সম্রাট অশোক সম্বন্ধে অপবাদ (ও তার তথ্যমূলক জবাব)
- লেখক- দীনেশচন্দ্র সেন
সম্রাট অশোক সম্পর্কে অনেক অপবাদ আছে। আর তাঁর কৃতিত্ত্বের কথা ও অনন্য সাধারণ। সেই ইতিহাস তুলে
ধরছি দীনেশচন্দ্র সেন এর ‘বৃহৎ বঙ্গ’ ১ম খণ্ড, পৃ. ১৫৬, ১৫৭, ১৫৮, ১৬৫- ১৭০;
থেকে।
বিষয়ঃ- (১) অশোক– অনুশাসন (২)“সদয় হৃদয় দর্শিত পশু ঘাতম্।” (৩)পরধর্ম্মনিন্দা নিষিদ্ধঃ- (৪) মৃগয়ার পরিবির্ত্তে লোকহিতার্থে অভিযানঃ- (৫)
দণ্ডিতের প্রতি দয়াঃ-(৬)
রাজগৃহ সুবিচারার্থ সর্ব্বদা মুক্তঃ-
অশোক – অনুশাসন
যে সকল কলঙ্কের কথা তাঁহার নামে আছে, তাহার
মূলে কিছু সত্য থাকিতে পারে।(পৃ.১৫৬) কিন্তু যেরূপ রাশি রাশি দূষ্কর্ম্ম তাঁহার
প্রতি আরোপ করা হইহাছে, তাহার সিকিভাগও যদি সত্য হইত, তবে দেবতাদিগের প্রিয়
প্রিয়দর্শী কি তজ্জন্য অনুতপ্ত হইতেন না? কলিঙ্গক্ষেত্রের সামরিক অভিজানে
রাজন্য-ধর্ম্ম আশ্রয় করিয়া তিনি যুদ্ধে কতকগুলি লোক হত্যা করিয়াছিনেল- তজ্জন্য
তাঁহার মর্ম্মস্পর্শী অনুতাপ পাথর গাত্রের উপরে অক্ষয় অক্ষরে ব্যক্ত রহিয়াছে, আর
নিজের আত্মীয় সুহৃৎদিগকে নৃশংসভাবে হত্যা করিয়া কি তিনি কিঞ্চিন্মাত্রও অনুতপ্ত
হইলেন না? এদিকে এইরুপ পরস্পরবিরোধী যুক্তি তর্ক সত্ত্বেও আমরা একথা বলিতে পারি না
যে তিনি নিষ্কলঙ্ক। যুধিষ্ঠিরও মিথ্যাচার করিয়াছিলেন, ধর্ম্মাশোকও প্রথম-জীবনে
হয়ত রাজ্যলোলুপ হইয়া কতকগুলি হত্যা করিয়াছিলেন। (পৃ.১৫৭)
তাঁহার সর্ব্বপ্রধান দান অর্থ নহে- তিনি
স্বীয় প্রিয়তম সুদর্শন তরুণ পুত্র মহেন্দ ও অষ্টাদশবর্ষীয়া রূপসী কন্যা
সঙ্ঘমিত্রাকে বৌদ্ধসঙ্ঘে ভিক্ষুসম্প্রদায়কে দান করিয়াছিলেন। তাঁহারা ভিক্ষুধর্ম্ম
গ্রহণপুর্ব্বক সিংহলে (শ্রীলঙ্কা) যাইয়া ধর্ম্ম প্রচার করিয়াছিলেন। সঙ্ঘমিত্রা আদত
নাম নহে, সঙ্ঘে প্রবেশ করার পর তিনি এই নাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। (পৃ.১৫৭-১৫৮)
অশোকের নীতি এক অভিনব সামগ্রী। তিনি সমস্ত
নীতিশাস্ত্রের ঊর্দ্ধে উঠিয়া খুব একটা উচ্চ স্থান হইতে জগৎ দর্শন করিয়াছিলেন। কি ভাবে রাজ্য শাসন করিতে হইবে, রাজনীতিবিৎ পণ্ডিতগণ তাহাই
আলোচনা করিয়াছেন। কিন্তু কিরূপে রাজ্য পালন করিতে হয়, অশোক তাহাই বলিয়াছেন। জগৎ
