন, যেমন কংগ্রেস ভান করিয়া বলিয়া থাকে, তফসিলী ও বর্ণহিন্দু সমস্তই ভাই ভাই। তফসিলীদের জন্য স্বতন্ত্র অধিকার কেন? আমরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যাপারে বর্ণহিন্দু হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্ণহিন্দুরা শিক্ষায় সম্পদে আমাদের চাইতে অনেক উপরে আছে এবং আমাদের আবহমান কাল হইতে ক্রীতদাস ও অস্পৃশ্য করিয়া রাখিয়াছে বলিয়াই আমরা তাহাদের সহিত প্রতিযোগিতায় হারিয়া যাই। বর্ণহিন্দুরা হিন্দুদের জন্য যে সমস্ত স্বতন্ত্র সুবিধা আছে, তাহা নিজেরাই ভোগ করিতে চাহে। যাহারা চিরদিন উপেক্ষিত হইয়া আসিতেছে তাহাদের ইহারা আরও কিভাবে বঞ্চিত করিতে পারে তাহারই ষড়যন্ত্র সব সময় করিতেছে। ভোটার তালিকা প্রস্তুত করিবার সময় প্রেসিডেন্ট ইচ্ছা করিয়াই ভোটার হইবার উপযুক্ত তফসিলী জাতির লোকদের ভোটাধিকার হইতে বঞ্চিত করে।

      পূর্বেও হিন্দু হিসাবে আইন সভায় আমাদের প্রতিনিধি পাঠাইবার ব্যবস্থা ছিল। ফরিদপুরে বর্ণহিন্দুর চাইতে তফসিলীর সংখ্যা অনেক বেশী থাকা সত্বেও সেখানে এবং সাধারণ কেন্দ্র হইতে পূর্বে কোন তফসিলী নির্বাচিত হইতে পারে নাই। প্রথমবার আমি বরিশাল সাধারণ কেন্দ্র হইতে আইনসভায় নির্বাচিত হইয়াছিলাম। আমার বরিশালবাসী অনেক বন্ধু তফসিলীদিগকে ধন্যবাদ দিয়াছেন। তাহারা তাহা পাইবার উপযুক্ত। আমাদের নেতাডঃ আম্বেদকর ১৯৩২ সালে বিলাতের গোল টেবিল বৈঠকে তফসিলী জাতির জন্য স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অধিকার লাভের চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানে তিনি বর্ণহিন্দুর নিকট হইতে ভীষণ বাধা পাইলেন, বিশেষ করিয়া মিঃ গান্ধীর নিকট হইতে। অবশেষে আমাদের পৃথক নির্বাচন প্রথায় আসন দেওয়া স্থিরিকৃত হইল। তফসিলী জাতি পৃথক নির্বাচন প্রথা লাভ করিলে তাহারা খুব তাড়াতাড়ি রাজনৈতিক জ্ঞান লাভ করিবে ও তাড়াতাড়ি শিক্ষা, বাণিজ্য ও অন্যান্য বিষয়ে উন্নতি লাভ করিতে পারিবে। সর্বহারা তফসিলীদের এই সুবিধা কিছুতেই দেওয়া হইবে না। এই জন্য মিঃ গান্ধীর পুনায় অনশনের অভিনয়। মিঃ গান্ধী ঘোষণা করিলেন যে, তফসিলীদের পৃথক নির্বাচনের সুযোগ দিলে তিনি আমরণ উপবাস করিবেন। মিঃ গান্ধী যদি আমাদের পৃথক নির্বাচন প্রথা রোধ না করিতেন তাহা হইলে আমরা আরও উন্নতি লাভ করিতে পারিতাম। মিঃ গান্ধীর উপবাসের সময় ভারতের তথাকথিত নেতারা ডঃ আম্বেদকরের নিকট ধর্ণা দিলেন। মিঃ গান্ধী মারা যাইতে পারেনএই জন্যই ডঃ আম্বেদকর মিঃ গান্ধীর এই সব অন্যায় আবদার রক্ষা করিতে বাধ্য হইলেন। এইরূপ অন্যায় চাপ দিয়া একটা জাতির উন্নতির মূলে কুঠারাঘাত করা এবং তফসিলীদের নিধন করিবার জন্যেই মিঃ গান্ধী জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। আজ পৃথক নির্বাচন হিসাবে বাংলায় যদি দশটা আসনও থাকিত তাহা হইলে গণপরিষদে কমপক্ষে আমাদের তিনজন নিজস্ব প্রতিনিধি পাঠাইতে পারিতাম। মাদ্রাজ ও বোম্বাই হইতেও গণপরিষদে আমাদের সভ্য নির্বাচিত হইতে পারিত। বর্তমান গণপরিষদে ৩১ জন তফসিলী সদস্য আছেন। পুনা চুক্তি না হইলে অন্ততঃ পক্ষে ২৫ জন খাঁটি তফসিলী নেতাদের গণপরিষদে পাঠান যাইত। মুসলিম লীগের ৭৫ জন সদস্যের সহিত আমাদের ২৫ জন যোগদান করিতে পারিত। তাহা হইলে সেখানে গিয়াও আমাদের স্বার্থ আদায় করিতে পারিতাম। পুনা চুক্তির জন্য আজ আমরা মাত্র একজন সদস্য গণপরিষদে পাঠাইয়াছি। সুতরাং ভাবুন আমাদের নিধন করিবার জন্য মিঃ গান্ধী উপবাসের অভিনয় করিয়াছিলেন। ডঃ আম্বেদকর তফসিলী জাতির একমাত্র বরেণ্য নেতা হওয়া সত্বেও পুনা চুক্তির ফলে বাংলা ছাড়া অন্য কোথাও হইতে গণপরিষদে নির্বাচিত হইতে পারেন নাই। আপনারা দেখিয়াছেন, বাংলাদেশ হইতে ডঃ আম্বেদকর যাহাতে গণপরিষদে না নির্বাচিত হইতে পারেন তাহার জন্য কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা প্রভৃতি বর্ণহিন্দু প্রতিষ্ঠানগুলি কি চেষ্টা করিয়াছে। তাহারা আমাদের বিরুদ্ধে জঘন্য মিথ্যা ও অনেক অপপ্রচার করিয়াছে। আমাকে নানারূপ হৃদয় বিদারক কথা শুনিতে হইয়াছে। আমাকে হাজার হাজার টাকা দেওয়া হইয়াছে- এইরূপ অসত্য প্রচার করা হইয়াছে।

