Showing posts with label Fathar of Mulnivasi. Show all posts
Showing posts with label Fathar of Mulnivasi. Show all posts

Monday, 2 February 2026

// // Leave a Comment

মূলতঃ ডাঃ গুণধর বর্মনের নেতৃত্বে বাংলায় ১৯৭২ সালের পর সংরক্ষণ নীতি চালু হয়। আপনারা কয়জনে সেটা জানেন?

 

   


  মূলতঃ ডাঃ গুণধর বর্মনের নেতৃত্বে বাংলায় ১৯৭২ সালের পর সংরক্ষণ নীতি চালু হয়। আপনারা কয়জনে সেটা জানেন?

কিভাবে সেই অসাধ্যকে তিনি সাধ্য করলেন দেখুন সেই কাহিনি। 3 February তাঁর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে আন্তরিক অভিবাদন জানাই।

(তথ্য সংগ্রহ- সমাজ বিপ্লবের অনবদ্য পথিকৃৎ - ডাঃ শীতল প্রসাদ বেরা সম্পাদিত পৃষ্ঠা ১৩-১৭)  

     ভারতীয় সংবিধানের প্রাণপুরুষ বাবাসাহেব ড. আম্বেদকর এদেশের চির অবহেলিত অস্পৃশ্য জনগোষ্ঠীকে যথাসম্ভব সত্বর শিক্ষায় ও আর্থসামাজিক স্তরে উন্নত করে সমাজে রাষ্ট্রে সর্বমানবের সমান অধিকার ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে অস্পৃশ্য শূদ্রগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা ও চাকরীতে সংরক্ষণব্যবস্থা করে গেছেন। কিন্তু সেই সংরক্ষণ নীতি ১৯৭২ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে পালিত হয়নি। ১৯৭২ খৃষ্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার স্পীকার অপূর্বলাল মজুমদার রাজ্যের মুখ্যসচিবকে ডেকে ঐ সংরক্ষণ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি (চিফ সেক্রেটারী) বলেন যে গত ২০ বৎসর ধরে (অর্থাৎ ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত) রাজ্য সরকারের কোনো বিভাগই ঐ সংরক্ষণ নীতি মানছেন না এবং যাঁরা তা মানছেন না, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত কিছু করার ক্ষমতা মুখ্যসচিব বা কোনো মন্ত্রীরই নাই। সেই আলোচনাকালে ডাঃ গুণধর বর্মন স্পীকারের পাশেই উপস্থিত ছিলেন। এখানে বিশেষ উল্লেখ্য যে মাননীয় অপূর্বলাল মজুমদার স্পীকার হওয়ার পর তাঁর শ্রদ্ধেয় শ্বশুর ডাঃ অতুলকৃষ্ণ বিশ্বাসকে বলেন যে বিধানসভায় স্পীকারের হাতে অনেক ক্ষমতা দেওয়া আছে যাতে তিনি যে কোনো মন্ত্রী, এমনকি মুখ্যমন্ত্রীর উপরেও প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। আর তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায়ের সঙ্গে স্পীকারের যথেষ্ট ঘটিষ্ঠতা ছিল।

