সমাজ বিপ্লবের অনবদ্য পথিকৃৎ ডাঃ গুণধর বর্মন
৩ ফেব্রুয়ারী তাঁর জন্ম শতবর্ষ উপলক্ষ্যে এই আলেক্ষ্য তুলে ধরা হল। তাঁকে আন্তরিক অভিবাদন জানাই।
রোগের চিকিৎসার জন্য যে ডাক্তার দরকার হয়,
গুণধর বর্মন সেই চিকিৎসাবিদ্যায় এম.বি.বি.সে. পাশ করেছেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ
থেকে ১৯৫৩ সালে। সেই কলেজেই স্ত্রীরোগ
বিভাগে ইডেন হাসপাতালে দেড় বছর ‘হাউসস্টাফ হিসেবে কাজ করেছেন। তারপরে শিশু
বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য কলকাতা ইন্স্টিটিউট অফ্ চাইল্ড হেস্থ্ থেকে ডি.সি. এইচ.
পাশ করে সেখানে একবছর কাজ করেছেন। শেষে কলকাতা স্কুল অফ্ ট্রপিক্যাল মেডিসিন এবং
যুক্তভাবে অল ইন্ডিয়া ইন্স্টিটিউট অফ হাইজিন থেকে ডি.টিএম. এণ্ড এইচ পাশ করেছেন। তারপর শিশু চিকিৎসায়
হোমিওপ্যাথির বৈশিষ্ট্য জানার জন্য কলকাতার বিখ্যাত ‘ক্যাল্কাটা হোমিওপ্যাথি
মেডিক্যাল কলেজে’ ভর্তি হয়ে হোমিওপ্যাথি পদ্ধতিতে উপযুক্ত জ্ঞানলাভ করেছেন। ফলে
সাধারনভাবে ডাঃ গুণধর বর্মন একজন যথেষ্ট পারদর্শী বিশেষজ্ঞ চিকিতসক।
সমাজের অতি দীন অবস্থা থেকে স্বীয় প্রতিভা ও
একনিষ্ঠ সাধনায় দেশ ও সমাজের অতি উচ্চস্থানে উপনীত হয়েছেন ডাঃ গুণধর বর্মন। একান্ত
দরিদ্র অস্পৃশ্য মৎস্যজীবী রাজবংশী পরিবারে ১৯২৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারী জন্মগ্রহণ
করে নানা অসুবিধার মধ্যে দিয়েই প্রাইমারী স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা
পর্যন্ত অভিভক্ত মেদিনীপুর জেলার প্রত্যেকটি পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করে
অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন।
চিকিৎসাবিদ্যায় ডাঃ বর্মনের দক্ষতা ও
আত্মবিশ্বাস এতই প্রবল যে নিজের পুত্রকন্যা, স্ত্রী ও পরিবারের কারোর চিকিৎসায়
অন্য কোনো ডাক্তারের সাহায়্য নেন না, বিশেষ কিছু সার্জিক্যাল বিষয় ছাড়া। তিনি জোর
দিয়েই বলেন, নিজের ছেলেমেয়ের চিকিৎসায় আত্মবিশ্বাস না থাকলে পরের ছেলেমেয়ের
চিকিৎসা করতে যাওয়া উচিত নয়। এই কথা এ দেশের তথা পৃথিবীর অন্য কোনো চিকিৎসক দৃঢ়তার
সঙ্গে বলতে পারেন না।
তার চেয়েও বড় কথা যে অবহেলিত দীনহীন সমাজে
ডাঃ বর্মন জন্মেছেন সেই হতভাগ্য দরিদ্র লাঞ্ছিত সমাজের বিজ্ঞানসম্মত উন্নতির কাজে
তিনি সারাজীবন, এখন অশীতিপর বৃদ্ধ বয়সেও একান্তভাবে নিজেকে উৎসর্গিত করে রেখেছেন।
সেই অস্পৃশ্য সমাজের তিনি একান্তই আপনজন হিসেবে পরিচয় দেন, নিজের অর্জিত
জ্ঞান-গরিমা-আত্মর্যাদার মোহ ভুলে – যা এ দেশে দেখাই যায় না।
ভারতে জন্মগত জাতিভেদের ভয়াবহতা দূরীকরণের
জন্য ডাঃ বর্মন তাঁর সর্বস্ব পণ করেই চলেছেন। এই ধরণের মণোবৃত্তি এবং মানুষ
একান্তই বিরল। লব্ধপ্রতিষ্ঠ চিকিৎসক হিসেবে পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় যথেষ্ট সুনামের
সঙ্গে ‘প্র্যাক্টিস’ করেও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর ব্যক্তিগত সঞ্চয় বলে কিছু
ছিল না। নিজের ঘরবাড়িও নেই। জরাজীর্ণ একটি ভাঙা বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকতেন। যা
আয় করতেন, সবই সমাজের জন্য ব্যয় করতেন। তাতে নিজ পরিবারের দৈনন্দিন বাজার খরচের
জন্য অনেকদিনই তাঁকে বিব্রত হতে হত। সমাজে থেকেই সাধারণ মানুষের সেবায় এমন
সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর নজির খুঁজে পাওয়া দায়!