তাঁহার চক্ষে একটা সাম্রাজ্য ছিল না- উহা ছিল একটি বৃহৎ পরিবার – তিনি উহা রক্ষা
করিয়া কিরূপে নিরুপদ্রবে রাজত্ব করিতে পারিবেন, তৎসম্বন্ধে একবারও ভাবেন নাই। কোন বৃহৎ পরিবারের পিতৃস্থানীয় ব্যক্তি কিরূপে সেই
পরিবারভুক্ত সকলের মঙ্গল হইবে সর্ব্বদা তাহাই চিন্তা করেন, অশোকও
স্বীয়-রাজ্য-সম্বন্ধে সেইরূপই করিতেন। এই পরিবার কেবল মনুষ্য-সম্প্রদায় লইয়া নহে, সমস্ত
জীবই যেন সেই পরিবারভুক্ত ছিল। একটিমাত্র শিলালেখে দণ্ডের কথা উল্লিখিত আছে।
কৌশাম্বী অনুশাসনে বলা হইয়াছে “ভিক্ষু বা ভিক্ষুণীদের দলে যে কেহ সঙ্ঘে ভেদ
জন্মাইবার চেষ্টা করিবেন, তিনি স্বেত বস্ত্র পরিধান করিতে বাধ্য হইবেন, এবং ভিক্ষু
বা ভিক্ষুণীদের দলে মিশিতে পারিবেন না।” এই দণ্ডের অভিপ্রায় যে ব্যক্তি
ভিক্ষুধর্ম্মের অযোগ্য, তাহার গৈরিক বাস পরা বিড়ম্বনামাত্র। ইহাকে ‘দণ্ড’ বলা ঠিক
নহে, সঙ্ঘের মধ্যে ঐক্যরক্ষার জন্য উহা একটি উপায়মাত্র। কিন্তু তাঁহার এত বড়
রাজ্যে কি লোক দণ্ড পাইত না? অবশ্যই পাইত; কিন্তু তিনি তাঁহার কর্ম্মচারীদিগকে
পুনঃ পুনঃ সেই দণ্ডের কঠোরতা হ্রাস করাইবার উপদেশ দিয়াছেন। তাঁহাকে আমরা
প্রজাপালক দেবমূর্ত্তিতেই দেখিতে পাই- শাসন কর্ত্তৃরূপে নহে।
“সদয় হৃদয় দর্শিত পশু ঘাতম্।”
নির্ম্মভাবে পশুবলির কাজ চলিতেছিল। বৈদিক
যাগযজ্ঞে দেশ পরিপ্লাবিত ছিল। রাজা সমস্ত দেশ হইতে এই প্রথা উঠাইয়া দিতে চেষ্টা
করিয়াছিলেন। সেকালে তাহা অসাধ্যসাধন ছিল; একালেও কি তাহা নহে? তথাপি অপরিহার্য্য কিছু কিছু
রক্ষা-কবচের ব্যবস্থা রাখিয়া অশোক পশুহত্যা নিবারণ করিয়াছিলেন। জগতের এক ভগবৎকল্প
ব্যক্তি এই পশু বধ দেখিয়া অশ্রুসিক্ত কন্ঠে তাহা নিবারণ করিয়াছিলেন, সদয়ে
জীবহত্যার প্রতি লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিলেন। সেই পুরাযুগে একমাত্র অশোকের
চক্ষে তেমনই জীবকষ্টে সহানুভূতিজাত এক ফোঁটা করুণার অশ্রু পড়িয়াছিল; তাঁহার প্রায়
সমস্ত শিলালিপিতে পশুহত্যা-নিবারণের প্রচেষ্টা দৃষ্ট হয়। (পৃ.১৬৫)
অশোকের জীবনের অন্যতম মহাব্রত ছিল
– মৌন পশুজাতির কষ্টমোচন। এদেশে মৎস্যের প্রাচুর্য্য সৰ্ব্বজনবিদিত, মৎস্যপ্ৰিয় জনসাধারণকে মৎস্যাহার হইতে সেকালে নিবৃত্ত করা
