বাংলায় সাম্যবাদী ব্যবস্থা
প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের অবদান।
লেখক-
জগদীশচন্দ্র রায়
ভূমিকাঃ- বাংলার সাম্যবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার
ক্ষেত্রে মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল হচ্ছেন, মধ্য মণি। কারণ, বাংলায় বৌদ্ধ
শাসক, পাল রাজাদের শাসন চলেছিল প্রায় সাড়ে চারশো (৭৫০-১১৬২) বছর ধরে। সেই
শাসন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে শুরু হয় ব্রাহ্মণ্য শাসন ব্যবস্থা। যার প্রমুখ হচ্ছে
বল্লাল সেন। তার শাসনকালে বাংলার বৌদ্ধদের উপর নেমে আসে কঠোর অত্যাচার। সেই
অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে পালিয়ে জঙ্গলে এসে বসবাস করতে বাধ্য হয় এক সময়ের
প্রতাপশালী বৌদ্ধগণ। তাঁরা ধর্মহীনে পরিণত হন। তারপর হরিচাঁদ ঠাকুরের মতুয়া
ধর্ম আন্দোলন এবং গুরুচাঁদ ঠাকুরের শিক্ষা
ও সামাজিক আন্দোলনে পতিতরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার স্থান দখল করে। সেই স্থান বা ফাউন্ডেশনের
উপর যে রাজনৈতিক বৃক্ষের বিজ রোপন করা হয়েছিল সেটাকে পূর্ণাঙ্গ আন্দোলনের বৃক্ষ
হিসাবে দাঁড় করেন মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের নেতৃত্বে বাংলার মূলনিবাসীরা। সেই বৃক্ষকে আরো বিস্তারিত
করার জন্য মহাপ্রাণের অক্লান্ত ও নিঃস্বার্থ বলিদানে সমর্থ হলেন বাবাসাহেব
আম্বেদকরকে সংবিধান সভায় পাঠাতে। বাবাসাহেব সংবিধানের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্বের (Representation) সুযোগ করে দিলেন
সমগ্র ভারতের পিছিয়ে রাখা মানুষদের। সে
জন্যই এই হরিচাঁদ ঠাকুরের আন্দোলন থেকে বাবা সাহেবের সংবিধানে প্রতিনিধিত্বের (Representation) ব্যবস্থা পর্যন্ত যে আন্দোলন, সেই আন্দোলনের মধ্য মণি হচ্ছেন মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ।
এই আন্দোলনের ধারায়
কারোর অবদানই কম নয়। এক জনকে বাদ দিয়ে অন্য জনকে তুলে
ধরা সম্ভবও নয়। যদিও এই আন্দোলনরূপী গাছের ফুল ফল যারা উপভোগ করছেন
তাদের একটা বিরাট অংশ চাইছেন গাছটাকেই স্বমূলে ধ্বংস করতে। তারা নতুন বল্লাল সেনের
সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই গাছকে উপড়ে ফেলতে চাইছেন; যেটা পাল শাসনকালের শেষদিকে ঘটেছিল।
এখন আপনাদেরই ভাবতে হবে কী করবেন? বল্লাল সেন যেমন বাংলার
মূলনিবাসীদের বিতাড়িত করে পতিত করেছিল। বর্তমানে সংরক্ষণকে সমাপ্ত করা হচ্ছে, আর
সঙ্গে নেমে আসছে NRC-National
Register of Citizens এর
কোপ। এই হচ্ছে এই
আন্দোলন রূপী গাছের বিষয়। এবার বিস্তারিত
ভাবে প্রবেশ করা যাক সেই আন্দোলন সম্পর্কে।
“ব্রাহ্মণের পদধূলি গ্রহণ এবং মন্দিরে প্রবেশের দ্বারা
আপনাদের কোনও উপকার ও দুঃখ-কষ্ট লাঘব হইবে না। কে আপনাদের দুঃখ-কষ্টের অবসান করিবে
এবং অন্যান্যদের সঙ্গে সমান অধিকার প্রদান করিবে, তাহাই চিন্তা করিতে হইবে।” (তথ্য- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল, ২য়
খন্ড। লেখকঃ- জগদীশ চন্দ্র মন্ডল, পৃষ্ঠা ১৩৬)।
তিনি আরো
বলেছেন, “আত্মীয় ও বন্ধু যতই প্রিয় হউক জাতির
বৃহত্তর স্বার্থ তদপেক্ষা প্রিয়তর-এ কথা সর্বদা স্মরণে রাখিবেন। জাতীয় স্বার্থকে