     আমি এত বিষ হজম করিয়াছি যে নখ হইতে মাথার চুল পর্যন্ত সমস্তই তাহাতে নীল হইয়া যাওয়া উচিত ছিল। তখন বলিয়াছিলাম, ডঃ আম্বেদকর যদি গণপরিষদে না যাইতে পারেন তাহা হইলে আমাদের সমাজনৈতিক, রাজনৈতিক সমস্ত অধিকারই বিলীন হইয়া যাইবে। সকলেই তখন অনুপ্রাণিত হইয়াছিলেন। শুধু আমাদের ছেলেরা নয়, আমাদের মা-বোনেরাও তখন যেভাবে প্রচারকার্য করিয়াছিলেন তাহা তফসিলীভুক্ত জাতির জাতীয় ইতিহাস যদি কখনও লেখা হয়, তাহা হইলে লিপিবদ্ধ হইবে। যেদিন গণপরিষদের ইলেকসন সেদিন তাহারা বঙ্গীয় আইনসভার ময়দানে সমবেত হইয়াছিলেন এবং মুহুর্মুহু জয়ধ্বনি করিয়াছিলেন। তাহারা অনেকে চাকরী করেন, কিন্তু কিছুই তাহারা ভূক্ষেপ করেন নাই। আমি সেদিন বুঝিয়াছি তফসিলীভুক্ত জাতি কিছুতেই মরিবে না। তাহারা মানুষের মতো বাঁচিবে, তাহাদের ভবিষ্যৎ উজুল। যেভাবে তাহারা সাড়া দিয়াছিলেন এবং ধ্বনি তুলিযাছিলেন তাহা স্বপ্নের অতীত।

