Sunday, 16 August 2026

// // Leave a Comment

মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের অবদানকে অস্বীকার করে তাঁকে বদনাম করার কারণ কী? তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারিত অপপ্রচারের জবাবেই এই প্রতিবেদন। লেখক — জগদীশচন্দ্র রায়

 


মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের অবদানকে অস্বীকার করে তাঁকে বদনাম করার কারণ কী
? তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারিত অপপ্রচারের জবাবেই এই প্রতিবেদন।

লেখক — জগদীশচন্দ্র রায়

যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের নাম শুনলেই এক শ্রেণির লোকেরা তাঁকে গালি দিতে শুরু করে। তাদের কথায়, যোগেন মণ্ডল বাংলাভাগ করেছে। তারজন্য পূর্ববাংলার হিন্দুদের চরম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। যোগেন মণ্ডল নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য মন্ত্রীত্বের লোভে পাকিস্তানের মন্ত্রী হনতিনি কেন মুসলিম লীগের মন্ত্রীসভায় যোগদান করেছিলেন? পাকিস্তান থেকে তিনি কেন  পালিয়ে এসেছিলেন?

-এরকম হাজারো প্রশ্ন আছে? আমরা এই সব প্রশ্নকে মাথায় রেখে তথ্যসহ জবাব দেবার চেষ্টা করেছি “ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ” বইতেযদিও কারো বাঁকা লেজে  যতোই তেল মাখানো হোক না কেন সেটা সোজা হবে না। কিন্তু যাঁদের সামান্য ভাবনা চিন্তার অবকাশ আছে তাঁরা হয়তো কিছু ভাবতে পারবেন।

যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল বাংলার ‘আম্বেদকর’তিনি পিছিয়ে রাখা শ্রেণির লোকদের ‘মহাপ্রাণতাঁর নেতৃত্বে বাবাসাহেবকে সংবিধান সভায় প্রেরণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সাংবিধানিক সুবিধার জন্য পিছিয়ে রাখা শ্রেণির অনেকটা উত্তোরণ ঘটেছে। সে জন্য বর্ণবাদীদের যতো জ্বালা। তাই তারা সংরক্ষণ নির্মূল করণের খেলায় মেতেছে। এই কাজে কিছু মিরজাফরও জুটেছে।

মহাপ্রাণ সম্পর্কে তাঁর সুযোগ্য পুত্র জগদীশচন্দ্র মণ্ডল “মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ” নামে সাতটি  খণ্ডে বই প্রকাশ করেছেন তথ্য দিয়ে। তাই তিনি লেখক হিসাবে দাবি করেন নি। কারণ, তিনি তৎকালীন পত্র-পত্রিকা ও অন্যান্য থেকে তথ্য সংগ্রহ করেই বই প্রকাশ করেছেন।  

“মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ”-এর দ্বিতীয় খণ্ডের ‘ঐতিহাসিক মূল্যায়ন’-এ কিরণ চন্দ্র ব্রহ্ম  জানিয়েছেন, “ভারত স্বাধীন হওয়ার পরেই চারিদিক হতে একটা চিৎকার প্রতিধ্বনিত হল যে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল দেশভাগ করেছে, তাঁর মত সর্বনাশা লোক ভারতে আর কেউ নেই। এই মিথ্যা দোষারোপকারীরা অশ্লীল ভাষায় তাঁকে অজস্র গাল দিয়েছে। প্রকৃত পক্ষে ভারত ভাগে তাঁর কোন ভূমিকা ছিল না। তবে এই কুৎসা রটনাকারীদের উদ্দেশ্য কি তাও প্রনিধান করা দরকার।  যারা এই মিথ্যা রটিয়েছে তারাও জানে ভারত ভাগে যোগেন্দ্রনাথের কোনো ভূমিকাই ছিল না এবং তিনি দেশ ভাগের একান্ত বিরোধী ছিলেনএই কুৎসা রটনার কারণ আমাদের কাছে মোটেই দুর্বোধ্য নয়। কারণ, এই দেশের নিপীড়িত মানুষের অন্তরে মহাপ্রাণ যে শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন সেটাকে নষ্ট করে দিয়ে সাধারণ মানুষের অন্তর থেকে তাঁকে চিরতরে মুছে দিতে পারলে তাঁর আজীবন সংগ্রামকে ব্যর্থ করে দেওয়া সম্ভব হবে এবং চির বঞ্চিতদের শোষণ, শাসন চিরস্থায়ীভাবে কায়েম করে রাখা যায়। এই ছিল কুৎসা রটনাকারীদের মূল উদ্দেশ্য।”   

