Saturday, 16 April 2022

// // Leave a Comment

সিন্ধু থেকে হিন্দু, না হিন্দু থেকে সিন্ধু? অনুবাদক- জগদীশচন্দ্র রায়

 




সিন্ধু থেকে হিন্দু, না হিন্দু থেকে সিন্ধু

মূল লেখক- ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ সিং। 

(হিন্দি বই -ইতিহাস কা মুয়ায়না)

অনুবাদক- জগদীশচন্দ্র রায় 

                                                    (বাংলা বই- ইতিহাসের দর্পণ)

     ইতিহাসের পাতায় পড়ানো হয়, সিন্ধু থেকে হিন্দু হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত আমার লেখা বিষয়ঃ হিন্দু (HINDU)-তে পাবেন।https://roymulnivasi.blogspot.com/2014/07/hindu.html

আসুন তাহলে দেখে নিই আন্তর্জাতিক ভাষাবিদ কী লিখেছেন।

     ভারতে মূলনিবাসীদের আন্দোলনের প্রাচীন স্রোতধারা হচ্ছে ভাষাগত ধারনা। এই ধরনের বিজ্ঞান সম্মত ও সঠিক তথ্যের উপর নির্ভর করা ধারনাকে আর্যবাদী ঐতিহাসিক, ভাষাতত্ত্ববিদ এবং পুরাতত্ত্ববিদরা এই জন্যই একে তছ-নছ করছে, তাকি মূলনিবাসীদের অস্তিত্ত্বের স্বীকৃতি মূল থেকে নষ্ট হয়ে যায়। না থাকবে বাঁশ, না বাজবে বাঁশুরী।    

                            বৈদিক যুগ চকাচোধ কা মারা।  

ক্যা জানে ইতিহাস বেচারা?

বৈদিক যুগ চকচক করছে।

বাস্তবতা সম্পর্কে কী জানে ‘ইতিহাস’ বেচারা।।

আমরা বৈদিক যুগের ইতিহাসকেই চকচকে দেখতে পাই। কিন্তু বাস্তব ইতিহাস সেখানে লুপ্ত।

সুদীর্ঘকাল ধরে অজ্ঞানতার কারাগারে বন্দি থাকা চেতনা, লক্ষবার বোঝানোর পরও জাগরণের দৃষ্টিকোণ উন্মিলিত হচ্ছে না যে, বেদের উত্থান ঘটেছে বৌদ্ধ ধম্মের আবির্ভাবের পর। 

     বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ওয়েবলেন (Veblen) ১৯ শতকের শেষ দিকে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “The Theory of Leisure classes” এর প্রথম প্রাগ্রাফে ভারতকে “ব্রাহ্মণ ভারত” বলে উল্লেখ করেছেন।  

     “সিন্ধু” সংস্কৃত শব্দ আর সংস্কৃত, সংস্কার করা ভাষা। আপনি বলুন সংস্কৃতে “সিন্ধু” শব্দের জন্য কোন শব্দের সংস্কার করা হয়েছে? এর স্পষ্ট উত্তর হচ্ছে, সংস্কৃতে “হিন্দু” শব্দের সংস্কার করে “সিন্ধু” বানানো হয়েছে। 

     ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজের প্রমাণের আধারে বলা যায়, “হিন্দু” হচ্ছে প্রাচীন শব্দ। “সিন্ধু” প্রাচীন শব্দ নয়। হিন্দুর প্রাচীনতম উল্লেখ খৃষ্টপূর্ব ৫০০ বছর আগের পারস্য রাজা দারা মহানের  ঐতিহাসিক দলিলে পাওয়া যায়। কিন্তু “সিন্ধু” শব্দ প্রাচীন দলিলের মাথা থেকেই লুপ্ত হয়েগেছে।

    অবশেষে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় যে, হিন্দুর সংস্কারিত বা মার্জিত রূপ  সংস্কৃতে সিন্ধু। সেই জন্য হিন্দু থেকে সিন্ধুর বিকাশ হয়েছে। সিন্ধু থেকে হিন্দুর বিকাশ হয়নি। আপনারা উল্টা পড়বেন না। পড়াবেন না।   

    ঋকবেদের প্রধান নদী সিন্ধু। এই গ্রন্থে এই নদীর বার বার উল্লেখ আছে।

    ঋকবেদকে প্রাচীন বলার জন্যই বলা হয় সিন্ধু থেকে হিন্দুর বিকাশ হয়েছে।

    যদি কেউ বলে যে, হিন্দু থেকে সিন্ধুর বিকাশ হয়েছে; তাহলে তো ঋকবেদ অনেক পরের প্রমাণিত হয়ে যাবে। সেজন্য বেদবাদী লোকেরা এই কথার বিরোধিতা করে।  

    ড. বচ্চন সিংহ লিখেছেন যে, আশ্চর্যের কিছু নেই, আর্যরা হিন্দুকে সিন্ধু করে দিয়েছে।   

    আশ্চর্য এ জন্যও নয় যে, ‘সিন্ধু’ গুপ্তযুগের পূর্বে কোনো শিলালিপির রেকর্ডে পাওয়াই যায় না। 

    এখন আপনি ঋকবেদের সময় ঠিক করে নিন।

আর্য ভাষার ১৫০০ বছরের ইতিহাসে পালি, প্রাকৃত এবং অপভ্রংশ সংস্কৃতের তৎসম শব্দে সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত। যদিও আধুনিক আর্য ভাষাতে সংস্কৃতের তৎসম শব্দ প্রচুর পরিণামে পাওয়া যায়।     

    যদি আপনার ভাষার ইতিহাস সঠিক হয়, তবে সংস্কৃত শব্দগুলি বেশিরভাগ পালিতে, তার থেকে কম প্রাকৃতে, তার থেকে কম অপভ্রংশে এবং সব থেকে কম আধুনিক ভাষায় হওয়া উচিত ছিল।

    ‘হিনহু’ থেকে ‘হিন্দু’ আর হিন্দু থেকে ‘সিন্ধু’র বিকাশ হয়েছে।

    সাধারণত উন্নয়ন হচ্ছে পৃথিবীর প্রতিটি ক্ষেত্রে-এমনকি ভাষার ক্ষেত্রেও। প্রাণী জগতের মতোই ধীরে ধীরে বিবর্তন হয়েছে- এককোষী (প্রোটোজোয়া বা অ্যামিবা) সাধারণ কোষ থেকে বহুকোষী জীবে।   

    ডারউইনের তত্ব নিয়ে ভাষা চলবে, না কি কলিযুগের তত্ত্বকে নিয়ে চলবে? ভাষাবিদরা কলিযুগের তত্ত্বে আটকে পড়ে বলেছেন যে সত্যযুগের মতো সংস্কৃত উত্তম এবং কলিযুগের মতো অপভ্রংশও কলুষিত, তাই তার পতন হয়েছে।  সারা বিশ্বে ভাষা এগিয়ে চলেছে, কিন্তু জানি না কীভাবে ভারতে সংস্কৃতের পর অবক্ষয়িত (অপভ্রংশ) ভাষার যুগ এল? অপভ্রংশ হল ধর্মক্ষেত্রের শব্দাবলী আর সংস্কৃতকে একটি প্রাচীন ভাষা হিসেবে প্রমাণ করার জন্য এটা একটা হাতিয়ার। অপভ্রংশের প্রথম ব্যবহারকারী হলেন পতঞ্জলির মতো মানুষ। তাই হিন্দুকে সিন্ধুর অপভ্রংশ বলা হচ্ছে উল্টো পথে।       