      চারিদিক হইতে যে সমস্ত বাধা-বিঘ্ন আমাদের সামনে উপস্থিত হইয়াছে তাহা উপেক্ষা করিয়া আমরা সংগ্রামের পথে অগ্রসর হইতেছি। আমি জানি মৃত্যুকে আমরা ভয় করি না। পিরোজপুরের সভ্যরা এখানে আছেন, তাহারা আমার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিয়াছেন। নির্বাচনী ষড়যন্ত্র মামলায় আমার স্বজাতির কোনও লোক বর্ণহিন্দু কংগ্রেসের পরামর্শে আমার বিরুদ্ধে মোকদ্দমা করিয়াছিলেন। বর্ণহিন্দুরা মনে করিয়াছিলেন, আমাকে এই সময় শেষ করিতে পারিলে তাহাদের চলার পথ নিষ্কণ্টক হইবে। রামের জন্মের পূর্বে নাকি রামায়ণ রচনা হইয়াছিল। এখানে নির্বাচনের পূর্বেই আমার বিরুদ্ধে মামলার খসড়া তৈয়ারী হইয়াছিল। মন্ত্রীত্ব পদ লাভের জন্য মিঃ বারুরীকে যতখানি না অভিনন্দিত করি, তাহার চাইতে বেশী অভিনন্দিত করি তিনি ডঃ আম্বেদকরকে ভোট দিয়াছিলেন বলিয়া (হর্ষধ্বনি)। গয়ানাথ বাবুর নিকট হুইতে যে ভোট পাওয়া গিয়াছে, তাহার যতখানি মূল্য আমার ভোটের ততটা মূল্য নাই। আমি তাঁহাকে বাংলার পক্ষ হইতে অভিনন্দিত করিতেছি। আরো অন্যান্য যাহারা ডঃ আম্বেদকরকে প্রথম ও দ্বিতীয় ভোট দিয়াছিলেন তাঁহাদেরও আমি সমস্ত ফেডারেশনের পক্ষ হইতে আন্তরিক অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানাইতেছি। ফেডারেশন যাহা চাহে ও আমাদের নেতারা যাহা চাহেন, আমি তাহা জানি। আপনারা সকলেই সেই দাবির পিছনে আছেন। আমাদের দাবি আদায়ের জন্য কংগ্রেসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে হইবে। আমাদের দাবি আদায় করিয়া নিতে পারিলে বর্ণহিন্দুরা আর আমাদের শোষণ করিতে পারিবে না। এই জন্যই বর্ণহিন্দুরা বলিয়া বেড়ায় যে যোগেন্দ্র মণ্ডল ও আম্বেদকর সমস্ত তফসিলী- দিগকে মুসলমান হইতে বলিয়াছে। আমাদের ভাল দেখিলে যাহাদের চক্ষু জ্বালা করে, তাহাদের কথায় কর্ণপাত করিবেন না। উহারা আমাদের ধ্বংস করিবার জন্য, আমাদের বিভ্রান্ত করিবার জন্য আবহমান কাল হইতে ষড়যন্ত্র করিতেছে। আজও ষড়যন্ত্রের বিরাম হয় নাই। জাতির মধ্যে বিভীষণ সৃষ্টি করিয়া তাহাকে সম্মুখে রাখিয়া আমাদের ধ্বংস করিবার জন্য এক বিরাট ষড়যন্ত্ররূপ জাল পাতিয়াছে।

      যেদিন আমরা ডঃ আম্বেদকরকে বাংলা হইতে নির্বাচিত করিলাম, সেদিন হইতে আমরা মনে করিলাম যে, ভারতের তফসিলী জাতির আর ভয় নাই। যখন আমাদের নেতা নিজেই নির্বাচিত হইয়াছেন তখন আমাদের নেতা একাই একশ।

     আমার অন্তর্বর্তী সরকারে থাকার ফল হইয়াছে এই যে, আর বর্ণহিন্দুরা আমাদের উপর কোনও অবিচার ও অত্যাচার করিতে সাহস পাইবে না। আমার বক্তৃতা মিঃ জগজীবন রাম, মিঃ রাধানাথ দাস, মিঃ প্রমথ রঞ্জন ঠাকুর এবং মিঃ ধনঞ্জয় রায়ের মতো স্বয়ংসিদ্ধ নেতারা ও উপনেতারা বিকৃত করিয়া অনেক কিছুই বলিয়া থাকে। তাহাদের কাছে আমি এবং আমাদের নেতা মুসলমান বলিয়া পরিচিত; কিন্তু আমাদের নেতা কখনও বলেন নাই যে,তিনি মুসলমান হইয়া গিয়াছেন বা হইবেন। আমরা রাজনৈতিক অধিকারের জন্য লড়াই করিতেছি। তফসিলী জাতি শিক্ষায়-দীক্ষায়, অর্থে-সম্পদে অনেক কিছুতেই পশ্চাৎপদ-তাহারা শ্রমিক এবং কৃষক। আমরা চাই আমাদের প্রকৃত প্রতিনিধি আইনসভায় যাইবে। এদের উপকারের জন্য, উন্নতির জন্য, আইন পাশ করিবে। সেজন্য আমরা চাই স্বতন্ত্র নির্বাচন ও আমাদের প্রকৃত প্রতিনিধি প্রেরণ করিবার অধিকার।

