স্বাধীনতার আন্দোলন ও বাবাসাহেব আম্বেদকর। তিনি কোন স্বাধীনতার আন্দোলন করেছিলেন?
লেখক -জগদীশ রায়
(মূল ১২ পাতার লেখাকে
সংক্ষিপ্ত করে ৫ পাতা করে পোষ্ট করলাম)
ভারতের স্বাধীনতার
নাম শুনলেই ভেসে ওঠে গান্ধী, বিনয়-বাদল-দীনেশ, খুদীরাম, সূর্যসেন ইত্যাদি নাম। বিপ্লবীরা অবশ্যই দেশের জন্য স্বাধীনতার
আন্দোলন করেছিলেন। দেশের নেতারা কিন্তু সমগ্র ভারতবাসীর স্বাধীনতা জন্য আন্দোলন করেন
নি। তার একটা প্রমাণ-
গান্ধিজি বলেছিলেন,“যদি ইংরেজরা ভারতের স্বাধীনতা দেয়, তার
বদলে অর্থাৎ ভারতের স্বাধীনতার বদলে যদি অচ্ছুৎদের (বর্তমান তপশিলি) অধিকার দেয় তাহলে
এই ধরনের স্বাধীনতা আমি চাই না।”
ইংলণ্ডের গোল
টেবিল বৈঠকে বাবা সাহেব ইংরেজদের সঙ্গে দেশের বঞ্চিতদের জন্য যেসব অধিকার অর্জন করেছিলেন,
সেই অধিকার যাতে বঞ্চিতরা না পায় তার জন্য গান্ধিজি ২৪ অক্টোবর ১৯৩২ পুনার যারবেদা
জেলে অনশন করেন। আম্বেদকর এক
বিবৃরতিতে বললেন গান্ধিজির প্রাণ বাঁচানোর জন্য সব রকমের সম্ভাব্য প্রয়াস চালানো উচিত। কিন্তু যে অধিকার আমরা অর্জন
করেছি তা ছাড়তে রাজি নই। সংবাদ পত্রগুলি
আম্বেদকরের বিরুদ্ধে প্রচার চালানো শুরু করল। তাঁর কাছে রক্ত দিয়ে লেখা চিঠি আসতে শুরু করল ‘তোমাকে
আমরা মেরে ফেলব।’ সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল জেলের মধ্যে এসে গান্ধিজির সঙ্গে দেখা করে বললেনঃ- “বর্ণহিন্দু এবং
অস্পৃশ্যদের মাঝখানে কেন আপনি নিজেকে স্যান্ডউইচ বানাচ্ছেন? আপনার বেঁচে থাকা জরুরি। আপনি অনশন ত্যাগ করুন।”
গান্ধীর আপ্তসহায়ক মহাদেব ভাই দেশাই কাছেই বসে ছিলেন। তিনি এঁদের দুজনের কথাবার্তা তাঁর ডাইরিতে লিখে
রেখেছিলেন।
গান্ধিজি প্যাটেলকে বোঝালেন- “অস্পৃশ্য এবং মুসলমানরা
যদি পৃথক নির্বাচনের মাধ্যমে জনতার মধ্য থেকে ইমানদার এবং সঠিক প্রতিনিধি নির্বাচন করে, তাহলে তাঁরা বিধানসভা ও লোকসভা
কংগ্রেসকে স্বাধীনভাবে সরকার চালাতে দেবেনা। স্বাধীনদেশে তাঁরাই নির্ণায়ক শক্তিতে পরিণত
হবেন। তোমাদের স্বার্থেই আমার এই অনশন।”
এই কথোপকথন লেখাছিল মহাদেব দেশাইয়ের ডাইরিতে। আমেরিকার এলিনার জুলিয়েট একজন
গবেষক ছাত্রী। গবেষণার কাজে ভারতে এসে এই ডাইরি খুঁজে বের করেছেন এবং বই লিখেছন। (তথ্যসূত্রঃ
আত্ম নিরীক্ষণ;
6 জুলাই
2006,
বাংলা ভাগ কেন হল; নিকুঞ্জবিহারী হাওলাদার, পৃষ্ঠা 105)
তিলক মহারাষ্ট্রের
আকোলা, ইভাৎমাল ও ভুষাওয়ালের খোলা ময়দানে ভাষণ দেন। এই ভাষণ ‘কেশরী’ নামক পত্রিকায় ছাপা হয়। তিলক বলেন–“আমাদের
স্বরাজের অর্থ এটা নয় যে, ইংরেজদের ভারত থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হোক। ইংরেজরা চাইলে ভারতে