    সোজা পথ হচ্ছে ‘হিন্দু’র বিকাশ হচ্ছে সিন্ধু। এটি ধ্বনিতত্ত্ব (ফোনেটিক্স) থেকে বোঝা যায়। মানুষের বাকযন্ত্র সুদীর্ঘকাল পরে ধ্বনির সঠিক উচ্চারণ করার জন্য অভ্যস্ত হয়ে গেছে। ধ্বনির সঠিক উচ্চারণের জন্য জিহ্বা হয়তো হাজার বছর ধরে সঠিক স্থানকে (তালু, মুর্ধা ইত্যাদি) স্পর্শ করার জন্য ঘুরে বেড়িয়েছে।    

     “স” (সিন্ধু) শুধুমাত্র প্রশিক্ষিত জিহ্বা দ্বারা উচ্চারিত হতে পারে, যেখানে “হ” (হিন্দু) উচ্চারণে জিহ্বার প্রয়োজন নেই। “হ” সরল ধ্বনি। সেজন্য পুরানো ভাবনা বাচক শব্দে প্রায়ই “হ” থাকে। যেমন- আহ, ওহ, আহা, হাই, হা-হা, হু ইত্যাদি। যদি জিহ্বার প্রশিক্ষণকে শব্দ বিকাশের ভিত্তি  হিসাবে বিবেচনা করা হয়, তবে প্রাকৃত শব্দ হিনহু থেকে হিন্দু এবং হিন্দু থেকে সিন্ধুতে বিবর্তিত হবে।

    এটি শিশুদের মধ্যে শব্দ বিকাশের প্রক্রিয়া থেকে বোঝা যায়। শিশুরা প্রথমে সহজ শব্দ এবং পরে জটিল শব্দ শেখে।

    শিশুদের প্রথমে ঠোঁট দিয়ে বলা শব্দগুলো শেখানো হয়। যেমন- মা, মামা, পাপা, বাবা ইত্যাদি। তাকে ঋগ্বেদের স্তোত্র শেখালে সে বলতে পারবে না। সে ধীরে ধীরে জটিল শব্দ উচ্চারণ করতে শিখবে। একইভাবে আদিম সমাজের একজন মানুষ প্রথমে হিনহু কথা বলবে, তারপর সে হিন্দু বলবে এবং তারপর সে সিন্ধু বলবে।  ভাষার উৎপত্তির স্বর-তত্ত্ব ইচ্ছা মতো তৈরি হয়নি, একটা নিয়মের মধ্য দিয়ে আসতে হয়েছে।  

   এটাকে ডারউইনের বিবর্তনবাদ থেকেও বুঝতে পারা যায়। মূল স্বরবর্ণ (অ, ই, উ) সরল কোষযুক্ত। ক, ত, প -এর থেকে বেশি কোষযুক্ত। ঘ, ধ, ভ বহুকোষী। ঋ, ক্ষ, জ্ঞ জটিল কোষের। ভাষায় ধ্বনির বিকাশ ঘটেছে সরল কোষ থেকে জটিল কোষে। 

    প্রাকৃত শব্দ হিনহু যদি জীবের বিকাশের মতো কম কোষযুক্ত হয়, তবে হিনহু তার চেয়ে বেশি কোষযুক্ত এবং সিন্ধু তার চেয়ে জটিল কোষযুক্ত শব্দ। হিনহুর পূর্বে সরল কোষীয় শব্দ থেকে থাকতেও পারে, যেটা আমরা জানি না।

    ‘হিন্দু’ একটি সাধারণ কোষযুক্ত শব্দ, এটাকে এভাবে ভাবুন। ‘হিন্দু’ একটি বহুকোষী শব্দ আর ‘সিন্ধু’ একটি জটিল কোষযুক্ত শব্দ।

    কোষ হল জীববিজ্ঞানের কোষ।

    শব্দগুলো সরল কোষ থেকে জটিল কোষে পরিভ্রমণ করেছে।

    তাই হিনহু থেকে হিন্দু এবং হিন্দু থেকে সিন্ধু বিবর্তিত হয়েছে।

    ‘স’-এর উচ্চারণ শুধুমাত্র প্রশিক্ষিত জিহ্বা দ্বারা করা যায়, কিন্তু ‘হ’-এর উচ্চারণে বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয় না।

    তাই আবেগপূর্ণ অনুভূতির শব্দে ‘হ’ প্রায়ই থাকে, যেমন -আহ, ওহ, আহা, হা-হা, হু ইত্যাদি।

    জিহ্বাকে যদি শব্দের বিকাশের সাক্ষী ধরা হয়, তবে ‘হিন্দ’ থেকে ‘সিন্ধ’-এর বিকাশ সম্ভব। ‘সিন্ধ’ থেকে ‘হিন্দ’ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। 

    অবশেষে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় যে, ‘হিন্দ’ থেকে ‘সিন্ধ’ গঠিত হয়েছিল। ‘সিন্ধ’ থেকে ‘হিন্দ’ সৃষ্টি হয়নি। 

আপনি যদি একবার মিথ্যা বলে দেন, তাকে প্রমাণ করার জন্য অনেকবার মিথ্যা বলতে হবে।

    আপনি একবার মিথ্যা বলেছেন যে সংস্কৃত ভারতের প্রাচীনতম ভাষা। এখন এটা প্রমাণ করার জন্য আপনি আরেকটি মিথ্যা বলছেন যে, কোন ভাষা জটিলতা থেকে সরলতার দিকে যায়। কারণ সংস্কৃত একটি জটিল ভাষা এবং আপনি বলেছেন যে এটি প্রাচীনতম ভাষা।

    প্রাচীনকালের সমাজ ছিল সরল আর সরল সমাজের ভাষা সরল হয়। মহাশয়, আপনিতো প্রাচীনকালের সরল সমাজের ভাষাকে জটিল বলে বর্ণনা করছেন।

 

 

Read More

Friday, 15 April 2022

// // Leave a Comment

জাতব্যবস্থা থাকার ফলে হিন্দু জীবন এক এবং হিন্দুরা একজাতি, এই চেতনাবোধ গড়ে ওঠেনি।

 

 


জাতব্যবস্থা থাকার ফলে হিন্দু জীবন এক এবং হিন্দুরা একজাতি,

এই চেতনাবোধ গড়ে ওঠেনি।

ড. বাবাসাহেব আম্বেদকর (Annihilation of Caste)