      তাহারপর সভাপতি যোগেন্দ্রনাথ সিমলা সম্মেলনের উল্লেখ করিয়া বলেন: ১৯৪৫ সালের মে মাসে বড়লাট লর্ড ওয়াভেল যখন সিমলাতে সর্বদলীয় বৈঠক আহ্বান করেন, সেখানে ঠিক হইয়াছিল তফসিলী জাতির দুজন প্রতিনিধিকে বড়লাটের শাসন পরিষদে ২টি আসন দেওয়া হইবে। সেই সম্মেলনে ফেডারেশনের পক্ষ হইতে নিখিল ভারত তফসিলী ফেডারেশনের সভাপতি মিঃ এন্ শিবরাজকে ডাকা হয়।

      যে কারণেই হউক সেই প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত কার্যকরি হইল না। তাহার পরে কেবিনেট মিশন ভারতে আসেন। বৃটিশ পার্লামেন্ট মন্ত্রী মণ্ডলীর যে তিনজন মন্ত্রীকে ভারতের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করে তাঁহারা হইলেন ভারত সচিব লর্ড পেথিক লরেন্স, স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস্ ও মিঃ এ. ভি. আলেকজাণ্ডার। দিল্লীতে মন্ত্রী মিশনের বৈঠক বসে। সমস্ত দলের নেতাদের ডাকা হয়। ফেডারেশনের পক্ষ হইতেও আমাদের নেতাকে ডাকা হয়। সেখানে তিনি স্মারকলিপি দাখিল করেন। তফসিলী জাতির সমস্ত অভাব-অভিযোগ, প্রতিকারের উপায়, নির্বাচন পদ্ধতি প্রভৃতি সমস্ত বিষয় স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়।

      সংখ্যানুপাতে আমাদের প্রতিনিধি শুধু আইন সভায় থাকিবে না, কার্যনির্বাহক বিভাগেও থাকিবে। চাকরীতেও দিতে হইবে সেই সুযোগ। প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীমণ্ডলীতেও আমাদের প্রতিনিধি থাকিবে এবং তাহারা নির্বাচিত হইবে শুধু তফসিলীদের ভোটের দ্বারাই অর্থাৎ তফসিলী জাতির জন্য থাকিবে পৃথক নির্বাচন। যেমন মুসলমানদের ভোটে মুসলমানই নির্বাচিত হইয়া থাকেন তেমনি আমরাও চাহিয়াছিলাম। প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় গভর্ণমেন্টের বাজেটে প্রচুর টাকা থাকিবে তফসিলীদের শিক্ষার জন্য। আর একটা ট্রাস্ট থাকিবে, সেখানে ভারত গভর্ণমেন্টকে বাৎসরিক ছয় কোটি টাকা তফসিলীদের দিতে হইবে। তাহাদের যে সব লোকের বাড়িঘর নাই, জমি নাই, তাদের জমি বাড়িঘর ঐ টাকায় তৈয়ারী করিয়া দিতে হইবে। গভর্ণমেন্টের বহু জায়গায় জমি খাস পড়িয়া রহিয়াছে। সেই জমি তফসিলীদের দিতে হইবে। এই দাবির বিরুদ্ধে অনেক কংগ্রেসী নেতা অপপ্রচার করিয়াছেন যে, তাহারা তফসিলীস্থান চায়। কিন্তু আসলে তাহা নহে। আর একটা দাবি জানাইয়াছিলেন যে, তফসিলী জাতির এই সুযোগ সুবিধাগুলি এদেশের কোনও প্রতিষ্ঠানের হাতে ছাড়িয়া দিতে পারিবে না। আমরা কাহারও অনুগ্রহে বাস করিতে চাই না। জগজীবন রাম, রাধানাথ দাস, ধনঞ্জয় রায় ও পি. আর. ঠাকুর সেখানে গিয়া বলেন যে, ডঃ আম্বেদকর তফসিলী জাতির নেতা নয়। ডঃ আম্বেদকর যাহা বলিয়াছেন তাহা তাঁহাদের কথা নয়। তাঁহারা কংগ্রেসে বিশ্বাসী, কংগ্রেস যাহা করে তাহাই হইবে। এ বিষয়ে আপনাদের জানাইয়া রাখি ডঃ আম্বেদকর বিলাতে গিয়া আমাদের স্বার্থের জন্য তদ্বির করিয়া যে সব কাজ করিয়া আসিয়াছেন তাহার বিরুদ্ধে একটা পাল্টা ডেলিগেশন তাঁহারা বর্ণহিন্দুদের প্ররোচনায় পাঠাইবার চেষ্টা করিয়াছিলেন।