একান্ত অসম্ভব ছিল ;
তথাপি তিনি ধীরে ধীরে
তাহাদিগকে নিবৃত্তির পথে আসিতে কতই না চেষ্টা করিয়াছেন। “আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা হইতে, কার্ত্তিক মাসের পূর্ণিমার পূর্ব্ব পৰ্য্যন্ত প্ৰত্যেক
পূর্ণিমা, চতুর্দ্দশী, অমাবস্যা ও প্রতিপদ এবং বৎসরের উপোসথ দিবসে মৎস্য বধ বা বিক্রয়
করিতে পরিবে না।” (পঞ্চম স্তম্ভলিপি।)
বৃষদিগকে যে
উত্তপ্ত লৌহ-দ্বারা চিস্থিত করিয়া দেওয়া হয়, তৎসম্বন্ধেও তিনি ধীরে ধীরে নিষেধবিধি প্রচার করিয়াছিলেন। উক্ত শিলালিপিতে বলা হইয়াছে—“পুষ্যা ও পুনৰ্ব্বসু
নক্ষত্ৰযুক্ত দিবসে প্রত্যেক
চাতুৰ্ম্মাসিক পূর্ণিমা ও অমাবস্যার দিবসে এবং চাতুৰ্ম্মাস্যের শুক্লপক্ষে বৃষকে লৌহশলাকা-দ্বারা কোনরূপ চিহ্নিত করিতে পরিবে না।” চতুর্দ্দশ গিরিলিপিতে অশোক ‘সমাজ’ সম্বন্ধে নিষেধবিধি প্রচার করিয়াছিলেন। ঐ ‘সমাজ’ শব্দের অর্থ ব্যাখ্যায় কোন
কোন প্রত্নতাত্ত্বিক লিখিয়াছেন-পশুদিগের
মধ্যে নিৰ্ম্মম প্ৰতিদ্বন্দ্বিতার সৃষ্টি করিয়া পুরাকালে কোন বৃহৎ আঙ্গিনায় তাহাদের মারাত্মক ক্রীড়া দেখান হইত, এইরূপ উৎসবই ‘সমাজ’ শব্দের অভিপ্ৰেত। স্ত্রীলোকের আচার ও মঙ্গলানুষ্ঠানের ষে যে অংশে পশুহত্যার
প্রথা ছিল, তিনি তাহা নিবারণ
করিয়াছিলেন। (নবম গিরিলিপি।) তৎকৃত পশুচিকিৎসালয়ের
উল্লেখ এই শিলালিপিগুলিতেই আছে।
তিনি পথে পথে
যে সকল বৃক্ষ রোপণ করিয়াছিলেন, এবং কুপ খনন করিয়াছিলেন
তাহার উদ্দেশ্য তিনি সপ্তম স্তম্ভলিপিতে বিশেষ করিয়া বুঝাইয়া দিয়াছেন। “দেবপ্ৰিয় প্রিদর্শী রাজা এরূপ কহিতেছেন- পথে পথে
বটবৃক্ষ সকল রোপণ করাইয়াছি। উহার পশু ও মনুষ্যগণকে ছায়া দান করুক। আমবাটিকা
প্ৰস্তুত করাইয়াছি এবং অৰ্দ্ধক্রোশ ব্যবধানে কূপ খনন করাইয়াছি এবং সেই
সেই স্থানে জলদানের ব্যবস্থা করাইয়াছি। মনুষ্য ও পশুগণের উপকারের জন্য অনেক
আশ্রয়স্থান নিৰ্ম্মাণ করাইয়াছি।” (সপ্তম স্তম্ভলিপি।)
তিনি শুধু তাহার নিজের প্রজাদিগকে
অপত্যনির্বিশেষে লালনপালনের ভার গ্ৰহণ করেন নাই,-হৃদয়ের শুদ্ধ বাৎসল্যভাব ও দয়াবৃত্তি সীমাতে সন্তুষ্ট হয় না, কলিঙ্গ অনুশাসনে তিনি বলিয়াছেন “সকল মনুষ্যই আমার পুত্রতুল্য। আমার পুত্রেরা ঐহিক ও পারলৌকিক সকল মঙ্গল ও সুখের অধিকারী হউক, ইহা আমি যেরূপ ইচ্ছা করি তেমনই প্রার্থনা করি সকল মনুষ্যই