জাতব্যবস্থার ফলে অর্থনৈতিক দক্ষতা হতে পারেনা। জাতিপ্রথা জাতির (Race) উন্নতি করতে পারেনি আর করতে  পারবেও না। তবে এর ফলে একটা বিষয় অবশ্যই হয়েছে সেটা হচ্ছে যে, এতে হিন্দু সমাজ সম্পূর্ণভাবে শৃঙ্খলা বিহীন এবং হতাশা গ্রস্থ হয়েছে।

 সর্বপ্রথম এই চরম  সত্যকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, হিন্দু সমাজ একটি পৌরাণিক কাহিনি। হিন্দু নামটা একটা বিদেশী নাম। ‘হিন্দু’ শব্দটা (অক্রমণকারী) মুসলমানদের দেওয়া নাম। স্থানীয় অধিবাসী এবং মুসলমানদের মধ্যে পৃথকতা বোঝানোর জন্য তারা স্থানীয় অধিবাসীদের হিন্দু নামে অভিহিত করেছিল। ভারতে মুসলমানদের আক্রমণের পূর্বে সংস্কৃত ভাষায় রচিত কোনো গ্রন্থে ‘হিন্দু’ শব্দটি পাওয়া যায়না। ভারতে মুসলিম আক্রমণের পূর্বেকার সময়ে সংস্কৃত ভাষার লেখকদের ‘নেশন’ (জাতি) সম্বন্ধে কোনো ধারণা ছিলনা। তারা ভারতীয় অধিবাসীদের একটা সাধারণ নামকরণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন নি। তাই হিন্দু সমাজের বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। এটা শুধু জাতিগুলির একটা সমষ্টিগত নাম। (The first and foremost thing that must be recognized is that Hindu Society is a myth. The name Hindu is itself a foreign name. It was given by the Mohammedans to the natives for the purpose of distinguishing themselves. It does not occur in any Sanskrit work prior to the Mohammedan invasion. They did not feel the necessity of a common name because they had no conception of their having constituted a community. Hindu society as such does not exist. It is only a collection of castes.)

    প্রত্যেক জাতির লোক তাদের জাত (caste) সম্বন্ধে খুব সজাগ। প্রত্যেক জাতকে বাঁচিয়ে রাখাই প্রত্যেকে জাতের মানুষের একমাত্র লক্ষ্য। তাই জাতগুলি মিলে মিশে একটা সংগঠন তৈরি  করতে পারেনা। কোনো জাত (caste) এটা অনুভব করেনা যে, সে অন্য জাতির সঙ্গে জুড়ে আছে। এটা শুধু অনুভব করে যখন হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে দাঙ্গা হয়। বাকি সময় নয়। বাকিসময় এক জাতের লোক অন্য জাতের লোক থেকে সব সময় পৃথক হয়ে চলার চেষ্টা করে। প্রত্যেক জাতের লোকেরা নিজেদের জাতের মধ্যেই খাওয়া-দাওয়া ও বিবাহ সম্বন্ধ করে। একমনকি প্রত্যেক জাতের লোকেরা তাদের আলাদা পরিচয়  দেখানোর জন্য আলাদা আলাদা পোষাক নির্দিষ্ট করে। এছাড়া অন্য কারণ কি হতে পারে যে জন্য ভারতের নর-নারী অসংখ্য ধরনের পোষাক পরিধান করে? আর এর ফলে পর্যটকরাও সমস্যায় পড়ে যায়। বস্তুতঃ প্রত্যেক  আদর্শ হিন্দু ইঁদুরের মতো নিজের গর্তের মধ্যেই থাকে, আর অন্যের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতে চায়না।

    হিন্দুদের মধ্যে চেতনাবোধের অভাব আছে। যাকে সমাজ বিজ্ঞানীদের ভাষায় সমচেতনাবোধ বলা হয়। তাদের মধ্যে চেতনাবোধ সব শ্রেণির সঙ্গে নেই। প্রত্যেক হিন্দুর মধ্যে যে চেতনাবোধ পাওয়া যায়, সেটা তাদের নিজের জাতের (caste) চেতনাবোধ। হিন্দু চেতনাবোধ না থাকায় হিন্দুরা একটি সমাজ বা একটি রাষ্ট্র (nation) গঠন করতে পারেনি। এমন অনেক স্বদেশপ্রেমী ভারতীয় আছেন, যারা একথা স্বীকার করতে চান না যে, ভারতীয়রা একটি রাষ্ট্র নয়; অথবা তারা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের এক অব্যবস্থিত সমূহ। এইসব দেশপ্রেমিক ভারতীয়রা জোর দিয়ে বলেন যে, আপাততঃ দৃষ্টিতে আলাদা-আলাদা দেখা গেলেও আমাদের দেশের জনগণের  মধ্যে একটা মৌলিক একতা আছে; যেটা হিন্দুদের বিশেষ লক্ষণ। কারণ, তাদের আচার-ব্যবহার, বিশ্বাস ও চিন্তাধারার মধ্যে অনেক সাদৃশ্য আছে। যেটা ভারতের সর্বত্র সৃষ্টিগোচর হয়। তাদের আচার-ব্যবহার বিশ্বাস ও চিন্তাধারার সাদৃশ্যতায় কোনো সন্দেহ করা যায়না। কিন্তু তাই বলে কেউ এ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না যে, হিন্দুরা সকলে মিলে একটা সমাজ গঠন করেছে। একটি সমাজ গঠন করতে যে উপাদানের প্রয়োজন, জাতিভেদ যুক্ত হিন্দুদের মধ্যে সেই সমস্ত উপাদানের অভাব আছে। অনেক দূরে বসবাস করলেও যেমন একজন মানুষ তার সমাজের সভ্য পদ থেকে বঞ্চিত হয় না, তেমনি পাশাপাশি বসবাস করলেও শুধুমাত্র প্রতিবেশী মানুষগুলি নিয়ে একটি সমাজ গঠিত হয়না। দ্বিতীয়তঃ একটি সমাজ গঠন করতে শুধুমাত্র আচার-ব্যবহার, বিশ্বাস ও চিন্তাধারার সাদৃশ্যই যথেষ্ট নয়। ‘ইট’ যেমন এক হাত থেকে অন্য হাতে সহজেই হস্তান্তরিত হতে পারে, সেরকম এক গোষ্ঠীর আচার ব্যবহার, বিশ্বাস ও চিন্তাধারা আর এক গোষ্ঠী সহজেই গ্রহণ করতে পারে। তখন মনে হতে পারে যে, দুই গোষ্ঠীর মধ্যে একটি সাদৃশ্য আছে। পারস্পরিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করতে পারে; কিন্তু তাতে একটি সমাজ গড়ে  ওঠেনা।

    এটাও দেখা যায় যে, পরস্পর পাশাপাশি প্রতিবেশী হিসাবে বসবাস না করলেও বিভিন্ন আদিম অধিবাসীদের মধ্যে আচার ব্যবহার, বিশ্বাস ও চিন্তাধারার সাদৃশ্য আছে। কিন্তু তাই বলে কেউ একথা বলতে পারেন না যে, এই অধিবাসীদের এরকম সাদৃশ্য থাকলেও তারা একই সমাজের অন্তর্ভুক্ত।