নাগপুর উনিভার্সিটির অধ্যাপক প্রদীপ আগ্‌লাবে বলেছেন, “বাবাসাহেব যদি সংবিধান সভায়  যেতে না পারতেন তাহলে এই দেশের সংবিধান ব্রাহ্মণদের পক্ষেই লেখা হতো। তাই যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল আম্বেদকরী আন্দোলনে যে সহযোগিতা করেছেন এবং মূলনিবাসীদের উদ্ধারের জন্য যে কাজ করেছেন সেটা অসাধারণ কাজ। (তথ্য- সাংবিধানিক ভারত নির্মাতা বাবাসাহেব ড. আম্বেদকর আউর মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, লেখক- ড. সঞ্জয় গজভিয়ে, পৃ. ১১)

জাপানী গবেষিকা মাসায়ুকি উসুদা যোগেন্দ্রনাথের কর্মজীবনকে ডঃ আম্বেদকরের কর্মজীবনের সঙ্গে তুলনা করে ভারত-ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ যুগ-সন্ধিক্ষণের এই বিশেষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বটি যেভাবে উপেক্ষিত হয়েছেন তাতে দুঃখ করেছেন।৫৬ (তথ্য- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, লেখক- সদানন্দ বিশ্বাস, পৃষ্ঠা ২৩৪ ) (৫৬ Pushed Towards the Partition Jogendranath Mandal and the Constrained Namasudra Movement-Masayuki Usuda/Caste system, Untouchability and the Depressed-H. Katani (еdt), Р.Р.-221

 (His career may be outwardly compared to that of Ambedkar. Despite that, he is not mentioned even in the national biography of India published in Calcutta, the centre of Bengali culture to which he belonged. Sansad Caritabhidhan, a representative biographical dictionary in Bengali, treats him unjustly in the shortest six lines without ever making the effort to note the year of his birth or referring to the fact that he was the first Law and Labour Minister of Pakistan. অনুবাদ- তাঁর কর্মজীবনের তুলনা আম্বেদকরের সাথে করা যেতে পারে। তা সত্ত্বেও, কলকাতায় প্রকাশিত ভারতের জাতীয় জীবনীতেও তাঁর উল্লেখ নেই, যেখানে তিনি ছিলেন বাঙালি সংস্কৃতির কেন্দ্র। বাংলা ভাষায় একটি প্রতিনিধিত্বমূলক জীবনী অভিধান 'সংসদ চরিতবিধান' তাঁর জন্মের বছর উল্লেখ করার চেষ্টা না করে অথবা তিনি পাকিস্তানের প্রথম আইন ও শ্রমমন্ত্রী ছিলেন তা উল্লেখ না করেই সংক্ষিপ্ততম ছয় লাইনে তাঁর সাথে অন্যায় আচরণ করে।)

বাংলায় তো মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের প্রতি বদনামের পাহাড় চলছে, হিন্দি বলয়েও এই বদনাম ও তাঁর কৃতিত্ত্বের শ্রেয় অন্যকে দেওয়ার কাজ চলছে বই লিখে ও বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে। যেগুলো স্বেচ্ছায় হতে পারে অথবা তাঁদের সঠিক তথ্যের জানকারির অভাবেও হতে পারে। আসুন সে বিষয়ে আলোচনা করা যাক- এটা বলা হয়ে যে,

১) যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের নেতৃত্বে বাবাসাহেবকে পূর্ব বঙ্গ(বাংগাল) থেকে সংবিধান সভার জন্য নির্বাচিত করে পাঠিয়েছিলেন।