ডাঃ বর্মনের বিশেষ বক্তব্য ব্যক্তিগত রোগের
জন্য চিকিৎসকের অভাব নেই। কিন্তু ব্রাহ্মণ্যবাদী ধারায় সুদীর্ঘকাল ধরে যে ভয়াবহ
সামাজিক ব্যাধির প্রকোপ এ দেশকে একান্তই পঙ্গু করে চলেছে সেই মারাত্মক রোগের
চিকিৎসায় ডাঃ বর্মন নিজেকে নিয়োজিত করেছেন; নিজের স্ত্রী-পুত্রকণ্যার কথা না
ভেবেই। এই দিক থেকে ডাঃ বর্মন যথার্থই উন্নতমান পারদর্শী সমাজবিজ্ঞানী-চিকিৎসক। এই
কাজে সারাদেশ জুড়েই তাঁর নাম। তাঁর এই মহান কীর্তি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
দীর্ঘ বার বছর ধরে (১৯৭৫-১৯৮৭) ‘বঙ্গীয়
বিজ্ঞান পরিষদ’-এর শীর্ষ পরিচালক নেতা হিসাবে কাজ করে ডাঃ বর্মন ভারতের প্রায়
সমস্ত বিজ্ঞানীর প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে এসেছেন। দেশের প্রয়োজন ভিত্তিক বিভিন্ন
সমস্যা সম্পর্কে লব্ধ প্রতিষ্ঠ বিজ্ঞানীদের ডেকে তাঁদের মতামত নিয়ে আলোচনা,
সেমিনার করে তার সুব্যবস্থার উপায় নির্ধারণ করেছেন- যা আগে বিজ্ঞান পরিষদে হতো না।
ফলে দেশ সমাজ, জগৎ ও জীবন সম্পর্কে বিবিধ সমস্যার অনুসন্ধান ও তার বিজ্ঞানসম্মত
প্রতিকারের কাজে দেশের উচ্চ চিন্তাবিদ বিজ্ঞানী এবং নেতৃবৃন্দকে সক্রিয়ভাবে কাজে
লাগানোর চেষ্টা ডাঃ বর্মন করেছে সসাধারণভাবে। এর আগে বিজ্ঞান পরষদের মতো উচ্চ
চিন্তা-চেতনার সংগঠনে এদেশের কোনো নম্নবর্গের উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিও বিশেষ স্থান
বা সমাদর পাননি। গুণধর বর্মনই প্রথম অধঃপতিত অস্পৃশ্য সমাজ থেকে দেশের উচ্চবর্ণের
উচ্চশিক্ষিত পণ্ডিত ব্যক্তিদের নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন এবং সঙ্গে
নিম্নবর্ণের কিছুজনকেও সেই কাজে নিয়ে চলেন। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রে ডাঃ বর্মন নিজের
জন্মগত জাতি পরিচয় বিন্দুমাত্র গোপন করেননি। তার ফলও কিছুটা জটিল হয়েছিল। একসময়
পরিষদের উচ্চবর্ণের অধ্যাপক নেতৃবৃন্দের এক অংশ ডাঃ বর্মনের কাজকর্মে অসন্তুষ্ট
হয়ে তাঁড় বিরুদ্ধে অহেতুক কুৎসা রটনায় নামেন (মূলত তাঁদের অবৈজ্ঞানীক জীবনধারা ও
কাজকর্মের সমালোচনার জন্যই)। তাতে অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে কলকাতাসহ দেশের
উচ্চশিক্ষিত বুদ্ধিজীবী মহল পরিষ্কার দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। এক অংশ যেমন ডাঃ বর্মনের
বিরুদ্ধে, অন্য অংশ তেমনি সক্রিয়ভাবে ডাঃ বর্মনের পক্ষে বাস্তব আন্দোলনে নামেন।
কোনো একক ব্যক্তিকে নিয়ে উচ্চ চিন্তবিদ মহলে এমন ঘটনা আর কখনো ঘটেনি। তবে শেষ
পর্যন্ত গুণধর বর্মনই জয়ী হয়েছেন। তাঁর বিশুদ্ধ বিজ্ঞান মানসিকতার জন্য।
ডাঃ বর্মনের একটি বিশেষ পরিচয়, তিনি আজীবন
একনিষ্টভাবে বাবাসাহেব ড. আম্বেদকরের অনুসারী এবং তাঁরিউ নির্দেশিত পথ ও মতবাদের
বিলিষ্ট প্রচারক। বাংলাভাষায় বাবাসাহেব ড. আম্বেদকরের প্রথম জীবনীকার হিসেবে ডাঃ
গুণধর বর্মনই সুপ্রসিদ্ধ।
এইভাবে সারাজীবন তিনি যেসব অসাধারণ কাজ
করেছেন তার প্রতি নগণ্য অংশই এই আলোচনায় তুলে ধরা হয়েছে। (তথ্য সংগ্রহ- সমাজ
বিপ্লবের অনবদ্য পথিকৃৎ - ডাঃ শীতল প্রসাদ বেরা সম্পাদিত)

0 comments:
Post a Comment