একটি সমাজ গঠন করার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কয়েকটি বিষয়ের সমদৃশ্যই যথেষ্ট নয়। একটি সমাজ গঠন করতে হলে সেই সমাজের অন্তর্ভুক্ত সকল মানুষের সকল বিষয়ে সমান অধিকার থাকা দরকার। একই রকম জিনিস থাকা এবং সকল জিনিসের উপর সাধারণ অধিকার থাকা, এই  দুটি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা। মানুষের মধ্যে শুধুমাত্র পরস্পর যোগাযোগের ফলে সমাজের অস্তিত্ব গড়ে উঠতে পারে। একটি সমাজকে বাস্তবে রূপ দেওয়া বা একই সমাজের অন্তর্ভুক্ত করতে হলে এবং মানুষের মধ্যে সামাজিক বন্ধন সৃষ্টি করতে হলে, এক শ্রেণির মানুষের কর্মের সঙ্গে অন্য শ্রেণির মানুষের কর্মের সাদৃশ্য থাকাটাই যথেষ্ট নয়। হিন্দুদের বিভিন্ন জাতের মধ্যে একই রকম উৎসব পালন এ-কথার সত্যতা প্রমাণ করে। একই রকম উৎসব উদ্‌যাপন বিভিন্ন জাতের মানুষের মধ্যে একটি অবিচ্ছেদ্য সামাজিক বন্ধন গড়ে তুলতে পারেনি। একটি অবিচ্ছেদ্য সামাজিক বন্ধনের সৃষ্টি করতে হলে এই সমাজের অন্তর্ভুক্ত সকল মানুষের এমন একটি সাধারণ কাজে অংশগ্রহণ করতে হবে, যার ফলে তাদের মধ্যে একই রকম ভাব ও অনুপ্রেরণা আসবে। তাদের মধ্যে সামাজিক বন্ধুত্ব সৃষ্টি করতে হলে সেই সমাজের অন্তর্ভুক্ত সকলের সঙ্গে এমনভাবে পরস্পর মেলামেশা ও সাধারণ কাজ-কর্মে অংশীদার হওয়ার সুযোগ থাকা দরকার, যাতে একে অপরের সুখ-দুঃখ অনুভব করতে পারে।

   জাতিভেদ প্রথা যে কোনো দুটি জাতির মানুষের মধ্যে এরকম সাধারণ কাজে এবং মেলামেশায় বাঁধা সৃষ্টি করে হিন্দুদের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ গড়তে প্রচন্ড বাঁধা দিয়েছে। জাত-ব্যবস্থা থাকার ফলে হিন্দু জীবন এক এবং হিন্দুরা এক জাতি, -এই চেতনাবোধ গড়ে ওঠেনি।

 

Read More
// // Leave a Comment

ব্রাহ্মণ্যবাদ নামক বিষ হিন্দুধর্মকে নষ্ট করছে। (Brahminism is the poison which has spoiled Hinduism.) ব্রাহ্মণ্যবাদ ধ্বংস হলে হিন্দুধর্ম রক্ষা পাবে।

 

   

  


ব্রাহ্মণ্যবাদ নামক বিষ হিন্দুধর্মকে নষ্ট করছে। (
Brahminism  is the poison which has spoiled Hinduism.) ব্রাহ্মণ্যবাদ ধ্বংস হলে হিন্দুধর্ম রক্ষা পাবে।

-      ড. বাবাসাহেব আম্বেদকর (from Annihilation of Caste)

 কোনো সংস্কারকের কাছে যুক্তি এবং নীতি নামে দুটি হাতিয়ার থাকে। একজন সংস্কারককে এই দুটি  হাতিয়ার থেকে বঞ্চিত করার অর্থ হলো তাকে কাজ করতে অক্ষম করে দেওয়া। যখন এই প্রশ্ন  বিবেচনা করে দেখার অধিকার নেই, তখন আপনারা জাতব্যবস্থা কিভাবে ভাঙ্গবেন? নীতির সঙ্গে   জাতব্যবস্থার কোনো মিল আছে কিনা সাধারণ লোক যখন প্রশ্ন বিবেচনা করার অধিকারী নয়, তখন আপনারা জাতব্যবস্থা কিভাবে ভাঙ্গবেন? যে দুর্ভেদ্য প্রাচীর দ্বারা জাত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে এবং যে সব উপাদানের সাহায্য এই প্রাচীর গড়া হয়েছে, তার মধ্যে যুক্তি-নীতি নামক কোনো দাহ্য উপাদান নেই। উপরন্তু এই প্রাচীরের অভ্যন্তরে ব্রাহ্মণ সৈন্যবাহিনী পাহারা দিচ্ছে। সেই ব্রাহ্মণরাই বুদ্ধিজীবী শ্রেণি এবং হিন্দুদের প্রকৃত নেতা। জাত ব্যবস্থার প্রাচীর পাহারা  দেওয়ার জন্য ব্রাহ্মণ সৈন্যবাহিনী ভাড়াটে সৈন্যদের মতো পাহারা দেবে না। তারা মাতৃভূমি রক্ষার জন্য প্রাণপন যুদ্ধ করবে। এ থেকে আপনারা সহজেই বুঝতে পারবেন যে, কেন আমি মনে করি যে, জাত ব্যবস্থা ভাঙ্গা প্রায় অসম্ভব কাজ। জাত ব্যবস্থা ভাঙ্গতে হয়ত বহুযুগ লাগবে। জাত ব্যবস্থা  উচ্ছেদ করতে বেশি সময় লাগুক আর কম সময় লাগুক, আপনাদের একথা ভুললে চলবেনা যে, বেদ ও স্মৃতি শাস্ত্রগুলি কোনো যুক্তি বা নৈতিক সূত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই যদি আপনারা জাত ব্যবস্থা নির্মুল করতে চান, তাহলে শাস্ত্রগুলির মুখোশ জনসাধারণের সামনে খুলে দিতে হবে। শ্রুতি এবং স্মৃতি শাস্ত্রগুলিকে সর্বপ্রথম সমূলে তুলে ফেলা দরকার। এছাড়া অন্য কোনো রাস্তা নেই। জাত ব্যবস্থার নির্মূল করার জন্য এটাই হল আমার সুচিন্তিত অভিমত। (if  you wish to  bring about a breach in the system, then you have got to apply the dynamite to the Vedas and the shastras, which deny any part to reason; to the Vedas and shastras, which deny any part to morality. You must destroy the religion of the shrutis and the smritis. Nothing else will avail. This is my considered view of the matter.)    