২) বাংলার নমঃশূদ্র লোকেরা বাবাসাহেবকে সংবিধান সভায় নির্বাচিত করে পাঠিয়ে ছিলেন।

৩)এক বড় সংগঠনের প্রেসিডেণ্ট বলেছেন- যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে পাকিস্তান যেতে মানা করেছিলেন।

৪) লেখক শংকরানন্দ শাস্ত্রী তাঁর বইতে লিখেছেন- ভারত ভাগ হওয়ার পর, করাচি যাওয়ার আগে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল বাবাসাহেবকে একটা ‘তার” টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু বাবাসাহেব বাবাসাহেব সাহেব মন্ডলের টেলিগ্রামে সাড়া দেননি।

৫) (DR. AMBEDKAR: LIFE AND MISSION. DHANANJAY KEER. Page No. 382) তে লিখেছেন- There with the backing of Muslim League, he was elected to the Constituent Assembly.

আসুন এক এক করে এই মিথ্যা অভিযোগগুলোর জবাব তুলে ধরা যাক-

১) যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের নেতৃত্বে বাবাসাহেবকে পূর্ব বঙ্গ(বাংগাল) থেকে সংবিধান সভার জন্য নির্বাচিত করে পাঠিয়েছিলেন।

আমাদের একটু শেখা উচিত। যে স্থানকে পূর্ববঙ্গ (বাঙ্গাল) বলা হচ্ছে, ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সেটা ভারতেরই অংশ ছিল, আর আজকের দিনে সেটাই বাংলাদেশ। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সেটা ছিল পূর্ব পাকিস্তান। আমরা যদি বলতে চাই, তাহলে ‘পূর্ববঙ্গ’ বলতে পারি। কারণ, যেখান থেকে—যশোর, খুলনা, বরিশাল এবং ফরিদপুর—এর মানুষেরা  বাবাসাহেবকে নির্বাচিত করে দিয়ে ছিলেন, সেটা পশ্চিমবঙ্গ ছিল না; সেই সময় সেটা ছিল পূর্ববঙ্গ বা ভারতেরই অংশ

ছোট্ট একটি বিষয়ের মধ্যেও অনেক পার্থক্য রয়েছে। আমি কাউকে সমালোচনা করার জন্য এটা বলছি না। আমি মনে করি, আপনাদের এটা সংশোধন করা উচিত। কারণ, আমরা যদি সঠিক কথা না বলি, তাহলে আগামী দিনে আমাদের সমস্যাই আরও বাড়বে।

অভিযোগ - ২) বাংলার নমঃশূদ্র লোকেরা বাবাসাহেবকে সংবিধান সভায় নির্বাচিত করে পাঠিয়ে ছিলেন।

বাংলার নমঃশূদ্র লোকেরা বাবাসাহেবকে সংবিধান সভায় পাঠিয়েছিল”—এই কথাতেও একটু ভুল আছে। বাবাসাহেব আম্বেদকর যে সাতটি ভোট পেয়েছিলেন, তার মধ্যে শুধু নমঃশূদ্র ছিলেন না; রাজবংশী মানুষও ছিলেন। এছাড়াও একজন আদিবাসী/মূলনিবাসী প্রতিনিধিও ছিলেন।

যাঁরা সংগ্রাম করেছিলেন, তাঁরা তফসিলি জাতি (SC) ও তফসিলি উপজাতি (ST) সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। কিন্তু আপনি যদি শুধু নমঃশূদ্র মানুষ বলে উল্লেখ করেন, তাহলে অন্যদের প্রতি ন্যায়বিচার হবে না।

আপনি বলতে পারেন যে, SC ST সম্প্রদায়ের মানুষ বাবাসাহেবকে নির্বাচিত করে সংবিধান সভায় পাঠিয়েছিলেন। আমি শুধু কথাটি সংশোধন করার জন্যই এটা বলছি।

অভিযোগ- ৩) এক বড় সংগঠনের প্রেসিডেণ্ট বলেছেন- যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে পাকিস্তান যেতে মানা করেছিলেন।

