মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ও বাবাসাহেব আম্বেদকর:
বিতর্কের আড়ালে চাপা পড়ে যাওয়া এক ঐতিহাসিক সম্পর্ক
লেখক- জগদীশচন্দ্র রায় (মূলত তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদেনটি
তুলে ধরা হয়েছে।)
সাম্প্রতিক সময়ে মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল এবং বাবাসাহেব ড. ভীমরাও
আম্বেদকরের সম্পর্ক নিয়ে একটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে।
প্রশ্নটি হলো—১৯৫০ সাল থেকে ১৯৫৬ সালের ৬ ডিসেম্বর, অর্থাৎ বাবাসাহেবের মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত এই
দুই মহান নেতার মধ্যে কোনো যোগাযোগ ছিল কি না।
প্রথমেই মনে রাখা প্রয়োজন, ওই সময়ে তাঁরা কেউই কোনো সরকারি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন না। ফলে তাঁদের পারস্পরিক
যোগাযোগের সরকারি নথি বা প্রশাসনিক দলিল স্বাভাবিকভাবেই খুব কম পাওয়া যায়। তদুপরি, জীবনের সেই পর্যায়ে তাঁরা উভয়েই ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নানা সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম
করছিলেন। তাই কেবলমাত্র লিখিত যোগাযোগের অভাবকে ভিত্তি করে তাঁদের সম্পর্ক বা
পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাসের প্রতি সুবিচার নয়।
ভারতের নিপীড়িত, বঞ্চিত
ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ও ড.
আম্বেদকরের নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। আজীবন সংগ্রামের মাধ্যমে তাঁরা তফসিলি
জাতি (SC), তফসিলি জনজাতি (ST), অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি (OBC) এবং সমাজের সকল পিছিয়ে পড়া মানুষের সাংবিধানিক অধিকার
নিশ্চিত করার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে নারীর সামাজিক ও সাংবিধানিক
অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁদের অবদান ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, তাঁদের
অসামান্য অবদানকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না রেখে আজ প্রশ্ন তোলা হচ্ছে—শেষ জীবনে
তাঁরা কেন নিয়মিত যোগাযোগ রাখেননি? অনেকের কাছে মনে হচ্ছে, সচেতনভাবেই
এই প্রশ্নকে সামনে এনে দুই মহামানবের ঐতিহাসিক অবদানকে আড়াল করার চেষ্টা করা
হচ্ছে। অথচ ইতিহাসের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তাঁদের কর্ম, সংগ্রাম ও অর্জনের ভিত্তিতে; কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার ওপর নয়।
এই
প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় সদানন্দ বিশ্বাস রচিত ‘মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ, বঙ্গভঙ্গ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’ গ্রন্থে পৃষ্ঠ নং ৬ ও ৭।
গত শতকের পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিশিষ্ট সমাজতান্ত্রিক নেতা ড. রাম
মনোহর লোহিয়া দেশের নিপীড়িত ও অবহেলিত মানুষের মুক্তি এবং তাঁদের রাজনৈতিক-সামাজিক
অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই
বিষয়ে তিনি বাবাসাহেব ড. আম্বেদকরের সঙ্গে পত্রযোগে আলোচনা শুরু করেন এবং সেই
উদ্যোগ সম্পর্কে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকেও অবহিত করা হয়।
ড. লোহিয়ার স্বপ্ন ছিল, দেশের
বিভিন্ন প্রান্তে বঞ্চিত মানুষের স্বার্থে কাজ করা সংগঠন ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে
ড. আম্বেদকরের নেতৃত্বে একটি ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা। সেই লক্ষ্যকে সামনে
রেখে ১৯৫৬ সালের শেষ দিকে বিহারের পাটনায় একটি প্রস্তুতি সভার আয়োজন করা হয়।
মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে ড. আম্বেদকর সেই সভায় যোগ দিতে পারেননি। ফলে ড.
রাম মনোহর লোহিয়াই সভায় সভাপতিত্ব করেন।
এর আগেও কয়েকবার চেষ্টা করেও যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ড. আম্বেদকরের সঙ্গে সরাসরি
সাক্ষাৎ করতে পারেননি। বাবাসাহেবের ব্যস্ত কর্মসূচি ও শারীরিক অসুস্থতা সেই
সুযোগকে বারবার ব্যাহত করেছিল। তাই তিনি আশা করেছিলেন, পাটনার এই সম্মেলনেই তাঁদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হবে
এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণে তিনি প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পাবেন।
উল্লেখ্য, দেশভাগের
পর তফসিলি ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও সাংগঠনিক সম্পদ ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়।
সংগঠনের অধিকাংশ সমর্থকও পূর্ব পাকিস্তনের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলে থেকে যাওয়ায়
স্বাধীনোত্তর পশ্চিমবঙ্গে ফেডারেশনের কার্যক্রম প্রায় বিলুপ্তির মুখে পড়ে। এই জটিল
পরিস্থিতিতে সংগঠন পুনর্গঠন ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে ড. আম্বেদকরের সঙ্গে আলোচনা
যোগেন্দ্রনাথের কাছে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু নিয়তি যেন অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। হঠাৎ করেই ড. আম্বেদকরের শারীরিক
অবস্থার অবনতি ঘটে। ফলে বহুদিনের প্রত্যাশিত সেই আলোচনা আর সম্ভব হয়নি। পাটনার
কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত করে যোগেন্দ্রনাথ দ্রুত দিল্লিতে পৌঁছান তাঁর প্রিয় নেতা ও
আজীবন সংগ্রামের সহযোদ্ধার সঙ্গে দেখা করার জন্য।
দিল্লিতে গিয়ে ড. আম্বেদকরের শারীরিক অবস্থা দেখে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত হন।
তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, সময় আর
খুব বেশি নেই। আর সত্যিই, অল্প
কয়েকদিনের মধ্যেই ১৯৫৬ সালের ৬ ডিসেম্বরের গভীর রাতে ঘুমের মধ্যেই চিরবিদায় নেন
ভারতবর্ষের নিপীড়িত মানুষের মুক্তির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কণ্ঠস্বর, বাবাসাহেব ড. ভীমরাও আম্বেদকর।
এই সংবাদে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ - দিনের পর দিন
কাটলো তাঁর বিনিদ্র রাত। কলকাতার ৬৪ নম্বর সুলতান আলম রোডে তাঁর অনুগামীরা
তাঁকে সভাপতিত্বে রেখে একটি শোকসভার আয়োজন করেন। কিন্তু সেই সভায় শোকাহত
যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারেননি। তাঁর কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে এসেছিল।
প্রিয় নেতা, সংগ্রামের
সহযাত্রী এবং নিপীড়িত মানুষের মুক্তির এক মহীরুহকে হারানোর বেদনা ভাষায় প্রকাশ
করার শক্তি তাঁর ছিল না।
সুতরাং, ইতিহাসের
প্রাপ্ত তথ্য থেকে স্পষ্ট যে, শেষ জীবনে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সঠিক নয়। বরং নানা
প্রতিকূলতা সত্ত্বেও যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ড. আম্বেদকরের সঙ্গে যোগাযোগ ও পরামর্শের
চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের সম্পর্কের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হলে বিচ্ছিন্ন
বিতর্ক নয়, বরং নিপীড়িত মানুষের
অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁদের আজীবন সংগ্রাম ও যৌথ ঐতিহাসিক অবদানকে সামনে আনাই
অধিকতর প্রয়োজন।




0 comments:
Post a Comment