     জামাইয়ের কথা শুনে ডাঃ অতুলকৃষ্ণ বিশ্বাস ছুটে আসেন ডাঃ গুণধর বর্মণের কাছে এবং সব কথা খুলে বলেন। পূর্বকথিত 'ছাত্রযুব সংস্থা'র দুর্দান্ত আন্দোলনকালে ডাঃ বিশ্বাস ও ডাঃ বর্মণের মধ্যে বিশেষ অন্তরঙ্গতা গড়ে উঠেছিল। তাই ডাঃ অতুলকৃষ্ণ বিশ্বাসের আবেদনে ডাঃ গুণধর বর্মণ রাজী হন স্পীকার অপূর্বলাল মজুমদারের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করতে। তারই ফলে পুরো পাঁচ (৫) বৎসরই ডাঃ গুণধর বর্মণ প্রতিদিনই স্পীকারের পাশে (বিধানসভা বন্ধ না থাকলে) একান্ত অনুগত ভক্তের মত বসে থাকতেন এবং উভয়ে আন্তরিকভাবে পরামর্শ করতেন কীভাবে সরকারের বিভিন্ন বিভাগে সাংবিধানিক সংরক্ষণ নীতিকে বাধ্যতামূলক ভাবে কার্যকরী করা যায়। বিধানসভা বন্ধ থাকলে স্পীকারের হাওড়া বেনারস রোডের বাড়ীতে ডাঃ গুণধর বর্মণকে অবিরত যেতে হতো এ বিষয়ে গভীর পরামর্শের জন্য। তাতে ঠিক হয় যে সংবিধানে বিশেষ নির্দেশ আছে 'যদি সংরক্ষণ নীতিকে দীর্ঘদিন কার্যকরী করা না হয় তবে মুখ্যমন্ত্রী এবং স্পীকার পরস্পর একমত হয়ে বিধানসভায় বিশেষ আইন পাশ করাতে পারেন ঐ সংরক্ষণকে বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকরী করার জন্য। তখন সেই আইন না মানলে যে কোনো বিভাগীয় কর্মকর্তাকে আইনগতভাবে শাস্তি দেওয়া যাবে।" মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায় এই কথায় রাজী হওয়াতে সেই আইনের খসড়া তৈরী করে চলেন ডাঃ গুণধর বর্মণ এবং স্পীকার স্বয়ং, দীর্ঘ কয়েকমাস ধরে অমানুষিক ভাবে খেটে। কিন্তু বিধানসভায় স্পীকার নিজে তো কোনো আইনের প্রস্তাবনা করতে পরেন না। সেই প্রস্তাব উত্থাপন করতে হয় বিভাগীয় মন্ত্রীর মাধ্যমে। তবে বেদনার কথা তপশিলী আদিবাসী দপ্তরের জন্য কোনো পূর্ণমন্ত্রীর ব্যবস্থা ছিল না পশ্চিমবঙ্গে। একজন 'প্রতিমন্ত্রী'র হাতেই তপশিলী কল্যাণ দপ্তরের দায়িত্ব থাকতো (বর্তমানের পূর্ণমন্ত্রী শ্রী দীনেশ ডাকুয়া পর্যন্ত)। ১৯৭২-৭৬ সালে আনন্দমোহন বিশ্বাসই ছিলেন তপশিলী দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী। স্বাভাবিকভাবে তাঁরই মাধ্যমে বিধানসভায় উক্ত আইনের প্রস্তাব তুলতে হবে। তার আগে সেই আইনের খসড়া মন্ত্রী পরিষদে বা 'ক্যাবিনেটে' আলোচিত হওয়া দরকার। কিন্তু আনন্দমোহন বিশ্বাস পূর্ণমন্ত্রী না হওয়ায় তিনি সরাসরি মন্ত্রী পরিষদে সেই খসড়া উপস্থাপিত করার অধিকার পান নি। তাঁকে চীফ সেক্রেটারীর কাছে আবেদন করতে হয় ঐ আইনের খসড়াকে কাবিনেটের আলোচনায় আনতে। নিদারুণ লজ্জা ও বেদনার কথা এই যে তদানীন্তন মুখ্যসচিব মহাশয় আনন্দমোহনের পাঠান আইনের খসড়াটিকে তার নিজের 'ড্রয়ার'-এ পুরে চাবি দিয়ে ফেলে রাখেন প্রায় ছ'মাস কাল। এ রাজ্যে প্রতিমন্ত্রীদের অবস্থা ও মর্যাদা তখন এমনিই ছিল। যে কোনো দপ্তরের একজন 'হেডক্লার্ক'-এর যে ক্ষমতা একজন প্রতিমন্ত্রীর সেই ক্ষমতাটুকুও ছিল না। সুতরাং আনন্দমোহন বিশ্বাসকে তোয়াক্কা করবে কেন মুখ্যসচিব মহাশয়?