আমাদেরই একটা বড় সংগঠনের প্রেসিডেন্ট আছেন। তিনি একটি ভিডিওতে কী বলেছেন? তিনি বলেছেন—না, বাবাসাহেব আম্বেদকর যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে পাকিস্তানে যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু তিনি বাবাসাহেবের কথা শোনেননি।”

আসুন এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যসহ আলোচনা করা যাক- কিন্তু আপনাদের একটি তথ্য জানাই।

বাবাসাহেব আম্বেদকরকে ৩০ মে ১৯৪৭ তারিখে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল একটি চিঠি লিখেছিলেন—“এই পরিস্থিতিতে আমি কী করব?” কারণ, খুব তাড়াতাড়ি দেশভাগ ও বাংলাভাগ হতে পারে। তিনি বাবাসাহেবকে তাঁর রাজনৈতিক গুরু হিসাবে মানতেন। তাই এই কঠিন পরিস্তিতিতে ‘গুরুর’ কাছে সমস্যার সমাধান চেয়ে চিঠি লেখেন।  

এই ‘গুরু’ আজকের দিনের অর্থে গুরু নয়; এখানে ‘গুরু’ বলতে শ্রদ্ধেয় বা সম্মানিত ব্যক্তি বোঝানো হয়েছে।

যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের সেই চিঠি পাওয়ার পর ২ জুন ১৯৪৭ তারিখে বাবাসাহেব যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠিতে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের কী করা উচিত, সে বিষয়ে তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন।

আমি সেই চিঠি থেকে কয়েকটি লাইন আপনাদের সামনে তুলে ধরছি সম্পূর্ণ চিঠি বইয়ের পরিশিষ্টে দেওয়া আছে।

***The Scheduled Castes were incapable of doing anything precisely with regard to the question of partition. They could neithr force partition nor could they prevent partition if it was coming. The only course left to the Scheduled Castes is to fight for safeguards either in United Bengal or a devided Bengal. 

---I have of course told the Hindus that in case here is partition they shall have to agree to reserve some land in Western Bengal for the Scheduled Castes of Eastern Bengal.

--- I agree that you should work in alliance with the League and secure adequate safeguards for them,

-- The Muslim League however, will be ready to give to the Scheduled Castes separate electorates more probably because they themselves want separate electorates for their own community.

-- In my view that Memorandum contains all that we need for our protection, not only in Eastern Bengal but in every province in India. I think you should make this memorandum the best use in your negotiations with Muslim League. Of course, you are free to add to it any new safeguards for our people in Eastern Bengal which you think there are some special circumstances which call for such safeguards. -

বাংলা অনুবাদ:

দেশভাগের প্রশ্নে তফসিলি জাতির পক্ষে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু করার ক্ষমতা ছিল না। তারা যেমন দেশভাগ ঘটাতে বাধ্য করতে পারত না, তেমনই দেশভাগ যদি অনিবার্য হয়ে আসে, তাহলে তা প্রতিরোধ করতেও পারত না। তফসিলি জাতির সামনে একমাত্র পথ ছিল—অখণ্ড বাংলা হোক বা বিভক্ত বাংলা, উভয় ক্ষেত্রেই নিজেদের অধিকার ও নিরাপত্তার জন্য সুরক্ষা-ব্যবস্থার দাবিতে সংগ্রাম করা।”

আমি অবশ্য হিন্দুদের বলে দিয়েছি যে, যদি দেশভাগ হয়, তাহলে তাদের পূর্ববঙ্গের তফসিলি জাতির মানুষের জন্য পশ্চিমবঙ্গে কিছু জমি সংরক্ষণ করতে সম্মত হতে হবে।”

আমি একমত যে, আপনার উচিত মুসলিম লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করা এবং তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।”

তবে মুসলিম লীগ তফসিলি জাতির জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী (Separate Electorates) দিতে প্রস্তুত থাকবে—সম্ভবত এই কারণেই যে, তারাও নিজেদের সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী চায়।