থাকতে পারবে। কিন্তু শাসন প্রসাশনে আমাদের প্রতিনিধিত্ব দিতে হবে।’’ এর জন্য তিলক
মনুস্মৃতির উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, “মনুস্মৃতি অনুসারে যে কোন রাজা তার রাজ কাজ চালাতে
চাইলে বুদ্ধিমান লোকদের সঙ্গে নিয়ে শাসন প্রশাসন
চালানো উচিত।” বুদ্ধিমান অর্থাৎ লেখাপড়া শেখা পণ্ডিত। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ। এর অর্থ
তিলকের আন্দোলন শুধুমাত্র উচ্চবর্ণীয়দেরকে ইংরেজদের শাসন প্রশাসনে প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার
আন্দোলন ছিল। যাকে স্বরাজ বা হোমরুল আন্দোলন বলা হয়। এটা কোন প্রকারে স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন ছিল না। যদিও এটাকে স্বাধীনতার
আন্দোলন বলেই প্রচার করা হয়। স্বরাজ এবং স্বাধীনতার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে।
ভারতে আমরা যে স্বাধীনতার আন্দোলন
দেখতে পাই, বাস্তবে ভারতে স্বাধীনতার জন্য দুই ধরনের আন্দোলন চলছিল। এক- ইংরেজদের অধীনতা
থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য উচ্চবরণীয়দের স্বাধীনতার আন্দোলন। দুই- উচ্চবর্ণীয়দের অধীনতা
বা গোলামি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য স্বাধীনতার আন্দোলন। দ্বিতীয় স্বাধীনতার আন্দোলন সম্পর্কে
আমরা প্রায় জানিই না। এই দ্বিতীয় স্বাধীনতার আন্দোন করেছিলেন জ্যতিরাও ফুলে, শাহু মহারাজ,
বাবাসাহবে আম্বেদকর, পেরিয়ার, গুরুচাঁদ ঠাকুর ও অন্যান্য মূলনিবাসী মহামানবেরা। (বিস্তারিত
তথ্য জানা যাবে ‘স্বাধীনতার দুই আন্দোলন’ বইতে)।
বাবাসাহেব যে স্বাধীনতার আন্দোলন করেছিলেন সেটা ছিল যেমন উচ্চবর্ণীয়দের গোলামি
থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য স্বাধীনতার আন্দোলন তেমনি ভারতের সর্বসাধারণের সার্বিক স্বাধীনতার
আন্দোলন। যার প্রমাণ আমরা পাই, তিনি গোল টেবিল
বৈঠকে ইংরেজদের সামনেই বলছেন- ভারতে তাদের শাসন তুলে নিয়ে জনগণের দ্বারা, জনগণের
জন্য ও জনগণের শাসন চাই। যে কথা আব্রাহাম
লিঙ্কন বলেছিলনে By the people, for the people of the people. সেই কথার প্রতিধ্বনি
শুনতে পাই।
স্বাধীনতাকে
গোলামিতে রূপান্তর
১৭ আগস্ট ১৯৩২ সালে ড. আম্বেদকরের চারটি
দাবি স্বীকৃত হয়। এরফলে মূলনিবাসীরা স্বাধীন হয়ে যায়। গান্ধিজি ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ সালে
স্বাধীনতা লাভ করেন। আর মূলনিবাসীদের ১৭ আগস্ট ১৯৩২ সালে স্বাধীনতা অর্জিত হয়। ড.