     এখানে আবার উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ডাঃ গুণধর বর্মনের চেষ্টাতেই আনন্দমোহন ঐ প্রতিমন্ত্রীর পদ পেয়েছিল (সে কথা কী আর আনন্দমোহন বিশ্বাসের এখন মনে আছে?) তাই গুণধর বর্মন বিশেষ খোঁজ নিয়ে আনন্দমোহনের দূরাবস্থার কথা জানতে পারেন কয়েক মাস পরে। সমস্যা সমাধানের জন্য ডাঃ গুণধর বর্মন স্পীকার মহাশয়কে সব কথা বলেন এবং জরুরী তলব পাঠিয়ে চীফ সেক্রেটারীকে স্পীকারের ঘরে ডেকে পাঠান। স্পীকারের হুকুমে পরের দিনই আইনের খসড়া ক্যাবিনেটে 'পুট' করা হয় এবং আনন্দমোহনের হাতে দেওয়া হয় বিধানসভায় আলোচনার জন্য। বিধানসভায় তখন তপশিলী ও আদিবাসী এম.এল.এ. সংখ্যা ছিল ৮২ জন। তাঁদের প্রত্যেকের কাছে ডাঃ গুণধর বর্মন বারে বারে অনুরোধ করেছেন ঐ আইনের খসড়া বিষয়ে বিধানসভায় প্রশ্নোত্তরকালে স্পীকারের কাছে প্রশ্ন করতে যে, কেন দেরী হচ্ছে ঐ আইনের খসড়া আলোচনা করতে। কিন্তু হতভাগ্য তপশিলী এম.এল.এ.-দের কারোর সাহস হয়নি ঐ প্রশ্ন তুলতে। এ দেশের তপশিলী 'এম.এল.এ.'গণ এমনি মেরুদন্ডহীন জীব!! তাঁরা সব বিভিন্ন দলের 'তল্পীবাহক' ছাড়া আর কোনো যোগ্যতার পরিচয় আজও দিতে পারছেন না। এতে স্পীকার অপূর্বলাল মজুমদার পড়েন মহাফাঁপরে। ডাঃ বর্মণের সঙ্গে চলে বেদনার্ত আলোচনা। দুজনে মিলে স্থির করেন এই আইন 'গিলোটিনে' পাশ করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নাই। সাধারণভাবে ঐ আইন নিয়ে পূর্ণ আলোচনা করলে উচ্চবর্ণের সমস্ত এম.এল.এ. সেইআইনের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা। ফলে সেই আইন আর কার্যকারী রূপ পাবে না। এমন অবস্থায় স্পীকারের হাতে একটি বিশেষ ক্ষমতা থাকে। স্পীকার প্রয়োজন মনে করলে কিছু আত্যবশ্যকীয় আইনকে বিধানসভায় পূর্ণ আলোচনা ছাড়াই বিশেষ কায়দায় তা পাশ করিয়ে দিতে পারেন। সেটি হচ্ছে বিধানসভা প্রতি বৎসর কয়েকটি নির্দিষ্ট "সেশন" (Session)-এ ভাগ করে আহৃত হয়, যেমন "বাজেট সেশন', 'অটাম সেশন' (পূজার আগে) প্রভৃতি। এর উপর কিছু জরুরী সেশনও থাকে। প্রত্যেক সেশনে কী কী কাজ হবে তার তালিকা সেই "সেশন" আরম্ভের আগেই প্রত্যেক বিধায়ককে জানিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই তালিকার সব হেডিং ঐ সেসনে পুরোপুরি আলোচননা সম্ভব না হতেও পারে। তারমধ্যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় ঐ সেশনের শেষ দিনে একেবারে শেষের ঘন্টায় স্পীকার মহাশয় অতিদ্রুত সেই বিষয়ের 'হেডিং-টা পাঠ করে উপস্থিত বিধায়ক ও মন্ত্রীমন্ডলীকে শুনিয়ে দেন। আগে থেকে ঠিক করা থাকে মন্ত্রীমন্ডলী সেই আইন বা বিল (Bill) -টাকে অনুমোদন করবেই। হেডিং পাঠের সঙ্গে সঙ্গে তাই হাত তুলেই মন্ত্রীমন্ডলী স্পীকারের আনা আইনটা সমর্থন করেন। আর সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত বিধায়কগণ কোনোকিছু না বুঝেই 'আয়াস' অর্থাৎ 'ইয়েশ' (Yes) বলে চিৎকার করেই সেই 'বিল' বা আইনের সমর্থন করেন, আধ মিনিটের মধ্যেই বিলটা পাশ হয়ে যায়। এইভাবে ঐ সেশনের শেষ ৫/৭ মিনিটে ৮/১০টি অত্যাবশ্যক 'বিল' আইন হিসেবে গৃহীত হয়। একে বলে 'গিলোটিন' (Guillotine) প্রথা। অর্থাৎ পূর্ণ আলোচনা ছাড়াই শেষদিনের বিধানসভায় কিছু 'বিল' অতি সংক্ষেপে গৃহীত হয় শুধু ধ্বনি ভোটে। এ রাজ্যের আদিবাসী ও তপশিলীদের জন্য 'সংরক্ষণ আইন' (সিডিউল্ড কাস্টস্ রিজার্ভেশন এ্যাক্ট) এই 'গিলোটিন' প্রথাতেই পাশ হয়েছে কেবলমাত্র অপূর্বলাল মজুমদারের দয়াতে এবং ডাঃ গুণধর বর্মনের প্রাণপাত প্রচেষ্টায়। একথা কয়জন শিক্ষিত ব্যক্তি জানেন? বিধানসভায় ঐভাবে তপশিলীদের শিক্ষা ও চাকরীতে 'সংরক্ষণ আইন' পাশ করিয়ে স্পীকার তাঁর বিধানসভাস্থ নিজস্ব ঘরে এসে প্রায় কেঁদে ফেলেই বলেছিলেন "ডাঃ বর্মনের অমানুষিক পরিশ্রমে যে আইন পাশ করানোহল তাকে কিভবিষ্যতে কেউ মনে রাখবে? তাতে ডাঃ বর্মন বলিষ্ঠ ভাবেই বলেছিলেন "যতদিন বেঁচে থাকবো অন্তঃত আমি একাই আপনার এই মহান অবদানের কথা প্রকাশ্যে সবার কাছে ঘোষণা করে যাবো।" গত ২৩শে জানুয়ারী সোনারপুরের সভায় রুদ্ধ কণ্ঠে ডাঃ বর্মণ সেই স্মৃতিচারণা করেন।