সেইরূপ হউক৷”
মনুষ্য ও পশু – চিকিৎসালয় তিনি শুধু স্বীয় রাজ্যের নানাস্থানে স্থাপন করেন
নাই, ম্যাসিম্ভোনিয়া এবং এ্যান্টিগোনেসের রাজ্য পর্য্যন্ত সুদূর
পশ্চিম এবং দক্ষিণে সিংহল পর্য্যন্ত এই ভাবের
দাতব্য চিকিৎসালয় তিনি প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। “যে যে স্থানে মনুস্থ্য ও পশুগণের উপকারক ঔষধ এবং ফলমূল
নাই, সেই সেই স্থানে ঐ সকল
সংগৃহীত ও রোপিত হইয়াছে।” (দ্বিতীয় গিরিলিপি।) (পৃ.১৬৬)
পরধর্ম্মনিন্দা নিষিদ্ধঃ-
তাঁহার ধৰ্ম্ম প্রচারকগণকে তিনি তৎকালপরিজ্ঞাত
জগতের সর্ব্বত্র পাঠাইয়াছিলেন, টলেমি, মিশর (২৬১-২৪৬ খৃঃ
পূঃ) ম্যাসিডনিয়ারাজ আন্টিগোনাস্ (২৭৭-২৩৯ খৃঃ পূঃ), সাইবিনীর মগাস (২৫৮-খৃঃ পূঃ
মৃত্যু), এপিরসের রাজা আলেক্সন্দ্রস্ (২৭২-২৫৮ খৃঃ পূঃ) – ইহাদের রাজ্যে তিনি
মনুষ্য ও পশুচিকিৎসালয় স্থাপন করিয়াছিলেন। তাঁহার
ধৰ্ম্ম কি তাহা তিনি পুনঃ পুনঃ ভাল করিয়া বুঝাইয়া
দিয়াছেন -প্ৰধান
ধৰ্ম্ম অহিংসা ও জীবে দয়া, পিতামাতার প্রতি ভক্তি, ব্ৰাহ্মণ ও শ্রমণদিগকে
যথাযথ শ্রদ্ধা প্ৰদৰ্শন ও দান-দ্বারা সন্তুষ্ট করা, উপকার বৃত্তি ইত্যাদি। তাঁহার ধৰ্ম্মে আধ্যাত্মিকত্ব কিছুই ছিল না -তাঁহার প্রধান
ভিত্তি সুনীতি, তিনি অতিরিক্তমাত্রায় স্বীয়
ধৰ্ম্ম- ধ্বজাধারী ও কোন হেতুতেই পরধৰ্ম্মের বিরোধী ছিলেন না। এ সম্বন্ধে তিনি প্রচার
করিয়াছিলেন “অভিষেকের দ্বাদশ বর্ষ হইতেই
আমি সৰ্ব্বলোকের হিত ও সুখের জন্য এইরূপ ধৰ্ম্মলিপি শিখাইতেছি। তাহারা যাহাতে পূৰ্ব্বপাপ-আচরণ ত্যাগ
করিয়া ধৰ্ম্মে উন্নতি লাভ করে, তাহাই আমার উদ্দেশ্য। এইরূপে আমি প্ৰজাগণের হিত ও সুখ দেখিয়া থাকি। আরও জ্ঞাতিদিগকে, প্ৰত্যাসন্নদিগকে এবং দূরবর্ত্তীদিগকে
কি কি উপায়ে সুখী করিতে পারা যায়, তাহা আমি লক্ষ্য করিয়া
থাকি এবং সেইরূপ কাৰ্য্য করিয়া থাকি। এইরূপ সৰ্ব্বজীবের ও সর্ব্বসম্প্রদায়ের
প্রতি আমার লক্ষ্য থাকে। সৰ্ব্ব-ধৰ্ম্মাবলম্বীকেই
আমি বিবিধ প্রকারে পুজা ও সম্মান করিয়া থাকি, তথাপি আমার মতে স্বধৰ্ম্মের প্রতি অনুরাগই শ্ৰেয়।” ( ষষ্ঠ স্তম্ভলিপি।) “আমার ধৰ্ম্মমহামাত্ৰগণ কি গৃহস্থ, কি উদাসীন সকলের জন্য এবং সকল