 

অনেকে হয়তঃ বুঝতে পারছেন না যে, আমি ধর্মের বিনাশ কথাটির দ্বারা কি বলতে চাইছি। অনেকে একে বিদ্রোহী ধারণা বলতে পারেন। আবার অনেকে একে ক্রান্তিকারী বিচারও বলতে পারেন। তাই আমি বিষয়টির পরিষ্কার ব্যাখ্যা করতে চাই। আমি জানি না আপনারা নীতি এবং নিয়মের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেন কিনা। কিন্তু এর মধ্যে পার্থক্য আছে বলে আমি মনে করি।  আমি শুধু এদুটির মধ্যে পার্থক্য আছে মনে করিনা, বরং এই পার্থক্য যেমন বাস্তব, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ বলেও মনে করি।

    নিয়ম ব্যবহারিক হয়। এর নির্ধারিত মাপদণ্ড অনুসারে কাজ করার প্রথাগত রাস্তা আছে।  কিন্তু নীতি হচ্ছে বৌদ্ধিক (Intellectual)। নীতি হচ্ছে কোন কিছুকে বিচার করার উপযুক্ত সাধন (Methods of judging things.)। এটা কোন বিষয়ের ভাল মন্দ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণভাবে চিন্তা করতে নির্দেশ দেয়। নীতি বাস্তবে কোন ধরা-বাধা পথে চলতে নির্দেশ দেয় না। কিন্তু নিয়ম রান্নাকরার পদ্ধতির নির্দেশের মত সরাসরি আমাদের বলে দেয় যে, কি করতে হবে এবং কিভাবে করতে হবে। নিয়ম এবং নীতির মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য আছে।

ভাল কাজ করা বলতে নিয়ম  যা বোঝায়, এবং ভাল কাজ করা বলতে নীতি যা বোঝায়; তার মধ্যে প্রচুর পার্থক্য আছে। নীতি যখন কোন কিছুকে ভাল কাজ বলে, তখন সে বিচার বিশ্লেষণপূর্বক তার পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েই সেকথা বলে। কিন্তু নিয়ম হচ্ছে যান্ত্রিক পদ্ধতি। নীতি ভুলও হতে পারে। কিন্তু নীতির আধারে করা কাজ দায়িত্বপূর্ণ হওয়া দরকার। এই দায়িত্বের জন্য ধর্ম হচ্ছে একটা নীতিগত ব্যাপার। ধর্ম কখনও শুধুমাত্র নিয়ম সর্বস্ব হতে পারেনা। ধর্ম যদি  শুধুমাত্র নিয়মে পর্যবসতি হয়, তখন তাকে আর ধর্ম বলা যায়না। কারণ ধর্মের মৌলিক উপাদান দায়িত্বজ্ঞানকে বাদ দিলে তাকে ধর্ম নামে অভিহিত করা যায় না।

হিন্দু ধর্ম কি? এটা কি কিছু নিয়মের বোঝা, নাকি কিছু নীতির সমষ্টি? বেদ আর স্মৃতিশাস্ত্রগুলির বর্ণনা অনুসারে হিন্দুধর্ম কিছুই নয়। এটা শুধু সামাজিক, রাজনৈতিক ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কিত কিছু  নিয়ম ও নির্দেশের সমষ্টি। হিন্দুরা যাকে ধর্ম বলে সেটা কিছু আদেশ বা নির্দেশ এবং নিষেধাজ্ঞার সমষ্টি। ধর্মের যে আধ্যাত্মিক নীতি সমূহ; যেগুলি বিশ্বের সব মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হবে, সে সব হিন্দুধর্মে নেই বললেই চলে। যেটুকু আছে হিন্দুদের জীবন যাত্রায় তার তেমন একটা ব্যবহার দেখা যায় না। বেদ এবং স্মৃতিশাস্ত্রগুলির নির্দেশ এবং তার ব্যাখ্যা থেকে জানা যায় যে, একজন হিন্দুর পক্ষে ‘ধর্ম’-এর অর্থ হল কতকগুলি নির্দেশ ও বিধি নিষেধ মাত্র। বেদে ‘ধর্ম’ শব্দটির দ্বারা কিছু সংখ্যক ধর্মীয় আচরণের আদেশ বোঝান হয়েছে। এমন কি  জৈমিনীর ‘পূর্বমীমাংসা’-র ব্যাখ্যা অনুসারে ‘ধর্ম’ হ’ল একটি আকাঙ্খিত লক্ষ্য বা ফল। যেটা বেদের পরিচ্ছেদে লেখা আছে।  সরল ভাষায়  হিন্দুরা যাকে ধর্ম বলে, তাহল প্রকৃতপক্ষে কিছু আইন বা বেশির বেশি আইনানুগ  নিয়ম। পরিস্কারভাবে বলতে হলে আমি এই আচার আচরণের নির্দেশ নামাগুলিকে ‘ধর্ম’ বলে স্বীকার করতে পারিনা। এই নির্দেশ নামার প্রধান কুফল হল, তা ধর্ম  সম্পর্কে মানুষের মনে ভুল ধারণার সৃষ্টি করেছে। মানুষের মুক্ত মনের স্বতঃস্ফুর্ত নীতিজ্ঞানকে নষ্ট করেছে। ধর্মভীরু লোকদের কম বেশি উদ্বিগ্ন  করে তুলেছে ও তাদের উপর আরোপিত নিয়ম ও আচারের প্রতি দাস সুলভ মনোভাবের সৃষ্টি করেছে। হিন্দুধর্মের আদর্শের প্রতি কোন  নিষ্ঠা বা আনুগত্য নেই। শুধু আদেশগুলো পালন করার নির্দেশ আছে। এর সবচেয়ে ক্ষতিকর লক্ষণ  হল, নির্দেশগুলি অতীতে যা ছিল আজও তাই আছে এবং ভবিষ্যতেও তাই থাকবে। এই নির্দেশগুলি অসমান এবং সকল শ্রেণির জন্য সমানভাবে  প্রযোজ্য নয়। এই অসমানতাকে চিরস্থায়ী করে দিয়েছে। কারণ একে বংশপরস্পরাক্রমে অপরিবর্তনীয় বলে ঘোষণা করেছে। এগুলি ধর্মগুরু বা ঈশ্বরের দ্বারা প্রণীত হয়েছে বলে আপত্তিকর নয়; এর আপত্তির প্রধান কারণ হ’ল, এই নিয়মগুলি এমনভাবে প্রবর্তন করা হয়েছে যে, সেগুলি চুড়ান্ত এবং অপরিবর্তনীয়। মানুষের মানসিকতা যেমন বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়; মানুষের জীবন ধারণ প্রনালীও তেমনি একটি নিয়মকে যুগযুগ ধরে কিভাবে অপরিবর্তনীয়  হিসাবে মেনে নেবে?  