আমার মতে, ওই স্মারকলিপিতে আমাদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত বিষয়ই রয়েছে—শুধু পূর্ববঙ্গের জন্য নয়, ভারতের প্রতিটি প্রদেশের জন্যই। মুসলিম লীগের সঙ্গে আপনার আলোচনায় এই স্মারকলিপিটিকে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগানো উচিত বলে আমি মনে করি। অবশ্য, পূর্ববঙ্গের আমাদের মানুষের জন্য যদি এমন কোনো নতুন সুরক্ষা-ব্যবস্থার প্রয়োজন আছে বলে আপনি মনে করেন, যা বিশেষ পরিস্থিতির কারণে জরুরি, তাহলে আপনি তাতে সেগুলিও যুক্ত করতে পারেন।”

 বাবাসাহেব যেভাবে বলছেন, আর আমাদের কিছু মানুষ যেভাবে বলছেন—বাবাসাহেব তাঁকে পাকিস্তানে যেতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু তিনি পরে পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন।”

এবার আসি সবচেয়ে মারাত্মক প্রশ্নের জবাবে –

 ৪) লেখক শংকরানন্দ শাস্ত্রী তাঁর বইতে লিখেছেন- ভারত ভাগ হওয়ার পর, করাচি যাওয়ার আগে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল বাবাসাহেবকে একটা ‘তার” টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু বাবাসাহেব বাবাসাহেব সাহেব মন্ডলের টেলিগ্রামে সাড়া দেননি।

শংকরানন্দ শাস্ত্রী তাঁর ড. ভীমরাও আম্বেদকর জীবন সংঘর্ষ এবং রাষ্ট্র সেবায়ে বইয়ের ২৯২ থেকে ২৯৪ নম্বর পৃষ্ঠায় লিখেছেন—

(৪২) যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ভুলভুলাইয়া: (গোলকধাঁধায় যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল)

 দেশভাগ হয়ে যাওয়ার পর, করাচি যাওয়ার আগে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল বাবাসাহেবকে একটি তার পাঠিয়েছিলেন। তাতে তিনি বাবাসাহেবের কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে, তিনি পাকিস্তানে মুসলিম লীগের মন্ত্রিসভায় থাকবেন কি না।”

বাস্তবে দেশভাগের পর যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের কী করা উচিত—সে বিষয়ে তিনি বাবাসাহেবের কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন। যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল বাবাসাহেবকে যে চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন, সেটি ছিল ৩০ মে ১৯৪৭ তারিখের। অথচ লেখক শংকরানন্দ শাস্ত্রী বলেছেন—‘বিভাজন হয়ে যাওয়ার পর, করাচি যাওয়ার আগে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল বাবাসাহেবকে একটি তার পাঠিয়েছিলেন।’

আসলে সেটি ‘তার’ (Telegram) নয়, ‘গোপন চিঠি’ (Confidential Letter) ছিল।

আর সেটি দেশভাগ হয়ে যাওয়ার পর পাঠানো হয়নি; চিঠিটি ৩০ মে ১৯৪৭ তারিখে পাঠানো হয়েছিল।

এরপর শংকরানন্দ শাস্ত্রী লিখেছেন—

বাবাসাহেব শ্রী মণ্ডলের তারের কোনো উত্তর দেননি। তিনি নীরব ছিলেন। সেই সময় লেখক তিলক মার্গ, নয়াদিল্লিতে বাবাসাহেবের সঙ্গেই অবস্থান করছিলেন। সেই সময় বাবাসাহেব তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছিলেন—

শ্রী মণ্ডলের মুসলিম লীগের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়া উচিত হয়নি। মুসলিম রাজনীতি এমনই যে, তারা কখনোই অন্য কারও সঙ্গে মিলিত হয়ে কোনো অত্যাচারের মোকাবিলা করতে পারে না।’”

লেখক কী বলেছেন—“বাবাসাহেব শ্রী মণ্ডলের তারের কোনো উত্তর দেননি।”

কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি—বাবাসাহেব যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের ৩০ মে ১৯৪৭ তারিখের চিঠির উত্তর ২ জুন ১৯৪৭ তারিখে দিয়েছিলেন। আর সেই চিঠিতে কী লেখা ছিল, তার সামান্য অংশ আমি উপরে দিয়েছি।