      আমাদের বিরুদ্ধবাদীরা বলিয়া থাকেন যে, আমাদের বিচারের দিন আসিয়াছে। আমি বলি একথা যাহারা বলে তাহারাই যেন সাবধান হয়। তাহাদের বিচারের দিনই সন্নিকট।

      গত ১৯৪২ সাল হইতে আমাদের ফেডারেশন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে তফসিলী জাতির সেবা করিয়া আসিতেছে। আমাদের সর্বময় নেতা হইলেন ডঃ আম্বেদকর। মন্ত্রীমিশন আমাদের অস্তিত্ব স্বীকার করিল না। তাহারা মুসলমান, সাধারণ - এমনকি ৩০ লক্ষ শিখের জন্যও পৃথক নির্বাচন প্রথা সমর্থন করিলেন। কংগ্রেসও ইহাদের প্রস্তাব মানিয়া লয়। শিখেরা সর্ব বিষয়ে উন্নত। তাহাদের পৃথক নির্বাচনে কংগ্রেসের কোন আপত্তি নাই। আমরা সাধারণের মধ্যে পড়িয়া গেলাম। গণপরিষদের সভ্যবৃন্দ একটা কমিটি গঠন করিবেন। তাঁহারা সেই কমিটির নির্দেশ অনুযায়ী সংখ্যালঘুদের জন্য স্বাধীন গঠনতন্ত্রে কোথায় কিভাবে তাহাদের স্বার্থ রক্ষা হইবে তাহা ঠিক করিবেন। পরিষ্কার করিয়া বলা হইল না যে, সেই সংখ্যালঘুদের মধ্যে তফসিলী জাতি পড়ে কিনা? আমাদের নেতা চিঠি লিখিয়া তাহা মিশনকে জানাইলেন। মিঃ আলেকজাণ্ডার উত্তরে লিখিলেন "হ্যাঁ” তফসিলী জাতি সংখ্যালঘুর মধ্যে পড়িবে। কিন্তু যখন সব ঠিক হইয়া গেল এমন সময় মিঃ গান্ধী পর্দার অন্তরাল হইতে মিঃ আবুল কালাম আজাদকে দিয়া চিঠি লিখিয়া মিশনকে বলিলেন যে, তফসিলীরা হিন্দু সমাজের একটা অংশ; এরা সংখ্যালঘুদের মধ্যে পড়ে না। বর্ণহিন্দু ও কংগ্রেস ঐ কথা বলে কেন? কারণ তফসিলী জাতি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বলিয়া গণ্য হইলে তাহাদের রাজনৈতিক স্বতন্ত্র অধিকার দিতে হয়। কোনও প্রকারে যদি তফসিলীদের মাইনরিটীর মধ্যে না ফেলিয়া সাধারণ হিন্দুর মধ্যে ফেলিতে পারে তাহা হইলে আপনাদের কোনও স্বতন্ত্র চিহ্ন বা অস্বিত্ব থাকিবে না। তাহা হইলে আপনাদের ঐ আট কোটি লোকের সমস্ত অংশটা তাহারা বেশ আরামে ভোগ করিতে পারিবে। সাধারণ শ্রেণীর মধ্যে সাধারণত পড়ে ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ও বৈদ্য। আর কেউ নয়। ঐ যে কামার, কুমোর, সাহা,কপালী যাহারা বর্ণহিন্দু বলিয়া পরিচিত, তাহারা কি কিছু পায়? ওরাই সব ভোগ করিয়া থাকে। কেবল নামেই বর্ণহিন্দু, ভাগের বেলায় নয়।