    এজন্য আমি এটা বলতে কোন দ্বিধা বোধ করিনা যে, এই রকম ধর্ম নষ্ট করা দরকার। আর এই রকম ধর্মকে নষ্ট করার ক্ষেত্রে কোন অধর্ম হবেনা ( no hesitation in saying that such religion must be destroyed and I say, there is nothing irreligious in working for the destruction of such a religion)। বাস্তবিকই, আমি বলি যে, ধর্মের নামে এই ধরেনের অমানবিক আইনগুলির মুখোস খুলে দেওয়া আপনাদের অন্যতম পবিত্র কর্তব্য হওয়া উচিত। আপনাদের জন্য এটাই অপরিহার্য পদক্ষেপ হওয়া উচিত। একবার আপনারা যদি মানুষের মন থেকে এই ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে পারেন যে, হিন্দুধর্মের নামে জনগণকে যেটা বলা বা শেখানো হচ্ছে সেটা ধর্ম নয়, সেটা হচ্ছে কতকগুলি আইন বা নিয়ম। তখন আপনারা এই কথা বলার স্থিতিতে আসতে পারবেন যে, একে সংশোধন বা নির্মূল করা দরকার। যতদিন পর্যন্ত মানুষ এই নিয়মগুলিকে ধর্ম বলে বিশ্বাস করবে, ততদিন পর্যন্ত তারা এর পরিবরতন করতে চাইবেনা। কারণ ধর্ম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা হল যে, ধর্ম অপরিবর্তনীয়। তারা ধর্মকে পরিবর্তন করতে চাইবেনা। কিন্তু তাদের যদি বোঝানো হয় যে, এটা ধর্ম নয় এটা কতকগুলি পুরানো ও প্রাচীন আইন। যখনই তারা জানতে পারবে যে, হিন্দুদের ধর্মের নামে যা বলা হচ্ছে বা বোঝানো হয়েছে তা কিছু প্রাচীন নিয়ম মাত্র। তখনই তারা এটাকে পরিবর্তন করতে সহজেই রাজ হবে।

আমি নিয়মসর্বস্ব ধর্মকে সমালোচনা করছি বলে এটা যেন কেউ মনে না করেন যে, আমি ধর্মের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করছি। অপর পক্ষে আমি বার্কের (Burke) এই কথার সঙ্গে  একমত যে, “প্রকৃত ধর্ম হচ্ছে সমাজ জীবনের ভিত্তি এবং এই ভিত্তির উপরই গড়ে ওঠে দেশের  ন্যায়পরয়াণ সরকার। (True religion is the foundation of society, the basic on which all true civil Government rests, and both their sanction) । সুতরাং যখন আমি দাবি করি যে, হিন্দু সমাজের প্রাচীন নিয়মগুলি বিলোপ করা দরকার, তখনই আমি মনে করি সঙ্গে সঙ্গে সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে এমন একটি ধর্মের প্রয়োজন, যেটা প্রতিষ্ঠিত হবে নীতির উপর ভিত্তি করে। ধর্মের প্রয়োজনীয়তা আমি একান্তভাবে অনুভব করি। তাই আমি আপনাদের বলতে চাই যে, ধর্মের সংস্কারের প্রধান বিষয়গুলি হলঃ-

(১) হিন্দু সমাজের শুধুমাত্র একটাই আদর্শ ধর্মগ্রন্থ থাকবে, যাকে সর্ব সম্মত ভাবে গ্রহণ করতে হবে। আর হিন্দু ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বলে প্রচারিত বেদ, স্মৃতিশাস্ত্র এবং পুরাণ গ্রন্থগুলি আইন করে নিষিদ্ধ করতে হবে। উক্ত শাস্ত্রগুলিতে প্রকাশিত কোনো প্রকার ধর্মীয় বা সামাজিক নিয়ম  বা নির্দেশের প্রচার ও প্রয়োগ দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য করতে হবে।

(২) পুরোহিত প্রথা তুলে দিতে পারলে ভাল হয়। সেটা সম্ভব না হলে জন্মগত পুরোহিত প্রথাকে অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। হিন্দু সমাজের যে কোন ব্যক্তি পুরোহিত হতে পারবেন। এর জন্য এরকম আইন করতে হবে যে, যাঁরা পুরোহিত হতে চাইবেন তাঁদের রাজ্য দ্বারা প্রবর্তিত কোর্সের পরীক্ষায় পাশ করে পুরোহিত হওয়ার লাইসেন্স নিতে হবে।

(৩) বিনা লাইসেন্সের কোন পুরোহিত কর্তৃক অনুষ্ঠিত ধর্মীয় কাজকে আইনত অবৈধ বলে গণ্য হবে। আর এই রকম পুরোহিতকে আইন মোতাবেক শাস্তি দিতে হবে।

(৪) পুরোহিতকে রাষ্ট্রের কর্মচারি হিসবে গণ্য করতে হবে। তাঁকে নীতিবান, ধর্ম বিশ্বাসী ও সৎ হতে হবে। আর এই সব বিষয়ে তাঁকে রাষ্ট্রীয় নিয়ম কানুনকে কঠোরভাবে মানতে হবে।

(৫) পুরোহিতদের সংখ্যা আইনের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ করতে হবে। যেমন দেশের প্রয়োজনানুসারে I.C.S. দের সংখ্যা সীমাবদ্ধ করা হয়।

      অনেকের কাছে আমার এই প্রস্তাব অতিরিক্ত সংস্কার বলে মনে হতে পারে। তবে আমি একে কোন ক্রান্তিকারী পদক্ষেপ বলে মনে করি না। ভারতের প্রত্যেক পেশার ক্ষেত্রে আইন আছে। চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, উকিলদের পেশাগত যোগ্যতার জন্য লাইসেন্স বা সার্টিফিকেট নিতে হয়। তাঁরা কর্মক্ষেত্রে একজন নাগরিক হিসাবে কোন অপরাধ করলে, আইন অনুসারে শাস্তি মানতে বাধ্য। তাঁরা তাঁদের পেশাগত কাজের ক্ষেত্রে ভাল সেবা দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। শুধুমাত্র পুরোহিতের কাজ এমন পেশা, যার জন্য কোন আইন বা নিয়ম নির্ধারিত নেই। মানসিকভাবে একজন পুরোহিত মুর্খ হতে পারে, নৈতিক চরিত্র খারাপ হতে পারে। এসব কিছুর কোন এক বা একাধিক অসুবিধা থাকা সত্বেও সে মন্দিরে প্রবেশ করতে পারে এবং হিন্দু দেব দেবীর পুজা করতে পারে। এতকিছু অসুবিধা থাকা সত্বেও পুরোহিত হওয়ার জন্য একমাত্র শর্ত হচ্ছে, তাকে ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করতে হবে। পুরোহিত শ্রেণি কো্নো আইন বা নীতিশাস্ত্র মানে না। তাদের  কোন কর্তব্য নেই। তাদের শুধু অধিকার এবং সুযোগ সুবিধা আছে। রাষ্ট্রের দ্বারা আইন তৈরি  করে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। তাহলে পুরোহিতরা সাধারণ মানুষকে ঠকাতে পারবে না।  পুরোহিতের জন্য আইন তৈরি হলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সুশিক্ষিত যে কোন হিন্দু এই কাজ  গ্রহণ করতে পারবে। পুরোহিতের পেশা আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হলে ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং জাতিভেদ প্রথা নির্মূল করার পথ সুগম হবে। ব্রাহ্মণ্যবাদ নামক বিষ হিন্দুধর্মকে নষ্ট করছে। (Brahminism  is the poison which has spoiled Hinduism.) ব্রাহ্মণ্যবাদ ধ্বংস হলে হিন্দুধর্ম রক্ষা পাবে। এরকম সংস্কারের কোন বিরোধী পক্ষ থাকা উচিত নয় । আর্য সমাজবাদীদের দ্বারাও এই  প্রস্তাবকে স্বাগত করা উচিত। কারণ এটা তাঁদের দ্বারা প্রবর্তিত ‘গুণকর্ম’-এর তত্ত্বের অনুরূপ।