এরপর শংকরানন্দ শাস্ত্রী লিখেছেন—

শ্রী মণ্ডলের কী পরিণতি হবে? এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়। তবুও, তিনি কি পাকিস্তানে আমাদের মানুষদের মুসলমান হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারবেন? পাকিস্তানে যে অস্পৃশ্যরা থাকবেন, তাঁরা কি অস্পৃশ্য হিসেবে মানবিক অধিকার লাভ করতে পারবেন? তাঁরা কি পাকিস্তানে টিকে থাকতে পারবেন?—এগুলো এমন কিছু প্রশ্ন, যার উত্তর সময়ই দেবে।”

যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের এই পরিস্থিতিতে কী করা উচিত, সে বিষয়ে বাবাসাহেব তাঁর চিঠিতে বিস্তারিতভাবে লিখেছিলেন। তা সত্ত্বেও যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে নিয়ে কেন এমন ভুল প্রচার করা হচ্ছে?

এবার আসি সবচেয়ে অসম্মানজনক মন্তব্যে - ৫) (DR. AMBEDKAR: LIFE AND MISSION. DHANANJAY KEER. Page No. 382) তে লিখেছেন- There with the backing of Muslim League, he was elected to the Constituent Assembly.

বাবাসাহেবের জীবনীকার ধনঞ্জয় কীর তাঁর লেখা গ্রন্থ ‘ডঃ আম্বেদকর: জীবন ও কর্ম। পৃষ্ঠা নং ৩৮২)-তে উল্লেখ করেছেন- Ambedkar had no men in the Bombay Agembly to support his candidature, and so his name' was put up through the Scheduled Castes representatives in the Bengal Assembly. There with the backing of Muslim League, he was elected to the Constituent Assembly. অর্থাৎ আম্বেদকরের প্রার্থিতাকে সমর্থন করার জন্য বোম্বে অ্যাসেম্বলিতে তাঁর কোনো লোক/প্রতিনিধি ছিল না। তাই বাংলার অ্যাসেম্বলিতে থাকা তফসিলি জাতির প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তাঁর নাম প্রস্তাব করা হয়। সেখানে মুসলিম লীগের সমর্থনে তিনি গণপরিষদে (Constituent Assembly) নির্বাচিত হন।

 আপনারা কি জানেন, এর আসল কারণ কী ছিল?

সেই সময় যে নির্বাচন হয়েছিল, তাতে হিন্দুরা শুধু হিন্দুদেরই ভোট দিতে পারতেন। আর মুসলমানরা মুসলমানদের ভোট দিতে পারতেন। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা যেকোনো প্রার্থীকে ভোট দিতে পারতেন। কিন্তু সেই নির্বাচনে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা অংশগ্রহণ করেননি। বাবাসাহেব আশা করেছিলেন যে, তাঁরা হয়তো তাঁকে ভোট দেবেন; কিন্তু তা আর হয়নি।

তাই বাবাসাহেবকে সংবিধান সভায় পাঠানোর জন্য যে ন্যূনতম পাঁচটি ভোটের প্রয়োজন ছিল, তিনি সেখানে সাতটি ভোট পেয়েছিলেন। এর পেছনে একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। আমি সেই বিষয়ে এখন বেশি বিস্তারিত বলছি না।

সেই সময় সেখানে মুসলিম লীগের মন্ত্রিসভা ছিল এবং সেই মন্ত্রিসভায় যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলও মন্ত্রী ছিলেনসেখানে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল মুসলিম লীগের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করছিলেন।

কিন্তু ভোট দেওয়ার সময় মুসলমানদের বাবাসাহেবকে ভোট দেওয়ার অধিকার ছিল না। তাঁরা তাঁকে নৈতিক সমর্থন দিয়েছিলেন। কীভাবে মুসলমানরা বাবাসাহেবকে পরোক্ষভাবে তাঁদের সাধ্যমতো সাপোর্ট করেছিলেন, তার কয়েকটি উদাহরন তুলে ধরছি-