     আমরা অন্যের দয়ার উপর নির্ভর করিয়া বাঁচিয়া থাকিতে চাই না। আমি বুঝি কোনও জাতির যদি রাজনৈতিক অধিকার না থাকে তাহা হইলে সে পৃথিবীতে মানুষের মতো বাঁচিয়া থাকিতে পারে না। অর্থই মানুষকে পৃথিবীতে সম্মান দিতে পারে না বা বড়ও করিতে পারে না। সুতরাং চাই রাজনৈতিক অধিকার, চাই রাজশক্তি পরিচালনার অধিকার। যাহারাই রাজশক্তির অধিকার পাইয়াছেন তাঁহারাই বড় হইয়াছেন। রাজশক্তি পরিচালনার অধিকার না পাইয়া ইহুদীরা ধনী হইয়াও চিরদিন অন্যের লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করিতেছে। এমন কি সমগ্র পৃথিবীতে তাহাদের বাস করিবার স্থানটুকুও নাই।

      যখন দেখা গেল আমাদের এখানে রাজনৈতিক অধিকার রহিল না, তখন ডঃ আম্বেদকর মনে করিলেন বিলাতে যাহারা তফসিলী জাতির প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন নেতা আছেন তাহাদের যদি আমাদের অবস্থাটা ভাল করিয়া বুঝাইয়া দেওয়া যায় তাহা হইলে আমরা একেবারে ভাসিয়া যাইব না। আমাদের নেতা সেখানে গিয়া দেখা করিলেন প্রধানমন্ত্রী মিঃ এটলীর সঙ্গে, বিরোধী দলের নেতা মিঃ চার্চিলের সঙ্গে। তাঁহাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়া তিনি তাহাদের বুঝাইয়া দিয়াছেন যে, নির্বাচনে জয়লাভ করিতে না পারিলেও প্রাথমিক নির্বাচনে তফসিলী জাতি ফেডারেশনের মনোনীত প্রার্থীগণই সকল প্রদেশে সবচাইতে বেশী ভোট পাইয়াছিল। সমস্ত ভারতবর্ষে যত ভোট দেওয়া হইয়াছে কংগ্রেস মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে হিসাব করিয়া দেখা গিয়াছে যে তাহার মধ্যে শতকরা ২৮টি ভোট তফসিলী জাতি ভোটারের আর শতকরা ৭২টি পাওয়া গেল যাহারা কংগ্রেস বিরোধী। সুতরাং তোমরা কি করিয়া বল যে তফসিলী জাতি কংগ্রেসভুক্ত হইয়াছে?

      আমরা দাবি করি, তফসিলী জাতি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং তাহাদের স্বার্থ স্বীকার করিয়া লইতে হইবে। তাহারা আমাদের যত কথাই বলুক, মিষ্টি কথা বলিয়া আর সর্বনাশ করিতে পারিবে না। আমাদের নেতা বলেন, "তাহারা আমাদের আর দয়া দেখিয়ে নিহত করতে পারবে না?"

      ক্যাবিনেট মিশনের বিবৃতি অনুযায়ী কোন্ কোন্ প্রদেশ কোন্ কোন্ মণ্ডলীভুক্ত হইয়াছে বক্তা সেটা বুঝাইয়া দেন। তিনি বলেন: যে পাকিস্তান বৃটিশ ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী আছে, সেটা সম্পূর্ণ পাকিস্তান নয়। দেশ রক্ষা, যানবাহন ও বিদেশের সঙ্গে সম্পর্ক - এই তিনটি বিভাগ কেন্দ্রে থাকিবে! আর বাকী বিভাগের শাসনভার প্রত্যেক প্রদেশে সীমাবদ্ধ থাকিবে। তবে আমার মনে হয় Central Currency কেন্দ্রে থাকতে পারে। আর মুসলিম লীগের দাবি যে পাকিস্তান তাহা হইল পূর্ণ পাকিস্তান।