                                         ______________

Read More
// // Leave a Comment

সমাজ বিপ্লবের অনবদ্য পথিকৃৎ ডাঃ গুণধর বর্মন। সমাজ বিপ্লবের অনবদ্য পথিকৃৎ - ডাঃ শীতল প্রসাদ বেরা সম্পাদিত

 


সমাজ বিপ্লবের অনবদ্য পথিকৃৎ  ডাঃ গুণধর বর্মন

  ৩ ফেব্রুয়ারী তাঁর জন্ম শতবর্ষ উপলক্ষ্যে এই আলেক্ষ্য তুলে ধরা হল। তাঁকে আন্তরিক অভিবাদন জানাই।

     রোগের চিকিৎসার জন্য যে ডাক্তার দরকার হয়, গুণধর বর্মন সেই চিকিৎসাবিদ্যায় এম.বি.বি.সে. পাশ করেছেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে ১৯৫৩ সালে। সেই কলেজেই স্ত্রীরোগ  বিভাগে ইডেন হাসপাতালে দেড় বছর ‘হাউসস্টাফ হিসেবে কাজ করেছেন। তারপরে শিশু বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য কলকাতা ইন্‌স্টিটিউট অফ্‌ চাইল্ড হেস্থ্‌ থেকে ডি.সি. এইচ. পাশ করে সেখানে একবছর কাজ করেছেন। শেষে কলকাতা স্কুল অফ্‌ ট্রপিক্যাল মেডিসিন এবং যুক্তভাবে অল ইন্ডিয়া ইন্‌স্টিটিউট অফ হাইজিন থেকে ডি.টিএম.  এণ্ড এইচ পাশ করেছেন। তারপর শিশু চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথির বৈশিষ্ট্য জানার জন্য কলকাতার বিখ্যাত ‘ক্যাল্কাটা হোমিওপ্যাথি মেডিক্যাল কলেজে’ ভর্তি হয়ে হোমিওপ্যাথি পদ্ধতিতে উপযুক্ত জ্ঞানলাভ করেছেন। ফলে সাধারনভাবে ডাঃ গুণধর বর্মন একজন যথেষ্ট পারদর্শী বিশেষজ্ঞ চিকিতসক।