আম্বেদকরের যে চারটি দাবি স্বীকৃত হয়েছিল সেটাকে স্বাধীনতার যে অর্থে বলা যায় সেটা
হচ্ছে DOMENION STATUS এর স্বাধীনতা। ইংরেজরা ভারতেই থাকবে কিন্তু সাংবিধানিক
অধিকারের প্রয়োগ করার জন্য মূলনিবাসীদের স্বতন্ত্র অধিকার রাখা হয়েছে। ইংরেজরা
কেন্দ্রীয় শাসন কাজ চালাবে, তাদের শাসন ব্যবস্থা চলবে কিন্তু সব ধরনের সাংবিধানিক অধিকার আমাদের থাকবে। একে বলা হয় DOMENION STATUS এর স্বাধীনতা।
বাবসাহবে ড. আম্বেদকর
ইংরেজদের বোঝান যে উচ্চবর্ণদের স্বাধীন করার আগে আমাদের
স্বাধীন করতে হবে। তারা ইংরেজদের গোলাম আর আমারা উচ্চবর্ণের গোলাম। উচ্চবর্ণীয়দের স্বাধীন
করে দিলে তারা মূলনিবাসীদের কোনো দিন স্বাধীনতা দেবেনা। তাই উচ্চবর্ণীয়দের নয়, আগে
মূলনিবাসীদের স্বাধীন করতে হবে। ১৭ আগস্ট
১৯৩২ সালে যে সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা (COMMUNAL AWARD) ঘোষিত হয়েছিল সেটা DOMENION
STATUS এর স্বাধীনতা ছিল। এই স্বাধীনতাকে গান্ধিজি পুনাচুক্তির মাধ্যমে গোলামিতে রূপান্তরিত
করেন। কারণ তাঁর দ্বারা চালানো স্বাধীনতার আন্দোলন সকলের জন্য স্বাধীনতার আন্দোলন ছিলনা।
শুধুমাত্র শাসক জাতির (উচ্চবর্ণীয়) দ্বারা চালানো তাদের স্বাধীনতার আন্দোলন ছিল।
বাবাসাহেব কেন উচ্চবর্ণীয়দের স্বাধীনতার আন্দোলনে সহভাগী হননিঃ-
এবার আমরা দেখি বাবাসাহেব ড. আম্বেদকরের আন্দোলন। বাবাসাহেব
আমেরিকায় শিক্ষার জন্য গিয়েছিলেন। সেখানে লালা
লাজপত রায় গিয়ে বাবাসাহেবকে বলেন, “আপনি অনেক বিদ্বান ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি। আপনার মধ্যে
সমাজের জন্য কাজ করার চেতনা আছে। তাই আপনি কংগ্রেসের সঙ্গে ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আন্দোলনে অংশ
গ্রহণ করুন।” বাবাসাহেব তাঁকে বলেন, “আমি এখানে পড়াশুনা করার জন্য এসেছি। আমাকে প্রথমে
শিক্ষা গ্রহণ করতে দিন। ভারতে গিয়ে পরে আমি এসব দেখবো।” পরবর্তিতে বাবাসাহেব ভারতে
এসে ‘বহিষ্কৃত ভারত’ পত্রিকায় নিজের প্রতিক্রিয়া
দিতে গিয়ে লেখেন, “পরতন্ত্রে ( পরের অধীন) যাদের কথা আমরা সহ্য করতে পারছিনা, স্বাধীনতার
পরে আমাদেরকে তাদের লাথি খেতে হবে।” পরতন্ত্র অর্থাৎ ইংরেজদের শাসনকালে আমরা যাদের কথা অর্থাৎ উচ্চবর্ণীয়দের কথা এখনই সহ্য
করতে পারছি না। আর এই উচ্চবর্ণীয়রা যদি স্বাধীন
হয় তাহলে তো তারা আমাদের লাথি মারবে। বাবাসাহেবের ভবিষ্যৎবাণী বর্তমানে অক্ষরে অক্ষরে
মিলে গেছে। বর্তমানে আমাদের সমাজের লোকদেরকে উচ্চবর্ণীয়দের কাছে গিয়ে টিকিট চাইতে হয়।
টিকিট যদিও পাওয়া যায় নির্বাচিত হয়ে আসার জন্যও তাদের সাহায্য নিতে হয়।
লালা লাজপত রায় ও
কংগ্রেস ইংরেজদের গোলামি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য স্বাধীনতার আন্দোলন চালিয়ে ছিলেন। বাবাসাহেব
ড. আম্বেদকর উচ্চবর্ণীয়দের গোলামি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য স্বাধীনতার আন্দোলন চালিয়ে ছিলেন।