      আপনাকে যদি আপনার প্রকৃত প্রতিনিধি পাঠাইবার সুযোগ না দেওয়া হয় তাহা হইলে আপনার সুবিধা হইবে না। এখানেই হইল ডঃ আম্বেদকরের ও আমাদের সঙ্গে কংগ্রেসের বিরোধ। স্বতন্ত্র নির্বাচন হইলে, আমরা ওদের উপর নির্ভর না করিয়া নিজেদের পায়ে দাঁড়াইতে পারিব। ওদের ষড়যন্ত্র ধরা পড়িয়া গিয়াছে বলিয়াই ওরা কিছুতেই আমাদের তাহা না দিতে বদ্ধপরিকর। এই জন্য তাহারা প্রতিদিন খবর কাগজের মাধ্যমে আমাদের বিরুদ্ধে প্রচার করে। ধর্ম পরিবর্তনের কথা যদি বলা হয় তাহা হইলে মানুষ সত্যই আতঙ্কগ্রস্ত হয়।

     আমরা কেন মুসলিম লীগের সঙ্গে হাতে হাত মিলাই - তাহা বলিতেছি। কারণ, তাহারা আমাদের পৃথক নির্বাচন দিবে বলিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়াছে। যদি আমরা মুসলমানই হইলাম তাহা হইলে আমরা যে স্বতন্ত্র নির্বাচনের জন্য লড়াই করি তাহার অর্থটা কিদাঁড়ায় (cheers)? আমাদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করিবার জন্যই তো এই লড়াই করিতেছি। মুসলমান যদি হইব তবে স্বতন্ত্র নির্বাচন চাই কেন? সুতরাং বর্ণহিন্দুরা খবরের কাগজের মারফৎ জোর অপপ্রচার চালাইয়া আমাদের বিভ্রান্ত করিতে চেষ্টা করিতেছে। সমুদ্র মন্থন এখনও শেষ হয় নাই। বিষ এখনও তাহারা উদগীরণ করিতেছে। যাহারা বলে পাকিস্তান হইলে সকল হিন্দুকে মুসলমান হইতে হইবে, তাহাদের আপনারা বলিবেন - দিল্লীর সিংহাসন মুসুলমানদের অধীনে ছয়শত বৎসরের বেশি ছিল। দিল্লীর পার্শ্বেই যুক্ত প্রদেশ, কিন্তু সেই যুক্ত প্রদেশের মুসলমান সংখ্যা মোট জনসংখ্যার শতকরা ১৪ জন কেন? সেখানে সমস্ত হিন্দুদের মুসলমান করা হয় নাই কেন? হায়দ্রাবাদ মুসলমান রাজ্য; সেখানে শতকরা ৮০ জন প্রজা হিন্দু কেন? তাহাদের আজও কেন মুসলমান করা হয় নাই? সেটাতো করদ রাজ্য। আজ কেহ কাহারও উপর অত্যাচার করিতে পারে না। প্রত্যেকেরই স্বাধীন ধর্মমত পালন করিবার স্বাধীনতা আছে ও থাকিবে।

     বাংলায় অনেক জমিদার ছিলেন। তাহাদের অত্যাচারে এখানের হিন্দুরা অনেকেই মুসলমান হইতে বাধ্য হইয়াছে। আজ আপনারা কোনও ভাওতায় আর ভুলিবেন না। এই পরিবর্তনের যুগে, এই স্বাধীন ভারতের স্বাধীন শাসনতন্ত্রে তাহা হইলে আপনাদের স্থান আর কোথাও মিলিবে না, যদি আপনাদের ন্যায্য অধিকার না থাকে।