    সমাজের অতি দীন অবস্থা থেকে স্বীয় প্রতিভা ও একনিষ্ঠ সাধনায় দেশ ও সমাজের অতি উচ্চস্থানে উপনীত হয়েছেন ডাঃ গুণধর বর্মন। একান্ত দরিদ্র অস্পৃশ্য মৎস্যজীবী রাজবংশী পরিবারে ১৯২৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারী জন্মগ্রহণ করে নানা অসুবিধার মধ্যে দিয়েই প্রাইমারী স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা পর্যন্ত অভিভক্ত মেদিনীপুর জেলার প্রত্যেকটি পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করে অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন।

     চিকিৎসাবিদ্যায় ডাঃ বর্মনের দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস এতই প্রবল যে নিজের পুত্রকন্যা, স্ত্রী ও পরিবারের কারোর চিকিৎসায় অন্য কোনো ডাক্তারের সাহায়্য নেন না, বিশেষ কিছু সার্জিক্যাল বিষয় ছাড়া। তিনি জোর দিয়েই বলেন, নিজের ছেলেমেয়ের চিকিৎসায় আত্মবিশ্বাস না থাকলে পরের ছেলেমেয়ের চিকিৎসা করতে যাওয়া উচিত নয়। এই কথা এ দেশের তথা পৃথিবীর অন্য কোনো চিকিৎসক দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারেন না।

    তার চেয়েও বড় কথা যে অবহেলিত দীনহীন সমাজে ডাঃ বর্মন জন্মেছেন সেই হতভাগ্য দরিদ্র লাঞ্ছিত সমাজের বিজ্ঞানসম্মত উন্নতির কাজে তিনি সারাজীবন, এখন অশীতিপর বৃদ্ধ বয়সেও একান্তভাবে নিজেকে উৎসর্গিত করে রেখেছেন। সেই অস্পৃশ্য সমাজের তিনি একান্তই আপনজন হিসেবে পরিচয় দেন, নিজের অর্জিত জ্ঞান-গরিমা-আত্মর্যাদার মোহ ভুলে – যা এ দেশে দেখাই যায় না।

    ভারতে জন্মগত জাতিভেদের ভয়াবহতা দূরীকরণের জন্য ডাঃ বর্মন তাঁর সর্বস্ব পণ করেই চলেছেন। এই ধরণের মণোবৃত্তি এবং মানুষ একান্তই বিরল। লব্ধপ্রতিষ্ঠ চিকিৎসক হিসেবে পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় যথেষ্ট সুনামের সঙ্গে ‘প্র্যাক্টিস’ করেও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর ব্যক্তিগত সঞ্চয় বলে কিছু ছিল না। নিজের ঘরবাড়িও নেই। জরাজীর্ণ একটি ভাঙা বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকতেন। যা আয় করতেন, সবই সমাজের জন্য ব্যয় করতেন। তাতে নিজ পরিবারের দৈনন্দিন বাজার খরচের জন্য অনেকদিনই তাঁকে বিব্রত হতে হত। সমাজে থেকেই সাধারণ মানুষের সেবায় এমন সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর নজির খুঁজে পাওয়া দায়!

  ডাঃ বর্মনের বিশেষ বক্তব্য ব্যক্তিগত রোগের জন্য চিকিৎসকের অভাব নেই। কিন্তু ব্রাহ্মণ্যবাদী ধারায় সুদীর্ঘকাল ধরে যে ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধির প্রকোপ এ দেশকে একান্তই পঙ্গু করে চলেছে সেই মারাত্মক রোগের চিকিৎসায় ডাঃ বর্মন নিজেকে নিয়োজিত করেছেন; নিজের স্ত্রী-পুত্রকণ্যার কথা না ভেবেই। এই দিক থেকে ডাঃ বর্মন যথার্থই উন্নতমান পারদর্শী সমাজবিজ্ঞানী-চিকিৎসক। এই কাজে সারাদেশ জুড়েই তাঁর নাম। তাঁর এই মহান কীর্তি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