১) টাঙ্গাইলের এম.এল.এ. গয়ানাথ বিশ্বাসের ড. আম্বেদকরের প্রতি গভীর ঝোঁক ছিল। তিনি যে ড. আম্বেদকরকে ভোট দিতে পারেন—এ কথা জানতে পেরে তাঁর কংগ্রেসি ‘অভিভাবকেরা’ তাঁকে একটি গোপন স্থানে লুকিয়ে রেখেছিলেন, যাতে তিনি সময়মতো ভোট দেওয়ার জন্য সেখানে যেতে না পারেন।

কিন্তু নিপীড়িত মানুষের মুক্তিদাতা ড. আম্বেদকরের প্রতি তাঁর আকর্ষণ এতটাই গভীর ছিল যে, তিনি সেই গোপন স্থান থেকে তাঁর ভাতিজার মাধ্যমে ভোটের এক দিন আগে গভীর রাতে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের কাছে বার্তা পাঠিয়েছিলেন—'তাঁকে যদি অ্যাসেম্বলি হাউসে নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে তিনি নিশ্চিতভাবেই ড. আম্বেদকরকে ভোট দেবেন।

এই সময় যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের অনুরোধে মুসলিম সমাজ ও প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে ওই সদস্যকে সেখান থেকে উদ্ধার করে ফিরিয়ে নিয়ে আসে আর তিনি বাবাসাহেবকে ভোট দেন।

২) এদিকে মুকুন্দ বিহারী মল্লিকও সংবিধান সভার নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু যাঁদের কাছ থেকে তিনি ভোট পাওয়ার আশা করেছিলেন, তাঁরা ড. বাবাসাহেব আম্বেদকরকে ভোট দেবেন সেটা তিনি বুঝতে পারলেন অর্থাৎ তিনি নির্বাচিত হওয়ার মতো ভোট পাবেন না।

তখন ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার আগের রাতে খাজা স্যার নাজিমুদ্দিনের ভাই খাজা সাহাবুদ্দিন টেলিফোনে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে জানিয়েছিলেন—

মিস্টার মণ্ডল, আপনার অনুমানই ঠিক; এইমাত্র মিস্টার এম. বি. মল্লিক (মুকুন্দ বিহারী মল্লিক) আমাকে টেলিফোন করে জানিয়েছেন যে, তিনি ড. আম্বেদকরকে ভোট দেবেন।”

এইভাবে মুসলমানরা তথা মুসলিম সরকার পরোক্ষভাবে বাবাসাহেবকে সমর্থন করেছিলেন। আমি আবারও বলছি, তাঁদের হিন্দু প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার অধিকার ছিল না। তাই যারা বলে যে, মুসলমানরা বাংলার থেকে বাবাসাহেবকে ভোট দিয়ে সংবিধান সভায় পাঠিয়েছিলেন—এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। মুসলমানরা তাঁকে নৈতিক সমর্থন দিয়েছিল।

—এইভাবে লিখে বা নিজের বক্তব্যের মাধ্যমে মুসলমানরা বাবাসাহেবকে সংবিধান সভায় পাঠিয়েছিল’এমন প্রচার করার ফলে মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল তথা শিডিউল্ড কাস্ট ফেডারেশনের জীবন-মরণ সংগ্রামকে অপমান করা হয়।

সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের জানা উচিত। শুধু বই লিখলেই বা বড় বড় কথা বললেই কেউ বড় হয়ে যায় না। আসল ইতিহাস জানতে হবে এবং সত্য ইতিহাসকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে হবে। মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল বাংলার ‘আম্বেদকর’। তাঁকে যতোই ছোট করা হোক, তাঁর কৃতিত্ত্বকে স্বীকার না করে অন্যদের দেওয়া হোক, তাঁকে যতোই গালি দেওয়া হোকনা কেন আজ পিছিয়ে রাখা মানুষেরা সাংবিধানিকভাবে সেসব সুবিধা পাচ্ছেন, সেখানে মহাপ্রাণেরও অবদান আছে। সে জন্যই তাঁকে ‘মহাপ্রাণ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে।

                    ___________________

 

Ambedkar’s letter to Jogendranath mandal about after Partition What should be to do.



 



https://roymulnivasi.blogspot.com/2026/01/ambedkars-letter-to-jogendranath-mandal.html

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

0 comments:

Post a Comment