   এই সংস্কারগুলি আপনারা করুন বা না করুন, কিন্তু আপনাদেরকে আপনাদের এই ধর্মের একটা নতুন গণতান্ত্রিক রূপ দিতে হবে। যেটা স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রীর সঙ্গে সংগতি রেখে গণতন্ত্রের অনুরূপ হবে। ধর্ম বিষয়ে নির্দেশ দানের অধিকার আমার নেই। তবুও আমি এই কথাই বলব যে, ধর্মীয় আদর্শের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রী নীতির অনুসন্ধান করতে আমাদের বিদেশীদের দ্বারস্থ হওয়ার প্রয়োজন নেই। উপনিষদে এই সব নীতি বর্নিত আছে। যদি আপনারা একেবারে সম্পূর্ণ নতুন না করে মূল নীতিগুলিকে বিশেষভাবে পরিবর্তন করেন, তাহলেও চলবে। এর ফলে জীবনের মৌলিক ধারণা পাল্টে যাবে। এর ফলে জীবনের মূল্য সম্পর্কে একটা বিরাট পরিবর্তন আসবে। এতে মানুষ এবং জগৎ সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিত পরিবর্তন ঘটবে।  বাস্তবিক পক্ষে সেটা হবে একটা ধর্ম পরিবর্তন। যদি আপনারা ধর্ম পরিবর্তন শব্দটি পছন্দ না করেন, তাহলে আমি একে বলব নতুন জীবন। কিন্তু নতুন জীবন কোন মৃত দেহে আসতে পারেনা। নতুন জীবন শুধুমাত্র নতুন দেহেই আসতে পারে। এর জন্য পুরানো দেহের অবসান হওয়া দরকার। নতুনের কাজ শুরুর পূর্বেই পুরানোকে বিদায় দিতে হবে। সহজ কথায় বলা যায় যে, ধর্মের মধ্যে নতুন জীবনের সঞ্চার করতে হলে পুরাতন শাস্ত্রীয় ধর্ম ও শাস্ত্রের কর্তৃত্বের অবসান আগে ঘটাতে হবে।

 

Read More
// // Leave a Comment

ড. বাবা সাহেবের জীবন ও কর্ম লেখক– জগদীশচন্দ্র রায়

 

                    ড. বাবা সাহেবের জীবন ও কর্ম


লেখক– জগদীশচন্দ্র রায়  

        জন্মঃ- ১৪ই এপ্রিল ১৬৯১ সালে। পিতার নাম রামজী শকপাল। বাল্য নাম ভীমরাও।  তিনি এক অচ্ছুৎ দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকালে স্কুলে তাঁকে সর্বদা জাতি বৈষম্যের শিকার হতে হতো। অস্পৃশ্য বলে বর্ণবাদীরা তাঁকে স্পর্শ করত না। পিপাসার জলও পান করতে পারত না। তিনি ছিলেন ভারতীয় সংবিধান নির্মাতা। ২০১২ সালে  একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে ভারতীয়দের ভোটের দ্বারা তিনি “শ্রেষ্ঠ ভারতীয়” নির্বাচিত হন।

     শিক্ষা ও সম্মান প্রাপ্তিঃ-- ১৯১৫ সালে কলম্বিয়া উনিভারসিটি থেকে এম. এ. পাশ করেন। ১৯১৭ সালে পি.এইচ.ডি ডিগ্রী পান। ১৯২১ সালে এম.এস.সি ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯২২ সালে ব্যারিষ্টারী পাশ করেন। ১৯২৩ সালে ডি. এসসি ডিগ্রী পান ‘টাকার সমস্যা’ থিসিস লিখে লণ্ডন উনিভারসিটি থেকে। ভারতের সংবিধান রচনার জন্য কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি.লিট (ডক্টর অব ল) প্রদান করেন। তাঁর অসামান্য পাণ্ডিত্যের জন্য ভারতের মুসলমান পরিচালিত ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ডি.লিট(ডক্টর অব লিটারেচার) সাম্মানিক ডিগ্রী প্রদান করেন। কিন্তু ভারতের উচ্চবর্ণীয়দের দ্বারা পরিচালিত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে এরূপ সম্মান প্রদান করেনি। নিচুজাত বলে গুণি আম্বেদকরকে তাঁরা কোনো দিনই এই ধরনের সম্মান দিতে পারেনি এবং আজ পর্যন্ত দেয়নি। তবে ২০১২ সালে  একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে ভারতীয়দের ভোটের দ্বারা তিনি “শ্রেষ্ঠ ভারতীয়” নির্বাচিত হন। আর Apr 26, 2016 Baba Saheb Ambedkar is considered as SYMBOL OF KNOWLEDGE in the world.

     বাবা সাহবে আম্বদেকর একজন সূর্য। সেই সূর্যকে পূর্ণ প্রকাশের জন্য ব্রাহ্মণ্যবাদী ঘনকালো মেঘকে সরিয়ে তাঁকে সংবিধান সভায় প্রেরণ করেন বাংলার ‘আম্বেদকর’ মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। যার অক্লান্ত সংগ্রামের ফলে এই অসাধ্য সাধন সম্ভব হয়। যদিও বাংলার মানুষ এই মহান মহামানবদ্বয়ের সংগ্রামের ফসল ‘সংরক্ষণ- representation’ কে তো  ভোগ করছে, কিন্তু যাদের জন্য এই মহার্ঘ তাদের আজও আপন করে নিতে পারেনি।

    অবদানঃ- ড. আম্বেদকরের ভারতের বিকাশের ক্ষেত্রে যতোটা যোগদান আছে হয়তো অন্য কোনো রাজনেতার সেটা নেই। তিনি  ছিলেন অর্থতজ্ঞ, সমাজতজ্ঞ, আইন বিশারদ। তিনি আধুনিক ভারতের নির্মাতা। তিনি সংবিধান রচনা সমিতির অধ্যক্ষ ছিলেন। তিনি এমন সংবিধান রচনা করেছেন, যেখানে সকল নাগরিক সমান অধিকারী, ধর্মনিরপেক্ষ। বাস্তবে তিনি স্বাধীন ভারতের ডি.এন.এ. রচনা করেছিলেন সংবিধানের মাধ্যমে। তাঁর প্রেরণায় Finance Commission এর নির্মাণ করা  হয়। তিনি Reserve Bank of India এর নির্মাতা। দামোদর ভ্যালী, হিরাকুণ্ড পরিকল্পনাও তাঁর ভাবনার প্রকাশ। Employment Excenge এর স্থাপনাও বাবা সাহবে করেন। জল ও বিদ্যুৎ এর Gird System এর স্থাপন তিনি করেন।  স্বতন্ত্র নির্বাচন আয়োগের নির্মাতা বাবা সাহেব। যদিও এই সব অবদানের কথা ভারতের কোনো সরকারই  সরাসরি স্বীকার করে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দেয়নি। অর্থাৎ এইসব পরিকল্পনা ও বিচার আম্বেদকরের ছিল কিন্তু সেটার শ্রেয় অন্যে লুটে নিয়েছে।   