ধর্ম্মাবলম্বীর জন্য ব্যাপৃত আছেন। তাঁহারা সঙ্ঘের কার্য্যেও নিযুক্ত আছেন।
ব্ৰাহ্মণ ও আজীবকগণের জন্যও আমি এইরূপ করিয়াছি। নিগ্ৰর্ন্থদিগের (জৈন সম্প্রদায়)
জন্যও এইরূপ করিয়াছি। ইহারা তাহাদিগের জন্যও ব্যাপৃত আছেন। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের
জন্যও এইরূপ করিয়াছি, তাঁহারা তাঁহাদের কাৰ্য্যেও
ব্যাপৃত আছেন।”
একদিকে পারস্যের
উপান্তভাগ, অপরদিকে বঙ্গ, বিহার ও আসাম। একদিকে গান্ধার ও হিমালয়ের
উত্তর হইতে প্ৰায় সমস্ত দক্ষিণাত্য,
এই বিশাল রাজ্যের তিনি
একচ্ছত্ৰ অধীশ্বর, তাঁহার এতগুলি অনুশাসনের কোনটিতে এত বড় সাম্রাজ্য কি
করিয়া, রাখিতে হইবে কিংবা দণ্ডমুণ্ডের
বিধিব্যবস্থা কি প্রকারে হইবে এসম্বন্ধে একটি কথাও নাই। তাঁহার শিলালিপি পাঠ
করিলে মনে হয় যে সুবিশাল এক পরিবারের
পিতৃস্থানীয় এক ব্যক্তি দিনরাত্র সমস্ত সন্তান পালনের চিন্তায় বিভোর হইয়াছেন-
স্নেহ, প্রীতি ও দয়াদ্বারা কি ভাবে তাহাদের জীবনের উন্নতি করিবেন, তিনি এই চিন্তায় ব্যস্ত।
মনে হয় যেন
তাঁহার বিশাল সাম্রাজ্য একটি বিরাট্ চিকিৎসাশালা–তাহার ভারপ্রাপ্ত মহাভিষক্
সকলের আধিব্যাধি দূর করিতে ওষধি তৃণ গুল্ম খুজিতেছেন, -মনে হয় যেন কোন বিশাল মরুভূর পথের অধ্যক্ষ-স্বরূপ, তিনি প্রতি মাইল ব্যবধানে কুপ ও শীতল বিটপী ছায়ার কিরূপে
ব্যবস্থা করিবেন-তজ্জন্য চিন্তায় নিবিষ্ট; আত্মরক্ষা, দুর্গসংস্কার, অশ্বারোহী, গজারোহী ও পদাতিক সৈন্যের কথা নাই। যেন ভারতবর্ষে দয়ার এক বিরাট্
উৎসবক্ষেত্র, মহাদাতা- কর্ম্মকর্ত্তৃরূপে কাহার কি
দরকার তাহার সন্ধান নিতেছেন- ষেন সমস্ত ভারতব্যাপী দয়ার এক
মহোৎসব চলিতেছে। পশুবলি নাই, নৈবেদ্যের ঘটা নাই,
অনুষ্ঠানাদির বাহুল্য বা আড়ম্বর নাই; দুঃখীর দুঃখ বুঝিতে, আর্ত্তের মর্ম্মে
সান্ত্বনা দিতে, পৃথিবীর সমস্ত জীবের আতঙ্ক নিবারণ করিতে, দানসত্ৰ খুলিয়া সৰ্ব্বলোকের অভাব মোচন করিতে, গুরুজনের
প্রতি কৰ্ত্তব্য শিখাইতে, মহাপুরোহিত সেই মন্দির হইতে অবিরত
ব্যবস্থা করিতেছেন, তাঁহার শ্রান্তি নাই, বিরাম নাই। মনু, যাজ্ঞবল্ক্য, অত্রি,
কৌটিল্য, শুক্র-কথিত রাজনীতি কোথায় আর অশোক রাজার রাজনীতি কোথায়?