     দীর্ঘ বার বছর ধরে (১৯৭৫-১৯৮৭) ‘বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ’-এর শীর্ষ পরিচালক নেতা হিসাবে কাজ করে ডাঃ বর্মন ভারতের প্রায় সমস্ত বিজ্ঞানীর প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে এসেছেন। দেশের প্রয়োজন ভিত্তিক বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে লব্ধ প্রতিষ্ঠ বিজ্ঞানীদের ডেকে তাঁদের মতামত নিয়ে আলোচনা, সেমিনার করে তার সুব্যবস্থার উপায় নির্ধারণ করেছেন- যা আগে বিজ্ঞান পরিষদে হতো না। ফলে দেশ সমাজ, জগৎ ও জীবন সম্পর্কে বিবিধ সমস্যার অনুসন্ধান ও তার বিজ্ঞানসম্মত প্রতিকারের কাজে দেশের উচ্চ চিন্তাবিদ বিজ্ঞানী এবং নেতৃবৃন্দকে সক্রিয়ভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা ডাঃ বর্মন করেছে সসাধারণভাবে। এর আগে বিজ্ঞান পরষদের মতো উচ্চ চিন্তা-চেতনার সংগঠনে এদেশের কোনো নম্নবর্গের উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিও বিশেষ স্থান বা সমাদর পাননি। গুণধর বর্মনই প্রথম অধঃপতিত অস্পৃশ্য সমাজ থেকে দেশের উচ্চবর্ণের উচ্চশিক্ষিত পণ্ডিত ব্যক্তিদের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন এবং সঙ্গে নিম্নবর্ণের কিছুজনকেও সেই কাজে নিয়ে চলেন। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রে ডাঃ বর্মন নিজের জন্মগত জাতি পরিচয় বিন্দুমাত্র গোপন করেননি। তার ফলও কিছুটা জটিল হয়েছিল। একসময় পরিষদের উচ্চবর্ণের অধ্যাপক নেতৃবৃন্দের এক অংশ ডাঃ বর্মনের কাজকর্মে অসন্তুষ্ট হয়ে তাঁড় বিরুদ্ধে অহেতুক কুৎসা রটনায় নামেন (মূলত তাঁদের অবৈজ্ঞানীক জীবনধারা ও কাজকর্মের সমালোচনার জন্যই)। তাতে অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে কলকাতাসহ দেশের উচ্চশিক্ষিত বুদ্ধিজীবী মহল পরিষ্কার দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। এক অংশ যেমন ডাঃ বর্মনের বিরুদ্ধে, অন্য অংশ তেমনি সক্রিয়ভাবে ডাঃ বর্মনের পক্ষে বাস্তব আন্দোলনে নামেন। কোনো একক ব্যক্তিকে নিয়ে উচ্চ চিন্তবিদ মহলে এমন ঘটনা আর কখনো ঘটেনি। তবে শেষ পর্যন্ত গুণধর বর্মনই জয়ী হয়েছেন। তাঁর বিশুদ্ধ বিজ্ঞান মানসিকতার জন্য।

    ডাঃ বর্মনের একটি বিশেষ পরিচয়, তিনি আজীবন একনিষ্টভাবে বাবাসাহেব ড. আম্বেদকরের অনুসারী এবং তাঁরিউ নির্দেশিত পথ ও মতবাদের বিলিষ্ট প্রচারক। বাংলাভাষায় বাবাসাহেব ড. আম্বেদকরের প্রথম জীবনীকার হিসেবে ডাঃ গুণধর বর্মনই সুপ্রসিদ্ধ।

    এইভাবে সারাজীবন তিনি যেসব অসাধারণ কাজ করেছেন তার প্রতি নগণ্য অংশই এই আলোচনায় তুলে ধরা হয়েছে। (তথ্য সংগ্রহ- সমাজ বিপ্লবের অনবদ্য পথিকৃৎ - ডাঃ শীতল প্রসাদ বেরা সম্পাদিত)  

Read More