      নারী ও শ্রমিকদের সুবিধাঃ- বাবা সাহেব হিন্দুকোড বিল বানিয়েছিলেন নারীদের সমমর্যাদার অধিকার দেওয়ার জন্য। পিতার সম্পত্তিতে কন্যার সমান অধিকার, বিবাহিত পুরুষ এক স্ত্রী বর্তমান থাকতে অন্য স্ত্রীকে গ্রহণ করতে পারবেনা। যদিও তখনকার সরকার সেটার  স্বীকৃতি দেয়নি। পরবর্তীতে সেটা চালু করা হয়। মহিলাদের মাতৃত্বকালী ছুটি, এবং প্রতিদিন আট ঘন্টা কাজের সময় নির্ধারণ বাবা সাহেবের অবদান। তিনি যখন শ্রমসচিব (মন্ত্রী) তখন (১)কয়লা শ্রমিকদের নানা ধরনের সহায়তা প্রদান,

 (২) মহিলা শ্রমিকদের প্রসবকালীন ৩২৯দিন ছুটি,

 (৩) কর্ম বিনিয়োগ কেন্দ্র,

(৪) ৮ ঘণ্টা কাজের আইনী স্বীকৃতি,

 (৫) ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার সম্প্রসারণ,

 (৬) ন্যূনতম বেতন —সহ নানা শ্রমিক  কল্যাণ আইন পাস ও কার্যকর করেন।

   ধর্ম সম্পর্কে বাবা সাহবেঃ- তিনি ১৯৩৫ সালে ঘোষণা করেছিলেন, হিন্দুধর্মে জন্মগ্রহণ করেছি, যেটা আমার কোনো কিছু হাত নেই। তবে আমি হিন্দু হয়ে মৃত্যু বরণ করব না। তিনি ১৯৫৬ সালের ১৪ই অক্টোবর হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে স্বধম্মে ফিরে যান। আর ওই বছর ৬ ডিসেম্বর তাঁর মহাপরিনির্বাণ ঘটে। ধর্ম সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি ধর্মের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করি না। তবে, প্রকৃত ধর্ম হচ্ছে জীবনের ভিত্তি এবং এই ভিত্তির উপরই গড়ে ওঠে দেশের ন্যায়পরায়ণ সরকার। তিনি আরও বলেন, মানব জাতির প্রগতি সাধনে ধর্মের(ধম্ম) প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য্য।  স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব এই মৌলিক নীতিগুলিকে ধর্ম অবশ্যই স্বীকার করে নেবে, এর উপর তিনি জোর দিয়েছেন।

      সংবিধানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বাবাসাহেবঃ- সংবিধানের উদ্দেশ্য ছিল সমতা সতন্ত্রতা বন্ধুতা ও ন্যায়। যার জন্য জাতীয় পতাকায় আশোক চক্র ও জাতীয় প্রতীক অশোক স্তম্ভ রাখা হয়েছে। তবে তিনি সংবিধান সংসদে পেশ করে তাঁর ভাষণে বলেছিলেন-“সংবিধান যতই ভালো লেখা হোক না কেন, সেটা বাস্তবায়িত করার লোকার যদি ভাল না হয়; তাহলে এর গুরুত্ব নেই। আবার সংবিধান যতই খারাপ লেখা হোক না কেন, তাকে বাস্তবায়িত করার লোকেরা যদি ভাল হয়, তাহলে সেটা বেশ কার্যকরী হবে।”   

      তিনি বলেন, “২৬ জানুয়ারী ১৯৫০ আমরা একটা অসংগতিপূর্ণ জীবনে (life of contradiction) প্রবেশ করছি। রাজনৈতিক সাম্যকেই শুধু সংবিধানে সন্নিবেশিত করতে পেরেছি, কিন্তু সামাজিক এবং অর্থনৈতিক জীবনে অসাম্যকে সংবিধানে মেনে নেওয়া হয়েছে। রাজনীতিতে আমরা বিখ্যাত নীতি one man, one vote, and one value মেনে নিয়েছি। সমস্ত ভারতবাসী একজাতি। এই নীতিতে সামাজ জীবনে সৃষ্টি হবে ঐক্য। এটা হওয়া খুবই কঠিন। কারণ, জাতব্যবস্থাটাই anti-national, এই জাতব্যবস্থা মানুষকে মানুষ থেকে পৃথক কর। আরও জাতব্যবস্থা anti-national কারণ, সেটা জাতিতে জাতিতে ঈর্ষা এবং বিতৃষ্ণার (antipathy) জন্ম দেয়।” আমার বিচারে, ধর্মনিরপেক্ষ ব্রাহ্মণ এবং পুরোহিত শ্রেণীর ব্রাহ্মণদের মধ্যে পার্থক্য করা অর্থহীন। তারা উভয়েই পরস্পরের আত্মীয়। তাঁরা একই শরীরের দু’টি বাহু। এক বাহুর অস্তিত্বের জন্য অন্য বাহু যুদ্ধ করতে বাধ্য।

     জাতিপ্রথা নির্মূলন পদ্ধতিঃ- তিনি বলেন, ‘জাতিভেদ’ প্রথা নামক সামাজিক ব্যাধির খাঁট ঔষধ হল অসবর্ণ বিবাহ।  রক্তের সংমিশ্রণই আত্মীয়তা বোধ সৃষ্টি করতে পারে। তবে তিনি আরো বলেন,‘জাত-ব্যবস্থা নির্মূলনের প্রকৃত ঔষধ হল শাস্ত্রের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস ও ভক্তির মূলোচ্ছেদ করা।  

     উপদেশঃ- বাবাসাহেব বলেছেন, - “যিনি তাঁর দুঃখ থেকে মুক্তি চান, তাঁকে লড়তে হবে। আর যিনি লড়াই করতে চান তাঁকে পড়তে হবে। কারণ জ্ঞান বিনা লড়াই করতে গেলে পরাজয় নিশ্চিত।

     আধুনিক ভারতের নির্মাণের জন্য বাবা সাহেবের দ্বারা পরিকল্পিত সমস্ত ব্যবস্থাকে চালু করা একান্ত আবশ্যক। যদিও বাবা সাহেবকে সর্বভারতীয়দের মসিহা হিসাবে তুলে না ধরে শুধুমাত্র পিছড়েবর্গদের মসিহা হিসাবে তুলে ধরেছে ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যবস্থা। দেশে সকলের জন্য সমান অধিকারের স্বপন বাবা সাহেব দেখেছিলেন,  কিন্তু সেটা আজ পর্যন্ত অধুরা রয়েগেছে। ভারতবাসী ইংরেজদের গোলাম ছিল। আর অস্পৃশ্যরা ইংরেজ ও ব্রাহ্মণ্যবাদীদের গোলাম ছিল। বর্তমানে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের গোলামি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সকলকে আদেশ দিয়েছেন ‘শিক্ষিত হও, সংগঠিত হও আর আন্দোলন করো’।

Read More