উভয় নীতির মধ্যে স্বৰ্গ-মর্ত্ত্যের
ব্যবধান। জগতের আর কোন্ দেশে এরূপ রাজা জন্মিয়াছেন তাহাত জানি না।(পৃ.১৬৭-১৬৮)
মৃগয়ার পরিবির্ত্তে লোকহিতার্থে অভিযানঃ-
অশোক দিনরাত্র জগতের হিতার্থ উদ্যোগী ছিলেন;
“সর্ব্ব কোক হিতের জন্য সতত জাগ্রত ও উদ্যোগী থাকা চাই। তাহাদের ইষ্টচিন্তা ছাড়া
আমার কর্ম্মান্তর নাই। আমি জগতের কাছে যেন অঋণী হইতে পারি।” (ষষ্ঠ অনুশাসন।)
পূর্ব্বে রাজগণ মৃগয়াদির জন্য অভিযান করিতেন, তৎস্থলে অশোক অন্যরূপ অভিযানের
ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। তিনি তাঁহার ভ্রমণ পবিত্র উদ্দেশ্যে পরিচালিত করিলেন। “ব্রাহ্মণ, সাধু ও
সন্ন্যাসিগণের সঙ্গলাভ, তাহাদিগকে দান করা,
বয়োজ্যেষ্ঠ ও গুণজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিগণকে
স্বর্ণদান, পল্লীর
লোকদিগের সঙ্গে মেলামেশা ও তাহাদিগকে
ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে অবহিত করা, গ্রামে গ্রামে ধৰ্ম্ম আচরিত হইতেছে কি না, তাহার সন্ধান
লওয়া- আমার ভ্রমণের এইগুলি মুখ্য উদ্দেশ্য। পূর্ব্বে যে মৃগয়ার প্রথা প্ৰচলিত
ছিল তাহা হইতে এইরূপ ভ্ৰমণ আনন্দদায়ক ও উৎকৃষ্ট।”
(অষ্টম অনুশাসন।) তিনি প্ৰতিষ্ঠা
চাহিতেন না। -তাঁহার লক্ষ্য ছিল বহু উৰ্দ্ধে স্বর্গের দিকে, সুতরাং লৌকিক যশের প্রতি তিনি উদাসীন ছিলেন। “দেবপ্ৰিয়
প্রিয়দর্শী রাজা যশ বা কীৰ্ত্তির বিশেষ মূল্য আছে বলিয়া স্বীকার করেন না।”(দশম অনুশাসন।)। তিনি যে ধৰ্ম্ম প্রচার করিয়াছিলেন, তৎসম্বন্ধে পূর্ব্বেই
লিখিয়াছি তাহা জটিল অধ্যাত্ম বাদ নহে, সরল ও অবিসম্বাদিত সাৰ্ব্বজনীন সত্য। “ক্রীতদাস ও সাধারণ ভৃত্যদিগের প্রতি সদাশয়তা, গুরুজনের
পূজা, প্ৰার্থীদিগের প্রতি অহিংসা, ব্ৰাহ্মণ ও শ্রমণদিগকে দান প্ৰভৃতি কাৰ্য্যকে
সাধুকাৰ্য্য এবং এইরূপ অন্যান্য কাৰ্য্যকে ধৰ্ম্ম-মঙ্গল কহে।” (নবম গিরিলিপি।) বাক্যসংযমের উপর অশোক খুব জোর দিয়া
বলিয়াছেন- “সকল
ধৰ্ম্ম সম্প্রদায়েরই সারবুদ্ধি বিভিন্ন প্রকারের,
কিন্তু তাহার মূলে বাক্য-সংযম। কিরূপে? সধর্ম্মীর সম্মান ও পরধর্ম্মীর নিন্দা সামান্য বিষয়েও
যেন আদৌ না হয়। কোন কোনো কারণে পরধর্ম্মীদিগের
পূজা
কর্ত্তব্য। উহা-দ্বারা সধর্ম্মীদিগের
উন্নতি ও পরধৰ্ম্মীদিগের উপকার হয়। এরূপ না করিলে সধর্ম্মীদিগের ক্ষতি হয়। যদি
কেহ সম্প্রদায়ের প্রতি অনুরক্তিবশতঃ বা সধর্ম্মীদিগের গৌরব বৰ্দ্ধনাৰ্থ সধৰ্ম্মীদিগের পূজা ও পরধর্ম্মীদিগের নিন্দা করে, সে বিশেষরূপে