বলি দিয়া আত্মীয়তা বা বন্ধুত্বের খাতিরে যদি কেউ ভুল পথে চালিত হন তবে তিনি জাতির
ঘোরতর শত্রুতা করিবেন।” (তথ্য- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল ২য় খন্ড। লেখকঃ- জগদীশ চন্দ্র মন্ডল। পৃষ্ঠা নং- ১৫৪ )
রাজনীতি সম্পর্কে তিনি বলেছেন-
আমরা অন্যের দয়ার উপর নির্ভর করে বাঁচিয়া থাকতে
চাই না। আমি বুঝি কোন জাতির যদি রাজনৈতিক অধিকার না থাকে- তা হ’লে সে পৃথিবীতে মানুষের মতো বাঁচিয়া থাকতে পারে না। অর্থই মানুষকে পৃথিবীতে সম্মান দিতে পারে না
বা বড়ও করতে পারে না। তাই চাই রাজনৈতিক অধিকার, চাই রাজশক্তি পরিচালনার অধিকার। যাঁরা এই রাজশক্তির অধিকার পেয়েছেন, তাঁরাই বড় হয়েছেন। রাজশক্তি পরিচালনার অধিকার
না পেয়ে ইহুদিরা ধনী হইয়াও চিরদিন অন্যের গঞ্জনা সহ্য করিতেছে। এমন কি সমস্ত পৃথিবীতে
তাহাদের বাস করিবার স্থানটুকুও নাই।(তথ্য-মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ ও বাবাসাহেব আম্বেদকর, লেখক - জগদীশ চন্দ্র
মণ্ডল; পৃষ্ঠা ১০৫-১০৬/জাগরণ, ১৮ জানুয়ারী, ১৯৪৭)
আর এই মহামানবকে
নিয়ে থিসিস করেছেন নাগপুরের ডঃ সঞ্জয় গাজভিয়ে। তাঁর সেই গ্রন্থের নাম দিয়েছেন- “সাংবিধানিক
ভারতের নির্মাতা বাবাসাহেব ডঃ আম্বেদকর ও মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল।”
আবার নাগপুর ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডঃ
প্রদীপ আগলাবে বলেছেন-
বাবাসাহেব ডঃ
আম্বেদকর সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক, শিক্ষামূলক ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার জন্য ঐতিহাসিক ও ক্রান্তিকারী কাজ করেছিলেন। এই মহান ক্রান্তিকারী কাজে ডঃ আম্বেদকরকে যারা সমর্থন করেছিলেন, তাদের মধ্যে মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের অবদান অত্যন্ত মহত্ত্বপূর্ণ। যদি বাবাসাহেব ডঃ আম্বেদকর মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ
মণ্ডলের সহযোগিতা না পেতেন, তাহলে তিনি এই দেশের সংবিধান রচনা করতে পারতেন না। এটি একটি ঐতিহাসিক সত্য। (তথ্য- সংবৈধানিক ভারত নির্মাতা বাবাসাহেব
ডঃ আম্বেদকর আউর মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, লেখক- ডঃ সঞ্জয় গজভিয়ে। পৃষ্ঠা-
8,9)
মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের জীবনের
বিভিন্ন সংগ্রামী কাজের মধ্যে আমি সর্বাধিক
গুরুত্ব দেই দুটো কাজকে; যে কাজ দুটো বিশেষ করে দেশের পিছিয়ে রাখা সকল মানুষের
উদ্ধারের জন্য তিনি করেছেন সেই কাজ হচ্ছে-
(১) (তাঁর নেতৃত্বে) ডা. বাবাসাহেব আম্বদেকরকে সংবিধান সভায় পাঠানো।
(২) ১৯৬৫ সালের লকুর কমিটির রিপোর্টকে কার্যকরী হতে না দিয়ে সমগ্র নমঃশূদ্র, দাস,
রাজবংশী ও সুড়ি বা সাহাদের তফশিলিদের মধ্যে রাখা।
কিন্তু তাঁর এই অসামান্য অবদানের গুরুত্বকে তাঁর নিজের
লোকরা উপলব্ধি করতে না পারলেও ব্রাহ্মণ্যবাদীরা সেটাকে হাড়ে হাড়ে বুঝতে পেরেছে। যার জন্য
বাবাসাহেবকে যে যশোর, খুলনা বরিশাল ও ফরিদপুর জেলা থেকে প্রতিনিধিরা
নির্বাচিত করেছিলেন সেই অংশকে ভারতের বাইরে রাখার জন্য শুরু হলো চক্রান্ত।
হিন্দু মহাসভার সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ঘোষণা করলেন ‘দেশভাগ হোক না হোক বাংলাকে অবশ্যই ভাগ করতে হবে।” কারণ?