তিলক ওবিসিদের আইন
সভায় যেতে না দেওয়ার জন্য গালি দিয়েছেন। গান্ধিজি অস্পৃশ্যদের স্বাধীনতায় রাজি নন।
তাহলে এটা প্রমাণ হয় যে, তিলক, গান্ধিজি, গোখলে, রানাডে এবং এদের কংগ্রেসের স্বাধীনতার
আন্দোলন সকলের জন্য স্বাধীনতার আন্দোলন ছিল না। তাঁরা শুধুমাত্র ইংরেজদের গোলামি থেকে
মুক্ত হওয়ার জন্য আন্দোলন চালিয়েছিলেন। আর সেটাকে সকলের স্বাধীনতার আন্দোলন বলে প্রচার
করেছেন। মূলনিবাসী মহামানবরা ব্রাহ্মণদের গোলামি
থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য যে আন্দোলন ১৮৪৮ সালে শুরু করেছিলেন সে আন্দোলন এখনও চলছে। মূলনিবাসীরা
এখনও স্বাধীন হয়নি। তারা এখনও উচ্চবর্ণীয়দের গোলাম হয়ে আছে।
বাবাসাহেবের কথায়
আবার ফিরে আসি-
বাবাসাহেব আম্বেদকর
ইংরেজদেরকে একটা প্রশ্ন করেন। সেটা হচ্ছে- আপনারা ভারতকে যে স্বাধীনতা
দিতে যাচ্ছেন সেটা দেশের স্বাধীনতা নাকি দেশের জনগণের স্বাধীনতা? দেশের স্বাধীনতা হচ্ছে
Freedom of the country আর দেশের জনগণের স্বাধীনতা হচ্ছে Freedom of the
people of the country. এর পরেও ইংরেজরা দেশকেই স্বাধীন করেছে। দেশের জনগণকে
স্বাধীণ করতে দেননি গান্ধিজি আর কংগ্রেস।
বাবাসাহেব যে উচ্চবর্ণীয়দের
স্বাধীনতার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেননি তার প্রমাণ খোদ পাঞ্জাবী গোরা ব্রাহ্মণ অরুণ শৌরি
তাঁর বই Worshipping False Gods. অর্থাৎ ‘মিথ্যা দেবতার পুজা’ নামক বইতে জানিয়েছেন।
এই বই-এ তিনি লিখেছেন,
ড. আম্বেদকর স্বাধীনতার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেননি। কিন্তু নিজেকে আম্বেদকরবাদী বলে প্রচার করা আম্বেদকরের
ভক্তরা বই লিখে জানিয়েছেন যে বাবাসাহেব স্বাধীনতার
আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। বাস্তবে অরুণ শৌরী এবং আম্বেদকরবাদীরা দুজনেই মিথ্যা কথা প্রচার
করেছেন।
অরুণ শৌরী লিখেছেন
ড. আম্বেদকর স্বাধীনতার আন্দোলনে যোগ দেননি। আসলে তাঁর লেখা দরকার ছিল ড. আম্বেদকর
উচ্চবর্ণীয়দের স্বাধীনতার আন্দোলনে যোগ দেননি। আর যে আম্বেদকরবাদীরা লিখেছেন বাবাসাহেব
স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এটাও মিথ্যা কথা। একই ব্যক্তি পরস্পর বিরোধী
দুটো আন্দোলনে কিভাবে যোগদান করতে পারেন? বাবাসাহেব নিজে মূলনিবাসী বহুজনদের জন্য স্বাধীনতার আন্দোলন
চালিয়েছিলেন। উচ্চবর্ণীয়দের গোলামি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য। তাই তিনি ব্রাহ্মণদের স্বাধীনতার
আন্দোলনে সহভাগী হননি। প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে অরুণ শৌরী বাবাসাহেবের বিরুদ্ধে কেন
একথা লিখেছেন? আর সেটা ২০০০ সালেই বা কেন? কারণ ২০০০ সালে ভারতীয় সংবিধানের স্বর্ণ
জয়ন্তীর বছর ছিল। স্বর্ণ জয়ন্তীতে লোক সংবিধার চর্চা করবে এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে
আম্বেদকরবাদী লোকেরা সংবিধানের বেশি চর্চা করেন। ৫০ বছরের পরে সংবিধান কতটা মহত্ত্বপূর্ণ
থাকবে ইত্যাদি প্রশ্নের চর্চা আম্বেদকরবাদীরা করতে পারেন। এই ধরণের চর্চা যাতে না হয়
বা কোন প্রশ্ন যাতে আম্বেদকরবাদীরা না করেন তার জন্য অরুণ শৌরী আগেভাগে বই লিখে জানালেন
যে, আপনাদের বাবাসাহেব ড. আম্বেদকর স্বাধীনতার আন্দোলনে সহভাগী ছিলেন না। কারণ, আম্বেদকরবাদীরা
প্রতিক্রিয়া দিতে ওস্তাদ। তখন তাঁরা লিখে জানাতে শুরু করলেন, না না বাবাসাহেব স্বাধীনতার
আন্দোলনে সহভাগী ছিলেন।
ভারতে যে স্বাধীনতার দুটো আন্দোলন চলেছে; তার
একটা হচ্ছে- উচ্চবর্ণীয়দের স্বাধীনতার আন্দোলন।
এই আন্দোলন ইংরেজদের গোলাম থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য। দ্বিতীয়টা হচ্ছে- মূলনিবাসী
মহামানবদের স্বাধীনতার আন্দোলন। এই আন্দোলন উচ্চবর্ণীয়দের গোলামি থেকে মুক্ত হওয়ার
জন্য।
বর্ণব্যবস্থা, জাতিব্যবস্থা আর অস্পৃশ্যতা থেকে
মুক্ত হওয়ার জন্য আমাদের মূলনিবাসী মহামণীষীরা স্বাধীনতার আন্দোলন করেছিলেন। উচ্চবর্ণীয়দের
মিথ্যা ও বিকৃত ইতিহাস লিখে শুধুমাত্র তাদের
স্বাধীনতার আন্দোলনের কথা তুলে ধরেছে। এটা তাদের দ্বারা বিকৃত ইতিহাসের সঙ্গে
চালাকী ছিল। তাদের লেখা ইতিহাস দেখলে বোঝা
যাবে যে, তারা সবসময় তাদের সুবিধার কথাই লিখেছে আর যাতে তাদের ক্ষতি হবে যে কথার কোন
উল্লেখই করেনি। কারণ এতে তাদেরই লাভ হয়েছে। কিন্তু মূলনিবাসী বহুজনদের এতে লাভ তো দূরের
কথা বদনাম আর ক্ষতি হয়েছে। তাই আমাদের ইতিহাস আমাদেরকেই লিখতে হবে। উচ্চবর্ণীয়দের যেটাকে
লুকিয়ে রেখেছে, আমরা সেটাকে সবার সামনে তুলে ধরব। অর্থাৎ If They hide it, We must highlight.
এতোকিছু জানার পরেও কেউ যদি প্রশ্ন করেন যে,
‘আমরা কি স্বাধীন নই? তার উত্তর – আমরা যেটুকু অধিকার আজ ভোগ করছি সেটা হরিচাঁদ ঠাকুর
ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের আন্দোলনের ফসল মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের নেতৃত্বে বাংলা থেকে
বাবাসাহেব ড. আম্বেদকরকে সংবিধান সভায় পাঠানোর জন্য। বাবাসাহেব সংবিধানে মূলনিবাসীদের
জন্য অর্থাৎ তপশিলি জাতি, তপশিলি উপজাতি ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণি আর ধর্ম পরিবর্তিত লোকদের জন্য সাংবিধানিক অধিকার দিয়েছেন।
সেই অধিকার ভোগ করে তারা নিজেদের স্বাধীন মনে করছেন। প্রকৃতপক্ষে মূলনিবাসীরা এখনো
উচ্চবর্ণীয়দের গোলাম হয়ে আছে। মানসিক
গোলাম। এই
গোলামি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মূলনিবাসী বহুজন মহামানবদের বিচারধারাকে সঙ্গে নিয়ে
প্রকৃত স্বাধীনতার আন্দোলনের বিউগল বাজাতে হবে। তার জন্য প্রত্যেক মূলনিবাসী বহুজনকে
তন মন ধন দিয়ে সহযোগীতা করতে হবে।
(তথ্য- ১. পুনাচুক্তির দুষ্পরিণাম- লেখক- বামন মেশ্রাম।
অনুবাদক- জগদীশচন্দ্র রায়।
২. স্বাধীনতার দুই আন্দোলন- লেখক- ডি. আর.
ওহোল। অনুবাদক- জগদীশচন্দ্র রায়।)