স-সম্প্রদায়ের হানি করে। সুতরাং সমবায় (
সামঞ্জস্য) ভাল। কিরূপে ? সকলে পরস্পরের ধৰ্ম্ম
শ্ৰবণ করুক, এবং উত্তরোত্তর
শ্ৰবণ করিতে ইচ্ছা করুক।” (দ্বাদশ অনুশাসন।) আমরা যে আধুনিক কালে সৰ্বধৰ্ম্মসমন্বয়ের আন্দোলন করিতে চেষ্টিত, কত শত শতাব্দী পূর্বে
অশোক তাহার বীজ বপন করিয়া গিয়াছিলেন।(পৃ.১৬৮-১৬৯)
যাহারা
অপরাধ করিয়া কারাগারে যায়, তাহাদের জন্য এই রাজৰ্ষির কত দয়া! নিজের সন্তান যদি ঐরূপ শান্তি পায়, তবে মানুষের মনে যেরূপ কষ্ট হয়, ইহা সেইরূপ ব্যথা। ধৰ্ম্মমহামাত্রদিগের
কৰ্ত্তব্য সম্বন্ধে তিনি ৫ম গিরিলিপিতে বলিয়াছেন—“দণ্ডিত ব্যক্তির অনেকগুলি সন্তান আছে কি না,
দুঃখে তাহারা আত্মহারা হইতেছে কি না, অথবা সে বৃদ্ধ কি না, এই সকল বিবেচনাপূর্ব্বক
ধর্ম্মমহামাত্রগণ অন্যায় ও অন্যান্য দৈহিক দণ্ডের প্রতিবিধানে ও বন্ধনমুক্তির জন্য
ব্যাপৃত আছেন।” “দণ্ডিত ব্যক্তির স্বগণেরা কষ্ট পাইতেছে কি না
এবং দণ্ডিত ব্যক্তির বহুসন্তান আছে কি না এবং সে বৃদ্ধ কি না”—এসকল কি বিচারকগণ
কোথাও দেখিয়া থাকেন? অশোক আদৌ শুষ্ক বিচারক ছিলেন না। পিতামাতা সন্তানকে দণ্ড দিয়া গোপনে আর এক
চক্ষে চাহিয়া দেখেন, তাহার ব্যথা হইতেছে কি না-ইহা সেই মাতাপিতার দণ্ড। “নগরের শাসনকৰ্ত্তারা সৰ্ব্বদা দেখিবেন যেন নগরবাসীগণের
অকারণ অবরোধ ও দৈহিক দণ্ডভোগ না ঘটে।” (ধৌলীর অতিরিক্ত অনুশাসন।) মোটকথা তাঁহার অনুশাসনগুলি পড়িলে মনে হয় তিনি
সাম্রাজ্যের সম্রাট নহেন, শাসনকর্ত্তা নহেন,-পালনকর্ত্তা।
তাঁহার উক্তিগুলি সিংহাসন হইতে উচ্চারিত বলিয়া মনে হয় না, বেদী হইতেই উচ্চারিত
বলিয়াই মনে হয়।
বস্তুতঃ এগুলি শাসন বা অনুশাসন নহে- পালন-নীতি। উহাদের মধ্যে শাসনের নামগন্ধ নাই। (পৃ.১৬৯)
রাজগৃহ
সুবিচারার্থ সর্ব্বদা মুক্তঃ-
যাহার
যে প্রয়োজনে রাজদরবারে আসার দরকার, তাহার জন্য প্ৰাতঃকাল হইতে সমস্ত রাত্র অবারিত দ্বার। “সুতরাং আমি নিয়ম করিয়াছি- সকল সময়ে -আমি
ভোজনেই ব্যাপৃত থাকি বা অন্তঃপুরে, নিভৃতকক্ষে, শৌচাগৃহে, যানে বা
প্ৰমোদউদ্যানেই থাকি, সৰ্ব্বত্রই আমার বার্ত্তাবহগণ আছে, তাহা্রা আমাকে প্ৰজাগণের
প্রয়োজন জ্ঞাপন কৱিবে।” (যষ্ঠ গিরিলিপি।) যদি কোন জরুরী
কাৰ্য্য সম্বন্ধে মৌখিক আদেশ লইয়া মন্ত্রীদের মধ্যে মতদ্বৈধ হয় “বা কোন বিশেষ জনসমাজে কোন বিষাদ বা
প্ৰবঞ্চনা উপস্থিত হয়, তাহা হইলে যেস্থানেই হউক বা যে সময়েই হউক, আমাকে তৎক্ষণাৎ জানাইবে ; আমি এইরূপ আদেশ করিতেছি। কারণ রাজকাৰ্য্য বা