প্রথম কারণঃ- বাংলা প্রান্তে মুসলিম এবং পিছিয়ে রাখা শ্রেনির(বিশেষ করে নমঃশুদ্র) লোকদের
সংখ্যা সর্বাধিক ছিল। সেখানে মুসলিম লীগের সরকার ছিল। যদি বাংলার বিভাজন না
হয় তাহলে মুসলিম আর পিছিয়ে রাখা শ্রেনির শাসন ব্যবস্থা
চিরস্থায়ী হবে। সেখানে উচ্চবর্ণীয়দের কোন অধিকার থাকবে না।
দ্বিতীয় কারণঃ- বাংলার খুলনা, যশোর, ফরিদপুর, বরিশাল এই এলাকা
থেকে বাবাসাহেবকে নির্বাচিত করে সংবিধান সভায় পাঠানো হয়। তাই বাংলা বিভাজন করে
বাবাসাহেব যে ক্ষেত্র থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন সেখান থেকে বাবাসাহেবের সদস্য পদ
খারিজ করার উদ্দেশ্যে বাংলা ভাগ করে ছিল।
তৃতীয় কারণঃ- যে
নমঃ(শুদ্র) ও তপশিলিরা
বাবাসাহেবকে সংবিধান সভায় নির্বাচিত করে পাঠিয়েছেলেন তাদেরকে সাজা দেওয়ার জন্য
যাতে তারা আজীবন মুসলমানদের আধীন থাকে, এই শিক্ষা দেওয়ার
জন্য বাংলা ভাগ করেছিল।
আর একটা কারণ, সেটা আপনারা মানুন আর নাইবা মানুন; সেটা
হচ্ছে-
মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল হচ্ছেন বাংলার আম্বেদকর। তাঁর ক্ষমতা কত সুদূর
প্রসারী ও শক্তিশালী, সেটা তাঁর থেকে উপকার প্রাপ্তরা কতটা বুঝেছেন বলা মুশকিল।
তবে উচ্চবর্ণীয়রা সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পেরে ছিলেন বাখার গঞ্জ কেন্দ্রের জয় থেকে
শুরু করে বাবাসাহেবকে সংবিধান সভায় পাঠানো পর্যন্ত। যার জন্য তারা সর্বদা মহাপ্রাণের লাগামকে নিজেদের কন্ট্রোলের বাইরে না
যেতে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আর তারজন্য সব সময়
যোগেন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে নিজের জাতির লোক দিয়ে যেমন বিরোধীতা
করিয়েছে, তেমনি তারা বুঝতে পেরেছিল, বাংলাভাগ না হলে কোন
দিনই উচ্চবর্নীয়দের কব্জায় বাংলার শাসন ক্ষমতা আসবে না। তাই গোদের উপর বিষ
ফোড়াটাকে স্বমূলে নির্মুল করার জন্য বাংলাভাগ করা তাদের কাছে অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে।
এখানে আর একটা কথা বলে রাখি ঐ সময়ে নেতাজীর অন্তর্ধান হওয়ায়
উচ্চবর্ণীয়দের বাংলাভাগ করার কাজটি সুগম হয়।
এই দিকে গান্ধীজি আর এক
চক্রান্ত করে জানালেন, “দেশ বিভাগ
যদি হয়, তবে আমার মৃতদেহের উপর দিয়েই তা হবে। আমি যতক্ষণ বেঁচে আছি, ততক্ষণ
কিছুতেই দেশ বিভাগে সম্মতি দেব না” সেই গান্ধীর উপস্থিতিতে ১৯৪২ সালে ১৫ই জুন, কংগ্রেসের অধিবেশনে দেশভাগের
প্রস্তাব গৃহীত হল। কংগ্রেস অধিবেশনে এ প্রস্তাব সমর্থন করলেন স্বয়ং গান্ধী।