      ঢাকার কংগ্রেসী এম, এল, , মিঃ ধনঞ্জয় রায়ের আত্মঘাতী ও সর্বনাশা বিবৃতির উল্লেখ করিয়া সভাপতি যোগেন্দ্রনাথ বলেন: ঢাকার ধনঞ্জয় রায় কংগ্রেসের টিকিটে বর্তমানে গণপরিষদের সভ্য। তিনি ও অধ্যাপক সমর গুহ এই দু'জনে একটা বই বাহির করয়িাছেন। সেই বইতে তাহারা লিখিয়াছেন, ১৯৪১ সালের আদমসুমারী (লোক গণনা) অনুসারে হিসাব করিলে দেখা যায়,ভারতের তফসিলীদের সংখ্যা মোটামুটি সাড়ে তিন কোটি। সেই হিসাবে অন্তর্বর্তী সরকারে তফসিলীদের একজন সভ্যই প্রাপ্য। দেখুন কত বড় হীন অপপ্রচার, সর্বনাশা আত্মঘাতী নীতি। বর্ণহিন্দুদের পাল্লায় পড়িয়া ভদ্রলোক তফসিলী জাতিকে ধ্বংস করিতে একটুও কুষ্ঠাবোধ করেন নাই। এই সমস্ত বিভীষণ আমাদের জাতিকে ধ্বংস করিবার জন্য দিবারাত্র শত্রুর সঙ্গে যুক্তি করিতেছে।

     অতঃপর তিনি নোয়াখালী ও ত্রিপুরার হাঙ্গামায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। সংবাদপত্রের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাইয়া সকলকে সতর্ক করিয়া বলেন, আমাদের উপর যেই অত্যাচার করুক সে হিন্দু হউক,কি মুসলমান হউক আমরা লড়াই করিব আট কোটি তফসিলীর রাজনৈতিক স্বার্থ আদায়ের জন্য। এই স্বার্থের বিরুদ্ধে যিনি দাঁড়াইবেন, তিনি মুসলমান হন, ইংরেজ হন, আর হিন্দুই হন- সে আমাদের শত্রু। তিনি যদি আমার স্বজাতীয় হন, তিনিও আমার শত্রু। যিনি আমাদের রাজনৈতিক স্বার্থে সহযোগিতা করিবেন, তিনি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হইলেও তিনি আমাদের বন্ধু (cheers)তফসিলীদের স্বার্থের জন্য আজ যদি মুসলিম লীগ আমাকে নিয়া থাকে তবে তোমাদে গাত্রজ্বালা হয় কেন? তাতে তোমাদের ঘরে ঘরে মরণ-যন্ত্রণা শুরু হইয়াছে কেন (cheers)? এক কথাটা আমাকে বুঝাইয়া দাওকিভাবে আমি মুসলমান হইয়া গেছি?

     আজ আমি অন্তর্বর্তী সরকারে গিয়াছি। সেখানে মুসলিম লীগ আমাদের জাতির স্বার্থের বিরুদ্ধে যদি কোন কার্য করেন তাহা হইলে আমি সেই মুহূর্তে সেখান হইতে চলিয়া আসিব (cheers)আমি আবেদন করিতেছি এই সন্ধিক্ষণে আপনারা যেন এই জাতটাকে একেবারে ডুবাইয়া না দেন। এখন যদি ভুল পথে চলেন, তাহা হইলে আমাদের জাতির চরম সর্বনাশ হইবে। যদি আজ প্রত্যেক তফসিলী নর-নারী ফেডারেশনের পতাকাতলে আসেন ও ডঃ আম্বেদকরের আদর্শ গ্রহণ করেন, তাহা হইলে পৃথিবীতে এমন কোনও শক্তি নাই যা আমাদের দাবি দাওয়া বিনষ্ট করিতে পারে (cheers)

     আপনাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাইবার সঙ্গে সঙ্গে এই কথা বলিতে চাই যে, ফেডারেশনের নামে যেভাবে আপনারা সকল জায়গায় সাড়া দিয়াচেন তাহাতে আমাদের অনেক আশা জাগে। আপনারা প্রত্যেক জায়গায় ফেডারেশন গঠন করুন। আপনাদের একমাত্র সাপ্তাহিক পত্রিকা জাগরণ; এই জাগরণ পত্রিকার যদি সকলে গ্রাহক হন, তাহা হইলে শুভ ফল হইবে। আমরা কি বলতে চাই, কি পথ ও মত আমাদের নেতা নির্দেশ দেন তাহা আপনারা জানিতে পারবেন। এই পত্রিকাখানা যদি আমাদের গৃহে গৃহে স্থান লাভ করে, তাহা হইলে অতি সত্বর এই সাপ্তাহিক জাগরণকে দৈনিক জাগরণে পরিবর্তিত করিতে পারিব। (তথ্য- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ, ২য় খণ্ড, লেখক- জগদীশ চন্দ্র মণ্ডল, পৃ. ১১৭, ১১৯-১২৮)

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Read More