Saturday, 11 April 2026

// // Leave a Comment

প্রশ্ন আসতে পারে -অল্পসংখ্যক মানুষ কীভাবে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর উপর শাসন প্রতিষ্ঠা করে? বই-গোলামগিরি, লেখক- জ্যোতিরাও ফুলে বাংলা রুপান্তর- সুধীর রঞ্জন হালদার

 

    


প্রশ্ন আসতে পারে -অল্পসংখ্যক মানুষ কীভাবে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর উপর শাসন প্রতিষ্ঠা করে? বা বলতে গেলে তাদের ইচ্ছামতো রাজত্ব বা শাসন চালাতে পারে? এ বিষয়ে মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলের “গোলামগিরি” থেকে কিছু অংশ তুলে ধরছি। আর এটা তুলে ধরার উদ্দেশ্য হচ্ছে বর্তমান দিনেও কি SC, ST, OBC-রা ব্রাহ্মণবাদের গোলামগিরি করছেন না? এর থেকে পরিত্রাণের জন্য তারা কিছু করছেন? নাকি গোলামিতেই আনন্দ উপভোগ করছেন?

বই-গোলামগিরি (অংশবিশেষ)

লেখক- জ্যোতিরাও গোবিন্দরাও ফুলে

বাংলা রুপান্তর- সুধীর রঞ্জন হালদার

     শূদ্রদের জন্য তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনে রাস্তাঘাটে অবাধে চলাফেরা করা ছিল অত্যন্ত কঠিন; বিশেষ করে সকালবেলা, যখন মানুষ বা বস্তুর দীর্ঘ ছায়া চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। যদি বিপরীত দিক থেকে কোনো ‘ভট সাহেব’(মহারাষ্ট্রে ব্রাহ্মণদের ভট বলা হয়) আসত, তবে শূদ্রকে রাস্তার একপাশে ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হতো যতক্ষণ না সেই ‘ভট সাহেব’ তাকে অতিক্রম করে চলে যেত- যাতে শূদ্রের ‘অপবিত্র’ ছায়া তার উপর না পড়ে। ‘ভট সাহেব’ চলে যাওয়ার পরই কেবল সে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি পেত। যদি কোনো শূদ্র দুর্ভাগ্যক্রমে অসাবধানতাবশত কোনো ভাটের উপর তার অপবিত্র ছায়া ফেলে দিত, তবে সেই ভট তাকে নির্দয়ভাবে প্রহার করত এবং তারপর সেই অপবিত্রতা ধুয়ে ফেলতে নদীতে স্নান করতে যেত। শূদ্রদের এমনকি রাস্তায় থুতু ফেলার উপরও নিষেধাজ্ঞা ছিল। যদি তাকে কোনো ব্রাহ্মণ পাড়ার ভেতর দিয়ে যেতে হতো, তবে তার থুতু ফেলার জন্য নিজের গলায় একটি মাটির পাত্র ঝোলানো থাকত। যদি কোনো ভট কর্মকর্তা রাস্তায় কোনো শূদ্রের মুখের থুতু পড়ে থাকতে দেখত, তবে সেই শূদ্রের কপালে যে কী দুর্ভোগ জুটত, তা অবর্ণনীয়! শূদ্ররা এই ধরনের অসংখ্য লাঞ্ছনা ও প্রতিবন্ধকতা সহ্য করছিল আর এই অত্যাচারীদের হাত থেকে মুক্তির পথ চেয়ে ছিল, ঠিক যেভাবে বন্দিরা ব্যাকুল হয়ে মুক্তির প্রতীক্ষা করে। সর্বদয়াবান বিধাতা শূদ্রদের প্রতি করুণাপরবশ হলেন এবং তাঁর ঐশ্বরিক বিধানে ভারতে ব্রিটিশ রাজের সূচনা করলেন, যা শূদ্রদের এই শারীরিক দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করল। আমরা ব্রিটিশ শাসকদের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। আমরা তাঁদের এই দয়া কখনোই ভুলব না। এই ব্রিটিশ শাসকরাই আমাদের ভটদের (ব্রাহ্মণদের) শতাব্দীপ্রাচীন অত্যাচার থেকে মুক্ত করেছেন এবং আমাদের সন্তানদের জন্য এক আশাপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করেছেন। যদি ব্রিটিশরা শাসক হিসেবে ভারতে না আসতেন, তবে ভটরা নিশ্চিতভাবেই অনেক আগেই আমাদের পিষে শেষ করে ফেলত।