(তথ্যঃ- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ ৩য় খণ্ড, লেখক- জগদীশ চন্দ্র মণ্ডল পৃ.১২/১৩)
মহাপ্রাণ শত চেষ্টা করেও
বাংলা ভাগকের বন্ধ করতে পারলেন না। যদিও তিনি ও তাঁর সহযোগীরা চেয়ে ছিলেন
অখণ্ডিত বাংলা। কিন্তু বাবাসাহেবকে বাংলা থেকে সংবিধান সভার জন্য
নির্বাচিত করার ফলে দেশ ভাগের জন্য বাবাসাহেবের সদস্য পদ রদ হলেও কংগ্রেস বাধ্য হয়
বাবাসাহেবকে পুনরায় নির্বাচিত করতে। আর বাবাসাহেব সংবিধানে
সমস্ত পিছিয়ে রাখা শ্রেণির মানুষদের জন্য সংরক্ষণের মাধ্যমে
দিলেন সাংবিধানিক রক্ষাকবচ। এই কারণে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের
গাত্রদাহ শতগুণ বৃদ্ধি পেল। তাই শুরু হল অত্যাচার। যে মানুষদের সংগ্রামের ফলে একটা
জাতি জেগে উঠেছিল, তাদের স্বমূলে বিনাশ করার জন্য দেশভাগের ‘বলিস্বরূপ’ তাদের পাঠানো হলো ওড়িশার কোরাপুট
জেলার মালকানগিরি ও উমরকোট এবং ছত্রিশগড়ের পাখানজোড় মিলিয়ে দণ্ডকারণ্য
প্রকল্পের মাধ্যমে পুনর্বাসন হয়। মহারাষ্ট্রের গড়চিলোরী, আন্দামান, নৈতিতাল ইত্যাদি
গহন জঙ্গলে। যার ফলে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ গেল অনাহারে। পশুর মতো জীবন যাপন
করতে বাধ্যে হলো তারা। তবে এই জাতির একটাই গুণ এরা সহজে ধ্বংস হয়না। তাই ধীরে ধীরে
গড়ে তুলল আবার বাসোপযোগী ব্যবস্থা। তারা ভুলে যায়নি গুরুচাঁদ ঠাকুরের শিক্ষা
আন্দোলনকে। তাই তারা সন্তানদের শিক্ষিত করে তুলল। আর বাবাসাহেরের দেওয়া সাংবিধানিক
রক্ষাকবচ সংরক্ষণের জন্য সুযোগ পেল শিক্ষাগ্রহণ ও সরকারী চাকরিতে। অতি কষ্টে হলেও
ধীরে ধীরে তারা ফিরে পেতে চলেছিল পুরানো অধিকারকে।
উপসংহারঃ- কিন্তু
হরি-গুরুচাঁদ, মহাপ্রাণ ও বাবা সাহেবের আন্দোলন প্রসুত অধিকারকে হরণ করার জন্য
শুরু হয়, সংরক্ষণ সমাপ্তিকরণ। নাগরিকত্বের
সমস্যা।এর থেকে মর্মান্তিক পরিস্থিত আর কী হতে পারে?
এইভাবে বাংলার সমতাবাদী আন্দোলনকে পুনরায় ধ্বংস
করে দেবার চেষ্টা শুরু হয়েছ। হায়নারা সর্বদা লালা ঝরাচ্ছে তাদের দাঁত বসানোর জন্য। শুধুবাংলা নয়, ভারতের সমস্ত মূলনিবাসীদের পুনরায় গোলাম
বানানোর গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। কিন্তু গোলামী থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আমাদের সংগঠিত হয়ে কঠোর সংগ্রাম চালাতে হবে। যদিও হায়না ও কুনকী
হাতিতে ভরেগেছে সর্বত্র। তাই একই মন্ত্র নিতে হবে সমাজ জাতি ও দেশের কল্যাণের জন্য
DO OR DIE করো অথবা মরো।
-------

