পরিশ্রম করিয়া কর্ত্তব্য পৰ্য্যাপ্ত হইয়াছে, ইহা মনে করিয়া কখনই সন্তুষ্ট থাকিতে পারি
না।” (ষষ্ঠ গিরিলিপি।) তিনি যে সকল আদেশ প্রচার
করিয়াছেন তাহা রাজকীয় আইনের ধারা মতন নহে। মন্ত্রীদের লইয়া খসড়া তৈয়ার করাইয়া শেষে
উহা তিনি প্রচার করেন নাই। উহা স্বতঃপ্রবৃত্ত হৃদয়ের উচ্ছ্বাস। উহা পরকে বলিয়া
দিয়া লেখান যাইতে পারে না। তিনি আদেশ
প্রচার করিয়া ভাবিয়াছেন হয়ত রাজকর্ম্মচারীরা তাঁহার কথা ভাল করিয়া বুঝিতে পারিল না- সতত দয়ার্দ্রচক্ষে তিনি
প্ৰজাহিতের উদ্যোগী ছিলেন। বহু কৰ্ম্মচারী
নিযুক্ত করিয়া তিনি সর্ব্বদা চিন্তিত থাকিতেন—তাঁহার উপদেশগুলি যথাযথারূপে ব্যাখ্যাত হইতেছে কি না যাঁহারা তাহা বুঝাইয়া
দিবার ভার প্রাপ্ত, তাঁহারা তাহা বুঝাইতে পারিতেছেন কি না ? প্ৰজারা তাহা বুঝিতেছে কি না ? কলিঙ্গ জৌগড় অনুশাসনে তিনি বলিতেছেন “আপনারা হয়ত
সম্যকরূপে আমার অভিপ্ৰায় বুঝিতে পারেন নাই। হয়ত কেহ কেহ আংশিক বুঝিয়াছেন- কিন্তু
সম্পূর্ণরূপে বুঝেন নাই- প্ৰতি-তিস্য দিবসে এই লিপি শ্ৰবণ করাইবেন, অন্ততঃ এক
ব্যক্তিকেও শ্রবণ করাইবেন।” এইরূপ কথা অপরকে দিয়া লিখান যাইতে পারে না। অশোকলিপির প্রত্যেকটি আদেশ, প্ৰত্যেকটি উপদেশ তাঁহার নিজের।
উহা এরূপ সৌহার্দ্দ্যের ভাবমাখা, এরূপ প্ৰবল স্নেহ, দয়া ও মমতার ছাপমারা -উহার মধ্যে রাজার ব্যক্তিগত
শুভেচ্ছার এত প্ৰবল প্রেরণা দৃষ্ট হয় যে উহার একটি শব্দ, একটি বর্ণও পরের সাহায্যে লিখিত
হইয়াছে বলিয়া মনে হয় না। তৎসাময়িক পাশাপাশি নৃপতিদের শিলালেখ দৃষ্টি করুন, সেগুলিতে উৎকট
রাজকীয় গৌরবের ঘোষণা, আদেশের প্রভুত্ব পাঠকচক্ষুকে ঝলসিয়া দিবে। তাহাদের সঙ্গে
অশোকশিলালেখমালার কোন তুলনাই হইতে পারে না। অশোকলিপিতে আমরা রাজার রাজবেশ দেখিতে পাই না ; বিশ্বের মঙ্গলকামী সচেষ্ট সাধুর দেখা পাই।
প্রস্তরলিপিগুলির মধ্য হইতে রক্তমাংসের সাধু যেন জীব জগতের ব্যথায় দয়ার্দ্র হইয়া
তাঁহার অনুশাসন প্রচার করিতেছেন। সেই অনুশাসনগুলি এত জীবন্ত, তাহাতে জগতের হিতকল্পে এত দয়া, এত বাৎসল্য, এত দুশ্চিন্তা ষে তাহাতে এখনও
প্ৰাণে সাড়া দিয়া উঠে ; আমরা বর্ত্তমান কালের সমস্ত
কোলাহল বিস্মৃত হইয়া সেই সৰ্ব্বকালোপযোগী
বাণী শুনিয়া চরিতার্থ হই -উহা যে ২০০০ বৎসরের উৰ্দ্ধকাল হইতে ইতিহাসের অতি প্ৰাচীন এক নিবিড় যুগ হইতে আসিয়াছে, তাহা ভুলিয়া যাই, মনে হয় যেন কোন সাধুর পার্শ্বে
এখানে এখনই বসিয়া সেই জগৎ-মঙ্গল সর্ব্বজন-হিতকর পরমার্থ জীবনের উপদেশ শুনিতেছি।(পৃ.১৬৯-১৭০)


0 comments:
Post a Comment