    কেউ কেউ হয়তো বিস্ময় প্রকাশ করতে পারেন যে- কীভাবে ভটরা এই নিপীড়িত ও পদদলিত মানুষগুলোকে পিষে ফেলতে সক্ষম হলো, যেখানে শূদ্রদের সংখ্যা ছিল ভটদের তুলনায় দশগুণ বেশি। এটি একটি সুপরিচিত বিষয় যে, একজন চতুর ব্যক্তি দশজন অজ্ঞ ব্যক্তিকে অনায়াসেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে (যেমন একজন মেষপালক ও তার ভেড়ার পাল)। যদি সেই দশজন অজ্ঞ মানুষ ঐক্যবদ্ধ হতো, তবে তারা অবশ্যই সেই চতুর ব্যক্তির উপর জয়ী হতো। কিন্তু যদি সেই দশজন বিচ্ছিন্ন থাকে, তবে তারা সহজেই ওই চতুর ব্যক্তির দ্বারা প্রতারিত হবে। ভটরা শূদ্রদের মধ্যে বিভেদের বীজ বপন করার জন্য একটি অত্যন্ত কুটিল পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিল। নিপীড়িত ও পদদলিত মানুষের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা দেখে ভটরা স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কিত ছিল। তারা জানত যে, কেবল তাদের বিচ্ছিন্ন রাখতে পারলেই তাদের (ভটদের) প্রভুত্ব চিরস্থায়ী হবে। তাদের অনির্দিষ্টকালের জন্য অধম দাসে পরিণত করে রাখার একমাত্র পথ ছিল এটাই; আর কেবল এভাবেই তারা শূদ্রদের গায়ের রক্তঘাম ঝরানো পরিশ্রমের বিনিময়ে বিলাসিতা ও ভোগবিলাসের জীবন অতিবাহিত করতে সক্ষম হবে। সেই উদ্দেশ্যেই ভটরা ‘বর্ণপ্রথা’ ও জাতিভেদপ্রথার মতো এক অনিষ্টকারী কাল্পনিক কাহিনী উদ্ভাবন করেছিল, নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য জটিল সব গ্রন্থ রচনা করেছিল এবং অজ্ঞ শূদ্র জনসাধারণের সরল মনে সেই অনুযায়ী বিষ গেঁথে দিয়েছিল। কিছু শূদ্র এই প্রকাশ্য অবিচারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত বীরত্বের সাথে লড়াই চালিয়েছিল। প্রতিশোধস্বরূপ তাদের একটি পৃথক শ্রেণিতে আলাদা করে দেওয়া হয়েছিল। ভটরা তাদের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার দুঃসাহসের কারণে, আমরা আজ যাদের মালি, কুনবি (চাষী) ইত্যাদি বলি- তাদের বুঝিয়েছিল যাতে তারা ওই বিদ্রোহী যোদ্ধাদের ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবে গণ্য করে। জীবনধারণের উপায় থেকে বঞ্চিত হয়ে সেই বিদ্রোহী শূদ্ররা মৃত পশুর মাংস খাওয়ার মতো চরম অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল। আজ শূদ্র সম্প্রদায়ের কিছু সদস্য অত্যন্ত গর্বের সাথে নিজেদের মালি, কুনবি, স্বর্ণকার, দর্জি, কামার বা ছুতার হিসেবে পরিচয় দেয়- যা মূলত তাদের পেশার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তারা খুব সামান্যই জানে যে, আমাদের পূর্বপুরুষ এবং এই তথাকথিত অস্পৃশ্যদের- মাহার, মাঙ্গ, চণ্ডাল ইত্যাদি- পূর্বপুরুষরা আসলে সহোদর ভাই ছিল- অর্থাৎ তারা একই বংশধারা থেকে উদ্ভূত। তাদের পূর্বপুরুষরা আক্রমণকারী দখলদারদের (ভটদের) হাত থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষা করার জন্য বীরত্বের সাথে লড়াই করেছিল আর সেই কারণেই ধূর্ত ভটরা তাদের চরম দারিদ্র ও দুর্দশার দিকে ঠেলে দিয়েছিল। এটি অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, এই প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে অসচেতন হওয়ার কারণে, শূদ্ররা তাদের নিজেদের ভাইবোনদেরই ঘৃণা করতে শুরু করেছে।

    শূদ্ররা ভটদের প্রতি কেমন আচরণ করছে, তার উপর ভিত্তি করে ভটরা জাতিভেদ বা বর্ণবৈষম্যের একটি বিস্তৃত ও জটিল ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেছিল- যেখানে কাউকে রাখা হয়েছিল একদম নীচের স্তরে, আবার কাউকে রাখা হয়েছিল সামান্য উপরের স্তরে। এইভাবে তারা স্থায়ীভাবে শূদ্রদের নিজেদের অনুগত দাসে পরিণত করেছিল এবং এই অন্যায় জাতিভেদ প্রথারূপী শক্তিশালী অস্ত্রের মাধ্যমে শূদ্রদের মাঝে চিরস্থায়ী বিভেদের দেওয়াল তুলে দিয়েছিল।

     এটা ছিল সেই চিরচেনা গল্পের মতো- যেখানে দুই বিড়ালের বিবাদে তৃতীয় পক্ষ- বানর বিচারক সেজে সবটুকু হাতিয়ে নেয়! ভটরা এই নিপীড়িত ও পদদলিত জনসমষ্টির মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করেছিল এবং সেই বিভেদের সুযোগ নিয়েই তারা নিজেরা ফুলে-ফেঁপে উঠছে- অর্থাৎ বিলাসবহুল জীবন যাপন করছে।---

১ জুন, ১৮৭৩   জ্যোতিরাও গোবিন্দরাও ফুলে

 

 

 

0 comments:

Post a Comment